ইভিএম নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক

বিভুরঞ্জন সরকার ১৩:৫৩ , অক্টোবর ০৮ , ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারআমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্লোগান দিতাম ‘হলে হলে সিট চাই, রঙিন টেলিভিশন চাই না। সুইমিংপুল চাই না, হলে হলে সিট চাই’।
আমরা যেটা চেয়েছি সেটা পাইনি। যেটা চাইনি সেটা পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সময়ের চেয়ে এখন হলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু সব শিক্ষার্থীর আবাসন সমস্যার সমাধান হয়নি। কারণ, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের চেয়ে বেড়েছে। কিছু সমস্যা আছে, যার স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি, কিন্তু সমাধান একবারে করা যায় না। আবার পৃথিবীতে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো বৈশ্বিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, আমরা বিরোধিতা করেও যা ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না। তথ্যপ্রযুক্তি বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাইলেই তাকে পেছনে ঠেলে দিতে পারবো না।
আমাদের আবিষ্কারে ভয়। নতুনে ভয়। এমনকি বিজ্ঞানেও আমাদের ভয়। আবার আমাদের আচরণে মারাত্মক সব স্ববিরোধিতাও আছে। আমরা যুক্তি ও বিবেচনাবোধ থেকে হুজুগে বেশি মাতি। সাঈদীকে চাঁদে দেখার গাঁজাখুরি গল্পে মানুষ হত্যার মতো অপরাধ সংঘটনেও পিছপা হই না। আধুনিক ভোটিং মেশিন নিয়েও আমরা প্রায় সমান কানকথা বা অনুমান নির্ভরতায় মেতে উঠছি। বিকাশে টাকা পাঠাতে দ্বিধা নেই। যন্ত্রে ভোট দিতে আপত্তি। যন্ত্রে কারচুপি নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই কিন্তু যন্ত্র ছাড়া আবার জীবন চালাতেও পারছি না। কথাগুলো বলছি ইভিএম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নিয়ে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক জমে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নানা ধরনের সন্দেহ প্রকাশ করছেন রাজনীতিবিদসহ আরও কিছু শ্রেণি-পেশার মানুষ।

নির্বাচনের মাস কয়েক আগে এসে নির্বাচন কমিশন কেন আংশিকভাবে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো সে প্রশ্ন যেমন উঠছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যের সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্বভাবতই কারো কারো ধারণা, সরকারের কোনও বদ-মতলব পূরণের লক্ষ্য থেকেই নির্বাচন কমিশন আকস্মিকভাবে ইভিএমে যেতে চাচ্ছে। অন্তত কিছু আসনে যান্ত্রিক কৌশলে সরকারি দলের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করা যাবে।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টিকে দেখেছেন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে। আবার একজন প্রবীণ মন্ত্রী বলেছেন, মাহবুব তালুকদার ইসিতে এসেছেন বিএনপির কোটায় অর্থাৎ ভদ্রলোকের গায়ে একটি রাজনৈতিক দলের ছাপ লাগিয়ে দেওয়া হলো। তিনি যদি বিএনপির তালিকা থেকে এসে থাকেন তাহলে অন্যরা কি আওয়ামী লীগের তালিকা থেকে এসেছেন? নির্বাচন কমিশনকে এমন দলীয় বিভাজনে নেওয়া কি খুব ভালো হচ্ছে?

নির্বাচন কমিশনের গায়ে এভাবে দলীয় সিল লাগিয়ে দেওয়া কতটুকু সুবিবেচনাপ্রসূত হলো, সেটা এখন একটি বড় প্রশ্ন।

এখন ইভিএম বিতর্ক ইসি কীভাবে ফয়সালা করবে তাও দেখার বিষয়। নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই আস্থার সংকটে আছে। এই কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়–এটা বিএনপিসহ আরও অনেকেই বলেছে। নির্বাচন কমিশনও তার বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট দূর করার জন্য সচেষ্ট না হয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে চলেছেন।

সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, আগামী নির্বাচনে সব কেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়া কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্য খোদ কমিশনেই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অন্য কমিশনাররা বলেছেন, ওটা সিইসির নিজস্ব বক্তব্য। কমিশন ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। কারণ, কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বই হলো দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।

এই রকম একটি অবস্থায় ইভিএম প্রসঙ্গ সামনে এনে মানুষের মনে, বিশেষ করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কাজটি এভাবে না করলেই ভালো হতো।

আমাদের নির্বাচন কমিশন যে ইভিএম যন্ত্রটি ব্যবহার করতে চাচ্ছে তাতে কোনও ধরনের কারচুপি বা ম্যানিপুলেশনের সুযোগ নেই। বায়োম্যাট্রিক পদ্ধতিতে তৈরি এই যন্ত্রে কারসাজির কোনও সুযোগ নেই। যারা এই মেশিনটি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত তাদের সঙ্গে কথা বললেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, আমরা সবাই বিষয় বিশেষজ্ঞ। মতামত দিতে আমরা অতি উৎসাহী এবং তৎপর। নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল যন্ত্রটির কারিগরি দিক নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করা। যারা এই মেশিনটি তৈরি করেছেন তারা যদি এর খুঁটিনাটি দিক নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতেন, এক ধরনের ডেমোনেস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে এ নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর হতো। গণমাধ্যমেও যদি এই মেশিনের বৈশিষ্ট্য বা গুণাগুণ নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হতো তাহলেও সবাই এর কার্যকারিতা বুঝতে পারতো, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়তো। কোনও কিছু নিয়েই তাড়াহুড়া করা ভালো নয়। আর রাখঢাক করা তো কোনোভাবেই উচিত নয়। এতে সন্দেহ বাড়ে। ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।

এটা ঠিক যে আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হওয়ার সুযোগ কম। তারপরও আলোচনার দরজা বন্ধ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইভিএম নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন তারা যে যন্ত্রটি সম্পর্কে জেনেবুঝে সব বলছেন আমার অন্তত তা মনে হয় না।

যেকোনও ব্যাপারে জানা-বোঝা হলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন অনিন্দ্য সুন্দরী অথবা কুৎসিত নারীকেও প্রথম দেখায় প্রেম নিবেদন করতে গেলে বিপাকে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। তার সঙ্গে জানাশোনা হলে, পরস্পর জানা-বোঝা গভীর হলে ‘আই লাভ ইউ’ বললে আর তাড়া খাওয়ার ভয় থাকে না। ইভিএমের ব্যাপারটাও অনেকটা সে রকমই হচ্ছে। সে গুণবতী, রূপসী, কিন্তু তার সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা নেই। জানা-বোঝার সুযোগ দিতে নির্বাচন কমিশনের আপত্তির কারণ থাকতে পারে না।

আমরা আধুনিকতার পক্ষে। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা প্রযুক্তিবান্ধব। তাহলে কেন সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে আমরা ইভিএমবিরোধী হবো? আমরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চাইলে ইভিএম থেকে দূরে থাকা চলবে না। তবে সবার আগে, এর সঙ্গে মানুষকে পরিচিত করে তুলতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

x