একুশে আগস্ট: একটি সরকারি জঙ্গি হামলা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ১৪:৪২ , অক্টোবর ১০ , ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজান্যায়-অন্যায়ের তাত্ত্বিক আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার বড় আকারে সামনে আসে। একটি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা, তা নির্ভর করে সামাজিক নিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর। নিয়মাবলি যদি যথাযথ হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উপযুক্ত হয়, তবে সমাজ ন্যায়সম্মত পথে চলবে। এই প্রতিষ্ঠান হলো রাষ্ট্র এবং তার পরিচালনার দায়িত্বে থাকে সরকার আর সেই সরকার গঠন করে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল বা জোট।
আর্থিক দুর্নীতি থেকে শুরু করে ক্ষমতার অপব্যবহার সবই করে ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু কেউ কোনও দিন কি ভাবতে পেরেছে এদেশে একটি দল ক্ষমতায় বসে দেশের প্রধান বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করতে জঙ্গিদের দিয়ে গ্রেনেড হামলা করবে? একুশ আগস্ট ছিল রাষ্ট্রীয় ও সরকারি উদ্যোগে, গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয় অংশগ্রহণে, একটি সফল জঙ্গি হামলা। এখন যে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ, তা এসেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ধারাবাহিকতায়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন ঘটনার অন্যতম হোতা হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামির (হুজি) প্রধান মুফতি হান্নান। জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান জানিয়েছিলেন, বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও পলাতক তারেক রহমানে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে তারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায়। জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান বলেন, ‘তারেক রহমান আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার নিশ্চয়তা দেয়।’

তিনি বলেন, ‘১৮ আগস্ট আমি, আহসান উল্লাহ কাজল, মাওলানা আবু তাহের আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসায় যাই। সেখানে আবদুস সালাম পিন্টু, বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ পরিবহনের হানিফ উপস্থিত ছিল। আবদুস সালাম পিন্টু ও লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ সাহেব আপনাদের সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করবে এবং আমাদের সকল প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। সে মোতাবেক ২০ আগস্ট মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল ও আহসান উল্লাহ কাজল আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করে বাড্ডার বাসায় নিয়ে আসে। ২১ তারিখ আগস্ট মাস, ২০০৪ইং আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলা চালাই।’

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে যা সম্পূর্ণ হয়নি, তা-ই করতে চেয়েছিল ঘাতকরা একুশে আগস্টে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টায় গ্রেনেড হামলা, হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, তদন্তের নামে জজ মিয়া আবিষ্কার, বিচার বিভাগীয় তদন্ত রসিকতা, ‘আওয়ামী লীগই করেছে, শেখ হাসিনা আঁচলের তলে করে গ্রেনেড নিয়ে গেছে’ বলে প্রচারণা চালানো, টেলিভিশন চ্যানেল থেকে জোর করে ফুটেজ নিয়ে যাওয়া এবং ধ্বংস করে ফেলা, এসবই করেছিল তারা, যারা আজ  খুব বেশি বেশি গণতন্ত্রের কথা বলে। এমনকি সংসদে এ নিয়ে আলোচনা পর্যন্ত করতে দেয়নি সরকারি দল, অথচ সেই সংসদেরই বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল।

বাংলাদেশে যারা সমঝোতার রাজনীতির কথা বলেন তাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়ে এমন সুশীল কথা বলতে হবে। ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট সেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, ১৯৭৫ সালের পর আবার এমন এক ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত করে দিয়েছে, যেখান থেকে আর বের হওয়ার পথ নেই, নেই কোন ধরনের সমঝোতারও।

১৪ বছর পর একটা রায় হলো, তাও নিম্ন আদালতের। রায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং হামলার সময়ে বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বুধবার পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর এবং এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রথম অভিযোগপত্র দাখিলের ১০ বছর পর রায় ঘোষণা হলো। এর আগে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শেষে রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আসামিপক্ষ সব আসামির বেকসুর খালাস দাবি করে। সেদিনই এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য তারিখ ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষে ৫১১ জনের মধ্যে ২২৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়।

