ব্যাংকিং খাতের ‘ফুটো’ বন্ধ করুন

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৪:৫৫ , অক্টোবর ১১ , ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীখেলাপি ঋণের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঘুণে ধরা কাঠের মতো অবস্থা হয়েছে। ঘুণে ধরা কাঠ দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু সজোরে আঘাত করলে ধসে পড়ে। জনতা ব্যাংকের অবস্থা নাকি এখন অনেকটা অচল। ঋণ করে চলছে। ব্যাংকটা লোকসান গুনছে। লোকসানি শাখাও নাকি বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অনিয়ম দুর্নীতির কারণে নেতিবাচক রেকর্ড করেছে। জনতা ছাড়া অগ্রণী, সোনালী, রূপালী, কৃষি, বেসিক ব্যাংকগুলো নাকি ২২ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। কারণ শীর্ষ খেলাপিরা ঋণ পরিশোধ করছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে বিশেষ সুবিধা দিয়ে প্রভাবশালীদের ঋণ পুনঃনবায়ন করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ লাখ ৫৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা। আর এ হচ্ছে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২৮ শতাংশ। ছয় মাস আগেও এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ২৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৫ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা ও রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে ৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ২২ শতাংশ।

জনতা ব্যাংক তার ক্লায়েন্ট ক্রিসেন্ট গ্রুপকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দিয়েছে তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বরাবরে। তার মাঝে পাঁচ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত ঋণের ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার পুরোটাই খেলাপি হয়েছে। এ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত বন্ধকী সম্পদ নিলামে বিক্রির আয়োজন করেছে জনতা ব্যাংক। নিলামে সম্পদ বিক্রি করে ৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা আদায় করতে চায় জনতা ব্যাংক। সম্পদের মাঝে রয়েছে হাজারীবাগের জায়গা, চামড়াজাত দ্রব্য, সাভারের জায়গা, যন্ত্রপাতিসহ কারখানা, আর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ১৬ শতাংশ জমি। এ সম্পদ বিক্রি করে ৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব নয়। ঋণের বরাবরে প্রদত্ত সম্পদের মূল্যমান তত হবে বলে মনে হয় না।

ব্যাংকগুলো ঋণের বরাবরে জামানত নেয় এমন সব সম্পত্তি যেগুলোর মূল্যমান দেখানো হয় বেশি। অনেক সময় নিষ্কণ্ঠক সম্পত্তি ও বন্ধক প্রদান করা হয় না। আমার জানামতে এক ব্যবসায়ী জামানতের সম্পত্তি দিয়েছে সরকারি রাস্তা। এ জমি তাদেরই ছিল কিন্তু সরকার ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগে এ জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তা তৈরি করেছে। অধিগ্রহণের কারণে জমি গেছে কিন্তু পুরনো দলিলগুলো তো তাদের কাছে রয়ে গেছে। এগুলোরই সদ্ব্যবহার করেছিল ওই ব্যবসায়ী। এ কর্ম একার পক্ষে করা নিশ্চয়ই সম্ভব হয়নি, ব্যাংকের কর্মকর্তা, ব্যাংকের উকিল সবাই এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে।

একটা বিষয় লক্ষ করেছি, ঋণগ্রহীতা সিকিউরিটির বরাবরে যেসব জমির দলিল দস্তাবেজ প্রদান করে, কোনও ব্যাংক কর্মকর্তা জমিগুলো সরজমিন দেখতেও যায় না। ছক্কা-পাঞ্জা খেলে ঋণ নেয়। শুধু বাংলাদেশে নয়, এ উপমহাদেশে এটা একটা সংস্কৃতি হয়ে গেছে। ভারত-পাকিস্তানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে উত্তম নয়। আমাদের অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের ‘নির্লজ্জ’ বলে অবহিত করেছেন। তিনি আরো একটি গল্পও বলেছেন। কোনও এক ঋণখেলাপিকে তিনি নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন ঋণ ফেরত দেন না কেন? ওই ব্যক্তি নাকি তাকে বলেছেন, ঋণ নিতে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে গেছে, এ জন্য সে ঋণ ফেরত দেবেন না।

জুতার তলার কথা বলেছে, কিন্তু ১০%  যে খরচ হয়েছে সে কথা সে বলেনি। আসলে দোষ শুধু ঋণগ্রহীতার নয়, ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও অনেক দোষ আছে। ঋণ প্রদানের সময় তারাই ১০ শতাংশ সবাই মিলে নিয়ে নেয়। প্রত্যেক ব্যাংকের দালাল আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক এমডি/চেয়ারম্যান পর্যন্ত। অবশ্য পুরনো নিয়মিত বড় ঋণগ্রহীতার ব্যাপারে পারসেন্টেজ হিসাব করা যায় না। তারা খুশি হয়ে যা দেয়।

একটা বিষয়ে লক্ষ করেছি, ব্যাংক ঋণ দেওয়ার পর ব্যাংকের কোনও মনিটরিং থাকে না- ঋণ নিয়ে সে কি ব্যবসা করছে না বাড়ি গাড়ি করছে। গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্য এনজিওগুলো তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণগুলো প্রত্যক্ষভাবে মনিটরিং করে থাকে, যে কারণে গ্রামীণ দরিদ্র মহিলাকে ঋণ দেওয়ার পরও তা কখনও খেলাপি হয় না। মাঝে মাঝে আমরা পত্রিকায় খবর দেখি ঋণের জন্য ঘরের টিন নিয়ে যাচ্ছে। তবে তা কোনও নিয়মিত ঘটনা নয়, কদাচিৎ অনুরূপ ঘটনা ঘটে থাকে।

