মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্যালুট আপনাকে

রেজানুর রহমান ১৫:৪২ , অক্টোবর ০৮ , ২০১৮

রেজানুর রহমানকঠিন কথাগুলো কত সহজ করে বললেন আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রপতি। কথা যেন নয়, এক একটি শক্ত দেয়াল। অথচ আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কত সহজেই না দেয়ালগুলো এক এক করে ভাঙলেন। দেশের কোটি কোটি মানুষের মতো আমিও মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার একজন অন্ধভক্ত। মাননীয় রাষ্ট্রপতি উপস্থিত থাকবেন এমন সভা-সমাবেশে যাওয়ার সুযোগ পেলে আমি কখনও সে সুযোগ হাতছাড়া করি না। কেন করি না তার একটা কারণ আছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের বক্তৃতা শুনলে বুকে বল পাই। মনে সাহস জাগে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রায়ই তাঁর বক্তৃতায় রাখঢাক পছন্দ করেন না। অনেক কঠিন কথা সহজ করে বলে ফেলেন। তখন মনে হয়, আরে, এটা তো আমার, আমাদের মনের কথা। আর সে জন্য তাঁর বক্তৃতা শোনার জন্য আমি উদগ্রীব থাকি। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে যে কথাগুলো বলেছেন তা দেশের সাধারণ মানুষকে অনেক শক্তি জুগিয়েছে বলে আমার ধারণা। ‘রাজনীতি এখন গরিবের বউয়ের মতো’– মহামান্য রাষ্ট্রপতির এই উক্তি ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে দেশের সাধারণ মানুষের মনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রশংসা অব্যাহত রয়েছে। দেশের পাড়ামহল্লা, অফিস আদালত, বাসাবাড়িসহ সর্বত্রই মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রশংসা চলছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের ভাষণের বিশেষ বিশেষ অংশ আপলোড করে নিজেদের ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন।

কেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমাবর্তন ভাষণ এত পছন্দ হলো সবার? উত্তর খোঁজার জন্য আসুন মহামান্য রাষ্ট্রপতি কী বলেছেন তা আবার একটু দেখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তাঁর স্বভাবসুলভ রসবোধ আর নিজ নির্বাচনি এলাকা কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, ‘আমাদের গ্রামে একটা প্রবাদ আছে, গরিবের বউ নাকি সবার ভাউজ। অহনের যারা শহরে থাকেন তারা তো ভাউজ চিনবেন না। ভাউজ হইলো ভাবি। ভাইয়ের বউকে ভাবি ডাকি আমরা। গ্রামে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাবিদের ভাউজ ডাকা হয়। আর গরিবের বউ হলে মোটামুটি পাড়া বা মহল্লার সবাই আইস্যা ভাউজ ডাকে। এহন রাজনীতি হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। এখানে যে কেউ যেকোনও সময় ঢুকে পড়তে পারে। কোনও বাধাবিঘ্ন নেই।