বিচার শেষ হয়নি। এখনও অনেক ধাপ পার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সব গোয়েন্দা সংস্থার বড় কর্তারা এই জঘন্য পাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাদের কেউ জেলে, কেউ পলাতক। সত্যি বলতে কী, পাপের সব দায় বিএনপি-জামায়াত রাজনৈতিক নেতৃত্বের। তাদের নির্দেশনাতেই যে এই পাপ করা হয়েছিল, হামলা পরবর্তী ঘটনাক্রম তার প্রমাণ বহন করছে।

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ করতে এতদিন কেন লাগলো, সে এক বড় জিজ্ঞাসা। এরই মধ্যে চারটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, একাধিক বিচারক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। চার্জ গঠনের পরও মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ বিলম্বিত হয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমে এ দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের বাইরে থাকা এ মামলার পলাতক ১৮ আসামিকে এখনও ফিরিয়ে আনতে পারেনি সরকার।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালো অধ্যায়ের পরে এই ঘটনা জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এমন পাশবিক চেষ্টা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। এই একটি ঘটনার কারণে বাংলাদেশে কোনও দিন আর কোনও ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমঝোতা বা ঐক্য হবে না।

দেশের এখন যিনি সরকারপ্রধান, তার প্রাণনাশের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত মামলা এটি। এমন একটি মামলার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম মুখ্য কারণ হলো সাক্ষী না পাওয়া। আর সাক্ষীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হলো পুলিশ বিভাগের। প্রচলিত আইনে যথাসময়ে সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব প্রধানত প্রসিকিউশনের। কিন্তু তারা অব্যাহতভাবে অপারগ থাকলে বিচার বিভাগকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ আইনে দেওয়া আছে। 

এখন পর্যন্ত ঘটনাক্রম এবং তথ্য উপাত্ত জানান দেয়, তৎকালীন জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, সিআইডি ও পুলিশের তখনকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা পেশাদার খুনিচক্র, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এবং ভারতের ওপর এই হামলার দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের আহ্বানে বিদেশ থেকে আসা ইন্টারপোল ও এফবিআইয়ের বিশেষজ্ঞদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।

জোট সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরকে সে সময়ে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কোনও তদন্ত করতে নিষেধ করেছিলেন। তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার পছন্দের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের দিয়ে ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত করতে বলেছিলেন। সে তদন্ত প্রতিবেদন আর কোনও দিন প্রকাশ করা হয়নি। এখন কোথাও তা পাওয়াও যায় না। ২১ আগস্ট হামলার সঙ্গে জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ ছিল। জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তার সরকারি বাসভবনে এই হামলা নিয়ে বৈঠকও হয়েছিল। সেই আবদুস সালাম পিন্টু বিএনপিতে সমাদরেই আছেন। তাকে রাখা হয়েছে দলটি নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতেও, যেমন করে আছে যুদ্ধাপরাধীদের পুত্ররাও।

২১ আগস্ট হামলা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিকেই ধ্বংস করে দেওয়ার অপচেষ্টা ছিল। এ হামলা ঘটার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থাসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা-নিষ্ক্রিয়তা, এ সংক্রান্ত মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ন্যক্কারজনক তৎপরতা, বছরের পর বছর ধরে মামলার তদন্তকাজ অসম্পন্ন রাখা- এসবও অবশ্যই তদন্তের আওতাধীন হওয়া উচিত। নারকীয় এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী, হুকুমদাতা, ঘাতকদের বাঁচানোর ষড়যন্ত্রকারী কারা– এসব উদঘাটিত হওয়া খুবই জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে। দেশের ইতিহাসে এত বড় নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কুশীলবরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে– এটা কি মেনে নেওয়া যায়?

পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের হাতে সোপর্দ করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার সরকারের। এর আগে যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে, তেমনি গ্রেনেড হামলার বিচারও সম্পন্ন হবে, অপরাধীরা শাস্তি পাবে, এমনটাই চায় মানুষ।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

x