আদায়ের ব্যাপারে কঠোর না হলে জামানত ছাড়া ঋণের তো কোনও মা-বাবা থাকতো না। কিন্তু সিডিউল ব্যাংকগুলোর কোনও মনিটরিং নেই এবং আদায়ের কোনও তাগিদও নেই। ১৯৮২-৮৩ সালে দেখেছি জনতা ব্যাংক নিউমার্কেট শাখায় বহু ট্যানারি তাদের ক্লায়েন্ট ছিল। কোরবানির সময় কোটি কোটি টাকা চামড়া কেনার জন্য প্রত্যেক ট্যানারিকে ঋণ প্রদান করা হতো। তখন হোয়াইট ব্লু চামড়া এক্সপোর্ট করার নিয়ম ছিল। সাধারণত হোয়াইট ব্লু এক্সপোর্ট হতো চীনে। চীনের এজেন্ট প্রত্যেক ট্যানারিকে কত ব্যাগ হোয়াইট ব্লু রফতানি করবে তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্থির করে এলসি দিতো।

জনতা ব্যাংক নিউমার্কেট শাখার ম্যানেজার ছিলেন মহিউদ্দিন সাহেব। তাকে দেখেছি কাঁচা চামড়া কেনা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে শিপমেন্ট পর্যন্ত তিনি ভিজিলেন্ট থাকতেন। হাজারীবাগের তার ক্লায়েন্ট ট্যানারিগুলোতে কোরবানির সময় চামড়া কেনা থেকে শিপমেন্ট পর্যন্ত তিনি যাতায়াত করতেন। ব্যাংক কাঁচা চামড়া কেনার জন্য যত টাকা দিয়েছে তার সমপরিমাণ চামড়া কিনেছে কিনা তাও প্রত্যক্ষ করতেন। মহিউদ্দিন সাহেবের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনও ট্যানারি মালিকের পক্ষে টাকা সরানো সম্ভব হতো না। আমি জনতা ব্যাংকের ক্লিয়ারিং এজেন্ট ছিলাম। জনতা ব্যাংক নিউমার্কেট শাখার সব এক্সপোর্ট আমার মাধ্যমে হতো, তাই আমি এসব কর্মকাণ্ড দেখেছি। অনেক সময় মহিউদ্দিন সাহেব এক্সপোর্টের পর লোক পাঠিয়ে সব ট্যানারির শিপিং ডকুমেন্ট আমার কাছ থেকে আনিয়ে নিতেন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে চায়না ব্যাংকে শিপিং ডকুমেন্ট পাঠিয়ে টাকা কালেকশন করার ব্যবস্থা করতেন। টাকা এলে ব্যাংক তার ঋণের টাকা কেটে রেখে দিতেন।

আমি বহুদিন মহিউদ্দিনের শাখার এক্সপোর্টের কাজ করেছি। শুনেনি কোনও ট্যানারি ঋণখেলাপি হয়েছে। মহিউদ্দিন সাহেব বেঁচে আছেন কিনা জানি না, তবে তারাই ছিলেন আদর্শ ব্যাংকার। তার কারণে সম্পূর্ণ শাখাটাই কর্মচঞ্চল থাকতো। আসলে ব্যাংক দুর্ভোগের সম্মুখীন হয় যারা ব্যাংক চালায় তাদের অযোগ্যতার কারণে, তাদের অসততার কারণে। নিজে কিছু পেতে চায় এ কারণে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা লুটেরাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিলে তো ব্যাংক দেউলিয়া হবে। ব্যাংক হলো টাকার খেলা। কঠোর মনিটরিং পদে পদে প্রয়োজন। পাকিস্তানের সময়ে দেখেছি রিজিওনাল অফিস থেকে ব্রাঞ্চে হঠাৎ ঊর্ধ্বতন অফিসার এসে ক্যাশ চেক করে যেত। এতে প্রত্যেকে ভয়ের মাঝে থাকতো। পান থেকে চুন খসা মুশকিল ছিল।

পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কন্ট্রোলার অব সিডিউল ব্যাংক ছিল, তারা কঠোরভাবে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা অর্থ-মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশনের আধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। সব সময় দ্বৈতশাসন ভালো ফল দেয় না। এখন ব্যাংক ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ লোক দিয়ে কমিশন গঠন করে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে তার একটা বিহিত ব্যবস্থা হওয়া দরকার।

ফার্মার্স ব্যাংকের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব বলেছিলেন, বাংলাদেশে ব্যাংক দেউলিয়া হয় না। বছর বছর অর্থ মন্ত্রণালয় হাজার হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দিলে ব্যাংক দেউলিয়া হবে কেন? গত বাজেটেও সম্ভবত দুই হাজার কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি প্রদানের জন্য সরবরাহ করা হয়েছিল। জনসাধারণের টাকা এভাবে নির্বিকারে প্রদান করা কৃতিত্বের কথা নয়।

খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ার পেছনে রিট প্রদান বড় সমস্যা। রিটের কারণে অর্থ-ঋণ আদালতের রায়ের পরও ৬২ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। হাইকোর্টে ঋণখেলাপিদের রিট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক দুটি বেঞ্চের দরকার। বিষয়টি দ্রুত সম্পন্ন হলে ব্যাংকের জন্য মঙ্গল হয়।

এ বছরের শেষে নির্বাচন। কোন দল সরকার গঠন করে জানি না। নির্বাচনের পরে যে দলই সরকার গঠন করুন না কেন, সর্বাগ্রে ব্যাংকিং খাতে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। তলাবিহীন পাত্রে পানি ঢেলে লাভ কী? জরুরি ভিত্তিতে পাত্রের ফুটো বন্ধ করা দরকার।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

x