মাননীয় রাষ্ট্রপতি এবং প্রেমের চিঠি

আহসান কবির ১৯:২১ , অক্টোবর ০৯ , ২০১৮

আহসান কবিরমজাদার কথা বলতে পারতেন আমেরিকার এক সময়ের রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন। যেমন, এক নারী তার ছেলেকে নিয়ে আব্রাহাম লিংকনের কাছে গেলেন। ওই নারী জানালেন তার স্বামী লিংকনের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তিনি নিজেও লিংকনকে ভোট দিয়েছেন। তার ছেলের জন্য চাকরি চাইলেন। আব্রাহাম লিংকন উত্তর দিলেন, আপনার পরিবার অনেক করেছে আমার ও দেশের জন্য। এবার অন্যদেরও করতে দিন। এই নারীর মতো যুদ্ধ শেষে আব্রাহাম লিংকনের কাছে অনেকেই আসতেন সুবিধা নিতে। তাদের অনেককেই এই গল্পটা বলতেন লিংকন।
ভ্রমণে বের হওয়ার আগে এক রাজা মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, আবহাওয়ার খবর কী? ঝড়-বৃষ্টি হবে নাতো? মন্ত্রী জানালেন, না হবে না। কিছুদূর যাওয়ার পর এক ধোপার সঙ্গে দেখা হলো। ধোপা রাজার কাছে জানতে চাইলো অসময়ে কেন বের হয়েছেন? ঝড়-বৃষ্টি হবে একটু পর। রাজা বিশ্বাস না করে যাত্রা অব্যাহত রাখলেন এবং ঝড় বৃষ্টিতে পড়লেন। ফিরে এসে রাজা মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে সেই ধোপাকে মন্ত্রী বানালেন। ধোপা মন্ত্রী হওয়ার পর ভয়ে ভয়ে একদিন রাজার কাছে স্বীকার করলো যে, আবহাওয়া সম্পর্কে সে তেমন কিছইু জানতো না। ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার আগে তার গাধাটা কান নাড়াতো এবং ধোপা বুঝে নিতো যে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। রাজা তখন সেই ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাকে মন্ত্রী বানালেন। 
দয়া করে এই গল্পের ভেতর কেউ কোনও মোরাল বা মেসেজ খুঁজতে যাবেন না। কারণ একটি নির্ভেজাল মজাদার ও হাসির  লেখার দিকে এগিয়ে যেতে চাই আমরা। যদিও বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছেন রাষ্ট্রপতির কোনও কিছু করার ক্ষমতা না থাকলেও যেকোনও সরকারি আদেশের শুরুতে লেখা থাকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে।
তবে এই লেখাটা বেসরকারি। আশা করি তার অনুমতি না নিয়ে লেখাটাও তিনি মজা করে পড়বেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে আব্রাহাম লিংকনের একটা বিষয়ে চমৎকার মিল রয়েছে। সেটা হচ্ছে মজাদার কথা ও মন্তব্য। আব্রাহাম লিংকনের মতো আমাদের রাষ্ট্রপতিও অনেক মজা করে কথা বলতে পারেন। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ যা ইউটিউবে খুব সহজেই পাওয়া যায় সেগুলো শুনলে যে কারও হাসি পাবে, অনেকের মনও ভালো হয়ে যেতে পারে। ভালো মতো বেঁচে থাকার জন্য,বেশিদিন বাঁচার জন্য হাসির বিকল্প নেই। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমাদের হাসায়, আমাদের ভাবায়। কখনও কখনও আমরা জানতে পারি পরিসংখ্যান কিংবা কোনও কোনও বিষয়ের আসল সত্য। যেমন বাংলাদেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির সংখ্যা একশ। পাবলিক ইউনিভার্সিটির সংখ্যা বিয়াল্লিশ। এই একশ বিয়াল্লিশটা ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর আমাদের রাষ্ট্রপতি!