প্রসঙ্গক্রমে উদাহরণ টানতে গিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলেছেন, আমি যদি বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকসের লেকচারার হইতাম চাই, নিশ্চয়ই ভিসি সাহেব আমাকে নিবেন না। বা কোনও হাসপাতালে গিয়া যদি বলি, এতদিন রাজনীতি করছি, হাসপাতালে ডাক্তারি করতে দেন। বোঝেন তখন অবস্থাটা কী হবে? এগুলো বললে হাসির পাত্র হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না। যদি বলি এত বছর রাজনীতি করছি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুপারিনটেনডেন্টের পদ দিতে পারো? সেখানে আমাকে দিবে? কিন্তু রাজনীতি গরিবের ভাউজ। সহজেই রাজনীতিতে ঢোকা যায়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মো. আখতারুজ্জামানের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভিসি সাহেবও অবসরের পর রাজনীতি করবেন। যারা সরকারি চাকরি করেন, জজ সাহেব যারা আছেন, ৬৭ বছর চাকরি করবেন। রিটায়ারের পর বলবেন আমিও রাজনীতিবিদ। আর্মির জেনারেল, সেনাপ্রধান, সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল, সেক্রেটারি, কেবিনেট সেক্রেটারি রিটায়ার কইর‌্যা বলেন, আমিও রাজনীতি করবো। কোনও রাখঢাক নাই। যার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা তখনই রাজনীতিতে ঢোকে। চাকরি করে যা করার করছে। তারপর বলছে রাজনীতি করবো। আমার মনে হয় সকল রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। হ্যাঁ, এক্সপার্টের দরকার আছে। অনেক সময় বলা হয় পেশাভিত্তিক পার্লামেন্ট। হ্যাঁ পেশাভিত্তিক করেন। এমবিবিএস পাস করে সরাসরি রাজনীতি করেন কোনও অসুবিধা নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরিতে না ঢুকে সরাসরি রাজনীতিতে ঢোকেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, এমনকি পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকতা ডিআইজি, আইজিরাও রাজনীতি করেন। মনে মনে কই রাজনীতি করার সময় এই পুলিশ, তোমার বাহিনী দিয়ে ‘পাছার’ মধ্যে বাড়ি দিছো। তুমি আবার আমার লগে আইছো রাজনীতি করতে? কই যামু? রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব ভাবতে হবে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিটি অংশই দেশের সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতিকে পজিটিভভাবে স্পর্শ করেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমাবর্তন ভাষণের পরের দিন ঢাকার মগবাজার মোড়ে একটি চায়ের দোকানের আড্ডায় সাধারণ মানুষের কিছু মন্তব্য কানে এলো। ‘ডাইরেক্ট রাজনীতির মধ্যে আইস্যা তারা ইলেকশন করবে, মন্ত্রী হয়ে যাবে, এটা যেন কেমন লাগে। যার জন্যই আমার মনে হয়, আমাদের দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হইতেছে না।’ মাননীয় রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার এই অংশ নিয়েই আলোচনা করছিল সবাই। চায়ের কাপে ঝড় তুলে ওই আড্ডায় সবাই রাষ্ট্রপতিকে সাধুবাদ জানালেন। ‘আমাদের প্রেসিডেন্ট ঠিকই বলেছেন। তাঁর কথায় যুক্তি আছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার বিবরণ দেশের সকল সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওই বক্তৃতার বিভিন্ন অংশ যতবারই পড়েছি ততবারই বিস্মিত হয়েছি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধায় মাথানত হয়েছে। আমরা যে যত কথাই বলি না কেন, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় রাজনীতিবিদরাই কিন্তু আমাদের মূল ভরসা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আপসহীন রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলেই ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা আন্দোলন শেষে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর তাই রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা। দেশ যখনই কোনও না কোনও সংকটের মুখে পড়েছে তখনই রাজনীতিবিদরা তাদের মেধা ও প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করেছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনীতি যেন একটু অন্যরকম। আপনি ঠিকই বলেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। রাজনীতি এখন গরিবের বউ। গরিবের সুন্দরী বউকে যেমন সবাই ভালোবাসতে চায়, তেমনি রাজনীতিও সবাই করতে চায়। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে গেলে লেখাপড়া করতে হয়। ডিগ্রি নিতে হয়। তারপর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে পাস করে নির্ধারিত পেশায় যুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু রাজনীতিতে কোনও যোগ্যতা লাগে না। টাকা আছে, প্রভাব প্রতিপত্তি আছে, তাহলেই এখন রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া সহজ। আর তাই ত্যাগী, নিষ্ঠাবান, শিক্ষিত, মানবিক বোধসম্পন্ন প্রিয় রাজনীতিবিদরা অনেক ক্ষেত্রে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন। ইদানীং দেখা যাচ্ছে রাজনীতিতে যারা যুক্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা, লেখাপড়ার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ভাবটা এমন, রাজনীতি করতে হলে লেখাপড়ার কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু স্লোগান দিতে পারলেই হলো। স্লোগান দিতে পারাটাই বড় যোগ্যতা। কিছুদিন আগে ঢাকায় একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশে উপস্থিত হওয়া কয়েকজন তরুণকে মাত্র ৩টি প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাদের ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ সম্পর্কে বলতে বলা হয়। কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেউ বলেছে স্বাধীনতা দিবস। আবার ২৬ মার্চকে কেউ বলেছে বিজয় দিবস। ১৬ ডিসেম্বরকে বলেছে স্বাধীনতা দিবস। কেন তাদের এ ধরনের প্রশ্ন করা হলো তা নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন কয়েকজন। তবে দেখা গেলো তারা নেতানেত্রীর নামে স্লোগান দিতে বেশ পটু!

মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আবারও স্বীকার করছি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় রাজনীতিবিদদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেল জীবনের ওপর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছেন দেশের জন্য একজন রাজনৈতিক নেতাকে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনকে অনুভব করুন তো একবার। কতটা প্রতিকূল পরিবেশে তিনি দেশের জন্য রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ভাবুন তো একবার। দেশের উন্নয়নের জন্য বিরামহীন পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি। এখন যারা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের উচিত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা। ‘হঠাৎ ইচ্ছে হলো আর রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে গেলাম’- রাজনৈতিক দলগুলোতে এমন সুযোগও থাকা ঠিক নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে রাজনীতিই এই দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে। কাজেই রাজনীতিতে সৎ, নিষ্ঠাবান, ত্যাগী মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি রাজনীতিতে ঢোকার ক্ষেত্রেও কিছু যোগ্যতা থাকা আবশ্যক।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবারও আপনাকে ধন্যবাদ সময়ের প্রয়োজনে কিছু সহজ কথা সহজভাবে বলার জন্য। কথায় আছে, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। কিন্তু আপনি সহজ কথা সহজভাবেই বলেছেন। দেশের সাধারণ মানুষ আপনার কথা শুনে বেশ খুশি। এখন দেখার পালা ভবিষ্যতে কাজের কাজ কিছু হয় কিনা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, স্যালুট আপনাকে!

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

 

/এসএএস/এমওএফ/

x