সমাবর্তনের ভাষণগুলোতে রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। ছাত্র রাজনীতির বিষয়টা নিয়েও মজা করে বলেছেন। যেমন, যারা ভালো ছাত্র ছিল তারা রাজনীতিতে জড়াতে চাইতো না। তাদের খোঁজ নিতাম। অসুখ হলে দেখতে যেতাম। এখন সব মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কেউ কারও খোঁজ নেয় না। চল্লিশ বছর পঁয়তাল্লিশ বছরের ছাত্ররা রাজনীতি করে। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাসের পরে বিয়ে করেছি। পঁচিশ বছরে কেউ বিয়ে করলে পয়তাল্লিশ বছরের সময়ে তার বিশ বছরের একটা ছেলে থাকতে পারে। ছেলের তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার কথা। তাহলে পঁয়তাল্লিশ বছরে যে ছাত্র রাজনীতি করে তার ছেলেরও তখন ছাত্র রাজনীতি করার কথা। বাপ ও ছেলে একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করলে কেমন দেখাবে? তাই যারা নিয়মিত ছাত্র, তাদেরই রাজনীতিতে আসা উচিত, তাদেরই কমিটিতে থাকা উচিত। মজা করে হলেও রাষ্ট্রপতি মনের কথা বলেছেন। ‘আদু ভাইদের’ ছাত্র রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা এখন থেকেই করা উচিত।
মজা করে কয়েকবার বলেছেন পুরুষ নির্যাতনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সংসদে যখন নারী নির্যাতন আইন পাস হয়, তখন তিনি মজা করে পুরুষ নির্যাতনের কথাও নাকি বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য ছিল হয়তো এমন–এখনই দরকার নেই বা কখনও পরিস্থিতি তৈরি হলে বিবেচনা করা যাবে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একান্নতম সমাবর্তনে প্রিয়াংকা চোপড়ার কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি। হিন্দি ছবির এই নায়িকা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশে এসেছিলেন।  নামি-দামি অতিথি বাংলাদেশে এলে তারা সাধারণত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন। তো রাষ্ট্রপতি তার স্ত্রীকে বললেন, এবার তো বঙ্গভবনে প্রিয়াংকা চোপড়া আসবে। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে বলেছিলেন  প্রিয়াংকা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার কী দরকার? শেষমেষ প্রিয়াংকা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসা ক্যানসেল!
এমনভাবে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ তার স্ত্রীকে নিয়ে মাঝে মাঝেই মজা করে থাকেন। নর্দার্ন ইইনিভার্সিটির সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, আমার স্ত্রী মনে করেন আমার হার্ট নেই। আমি হার্টলেস, নিষ্ঠুর হৃদয়ের মানুষ। হার্ট না থাকলে তো হার্টের সমস্যাও হওয়ার কথা না। আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে (২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে)  বলেছিলেন, সে আমার স্ত্রী অর্থাৎ ফার্স্ট লেডি। আমি অবশ্য সেকেন্ড থার্ড বা লাস্ট লেডি আর করতে পারলাম না। যেভাবে পাহারা দিয়ে রাখে! তবে এই সমাবর্তনে তিনি তার জীবনের একটি দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যারা খুনি মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলায়নি, তাদের জীবনে নেমে এসেছিল নিষ্ঠুর নির্যাতন। আব্দুল হামিদ গ্রেফতার হন। ১৯৭৬ সালের শুরুর দিকে তাকে কুষ্টিয়া জেলে পাঠানো হয়। সেখানে থাকার সময় তিনি জানতে পারেন, তিন পুত্রের পরে তার একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। তিনি তার কন্যার নাম রেখেছিলেন কুষ্টিয়ার আদি নামে। নদীয়া। এই জেল থেকে তাকে রাজশাহী জেলে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এক জেল থেকে আরেক জেলে যাওয়ার সময়ে ডানো দুধের কৌটায় এক হাজার টাকা নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজশাহী জেলে গিয়ে তিনি ধরা পড়ে যান। এই টাকা কেটে রাখা হয় এবং শাস্তিস্বরূপ তাকে রাখা হয় কনডেম সেলে। যেখানে থাকতে হতো একা, দিনের বেলায়ও অন্ধকার থাকতো, পাশেই ফাঁসির সেলের সবটা বোঝা যেতো। ভাবতেন একদিন না ফাঁসিতেই ঝুলতে হয়!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো সমাবর্তনে তিনি নিজ জীবনের একটা তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ১৯৬১ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন (তখন ছিল ম্যাট্রিকুলেশন) তৃতীয় বিভাগে। এইচএসসি বা ইন্টারমিডিয়েটেও তাই, এক সাবজেক্টে রেফার্ড! ডিগ্রি পাস করতে সময় নিয়েছিলেন আট বছর! মজা করে বলেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি ফরমটাও নিতে পারি নাই, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হয়ে গ্রাজুয়েটদের সামনে বক্তৃতা দিতে ভয় লাগে। তবে রাজনীতির সুবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো হলে গিয়েছি, থেকেছি। শুধু রোকেয়া হলে (মেয়েদের হল) থাকতে পারি নাই!
প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেই রাষ্ট্রপতি মজাদার কথা বলেছেন। ইউআইটিএসের তৃতীয় সমাবর্তনে পাঁচজনকে গোল্ড মেডেল দেওয়া হয় যার ভেতর চারজনই ছিল মেয়ে। একমাত্র যে ছাত্রটি গোল্ড মেডেল পেয়েছিল, তাকে রাষ্ট্রপতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, সে (গোল্ডমেডালিস্ট) পুরুষজাতের মান রেখেছে! ঢাকা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে পঁয়ত্রিশ জন ছাত্রকে গোল্ড মেডেল দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যখন তিনি স্বর্ণপদক দেন, তখন সেখানে ৭০-৭৫ শতাংশ মেয়েই সব স্বর্ণপদক নিয়ে যায়। তিনি হাস্যরস করে বলেন, আজকে একটু ভালো লাগছে। কারণ একজনও নেই। তিনি শেষে এও উল্লেখ করেন, তার মানে এই নয় যে, আমি নারীবিদ্বেষী। আমিও চাই তারা এগিয়ে আসুক।
আমাদের রাষ্ট্রপতি এমনই। মানুষকে হাসানোর পর ছোট্ট করে বলে ফেলেন আসল কথা। কিশোরগঞ্জের এক জনসভায় হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন যতদিন আইয়ুব খান আর তার দোসর মোনায়েমকে উৎখাত করতে না পারবো, ততদিন ডিগ্রি পরীক্ষাই দেবো না। আট বছর পরে ডিগ্রি পাস করলেও দুই বছর আগেই সেটা করতে পারতেন। পারেননি জেলে থাকার কারণে। মানুষের কাছ থেকেই তিনি রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন প্রচলিত লেখাপড়াটা তিনি সেভাবে হয়তো করেননি। দেশের মানুষ তাকে মনে রেখেছে, তিনি স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি হতে পেরেছেন। স্মরণসভাতেও তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। জাতীয় চার নেতার ভেতর শহীদ এম মনসুর আলীর স্মরণসভায় বলেছেন, নীতি আদর্শ আর স্টাইলিশ ব্যক্তিত্বের জন্য এম মনসুর আলীকে মনে রাখবে সবাই। তিনি সিগার খেতেন। এই সিগার বিদেশ থেকে আনতে হতো। আমি তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সুযোগ পেলেই সিগার সরাতাম। সত্য বলেছেন নির্দ্বিধায় যে, রাজনীতি এখন গরিবের ভাবী। যে যেভাবে পারছে রাজনীতিতে জড়াচ্ছে। রাজনীতিতে ‘হঠাৎ আগত’ শীতের পাখিদের নিয়ে ভেবে দেখতে বলেছেন সবদলকে!
 মজার মানুষ হিসেবে আপনাকেও আমরা মনে রাখবো মহামান্য রাষ্ট্রপতি! ছাত্রজীবনে প্রেমের চিঠি লেখার কথা বলেছেন। মোবাইল ব্যস্ততার এই সময়ে কেউ আর প্রেমের চিঠি লেখে না বলে আফসোস করেছেন। প্রেম আর প্রেমের চিঠি না থাকার কারণে সাহিত্যে এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। রাজনীতিতে হয়তো সবকিছু আছে মহামান্য রাষ্ট্রপতি শুধু মানুষের প্রতি প্রেমটাই কমে যাচ্ছে বলে মনে হয়। প্রেম-ভালোবাসা নেই একদলের সঙ্গে অন্যদলের। সংঘাতমুখর এই দেশের রাজনীতিতে প্রেম আসুক, আপনি চাইলে হতে পারেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।
আপনার প্রেমের বাঁশিতে সবদল অংশ নেবে নির্বাচনে, থাকবে না সংঘাত আর বিতর্ক। নাকি যা লিখছি শেষে তা অসম্ভব কল্পনা? রাজনীতিতে মোবাইল আছে, প্রেম বলে কিছু নেই?

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/

x