বিদ্বেষ নয়, রোহিঙ্গাদের জন্য চাই সহানুভূতি

চিররঞ্জন সরকার ১৪:৩২ , অক্টোবর ১২ , ২০১৮

 

চিররঞ্জন সরকারদুর্জনের ছলের অভাব হয় না। যেমন হচ্ছে না মিয়ানমারের ক্ষমতাসীনদের। তারা নানা রকম ছুঁতোনাতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুটি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে। উল্টো বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চাইছে। সর্বশেষ তারা বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে তাদের জনসংখ্যাবিষয়ক একটি ম্যাপে সংযুক্ত করে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের কড়া প্রতিবাদের মুখে আপাতত মিয়ানমারের মানচিত্র থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে সরিয়ে দিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই এমন কারাসাজিতে মেতে উঠেছে মিয়ানমার? প্রশ্নটা বিশেষজ্ঞ মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।

মিয়ানমার ভয়ানক রকম অশিষ্ট আচরণ প্রদর্শন করছে। এ ব্যাপারে তারা আন্তর্জাতিক মহলকেও খুব একটা তোয়াক্কা করছে না। বাংলাদেশে যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদের ফেরত নিতে কয়েক দফা বৈঠকের পর এ বছরের শুরুতেই মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। যেখানে তালিকা অনুযায়ী ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজি হয় মিয়ানমার। বাংলাদেশ থেকে প্রথম দফায় একটি তালিকা হস্তান্তর করলেও পরে সেখান থেকে একজনকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।

সরকারের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ এবং মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না। একের পর এক আলোচনা, চুক্তি, তালিকা হস্তান্তর, যাচাই-বাছাইসহ নানা কিছুর পরও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সেই অর্থে অগ্রগতি নেই। সুষ্ঠুভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মিয়ানমারের প্রস্তাব বা শর্ত মেনে নেওয়া হলেও দেশটি একের পর এক নানা অজুহাত অব্যাহত রেখেছে। একদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে অন্যদিকে সংখ্যায় কম হলেও রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত রয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকে সমালোচনাও শুরু করেছে। সরকার খাল কেটে কুমির এনেছে বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষেরা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ক্রমেই বিরূপ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। কিছু মানুষ এবং কোনও কোনও গণমাধ্যম এ ব্যাপারে উসকানি দিয়ে চলেছে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বিভিন্ন নেতিবাচক খবর প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলতে চাইছে। এ ব্যাপারে সতর্ক ও সহানুভূতিশীল মনোভাব পোষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে একাত্তরে আমাদের দেশের মানুষও উদ্বাস্তু হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা যদি একটু মানবিক মূল্যবোধের চেতনা নিয়ে পেছন ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জনজাতির ইতিহাস বয়ে বেড়াচ্ছে উদ্বাস্তু মানুষের পুড়ে যাওয়া মনের দগদগে ক্ষত। নিজের জন্মভূমি, কর্মভূমি, নিজের ঘর ছেড়ে রোহিঙ্গারা বেড়াতে বেরোননি ২০১৭ সালে। খোঁজ নিন ওরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন কেন? কী তাদের অপরাধ? কেন রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জাতিসংঘ সভ্যতার অন্যতম জঘন্য গণহত্যার তকমা দিয়েছে? মিয়ানমার সরকারকে কেন সারা বিশ্ব ধিক্কার জানাচ্ছে, রোহিঙ্গা গণহত্যাকে তুলনা করা হচ্ছে হলোকাস্টের সঙ্গে?

রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মানুষ, অধিকাংশই নারী ও শিশু, মূলত বাংলাদেশে আশ্রিত। রোহিঙ্গারা আজ ভীত, সন্ত্রস্ত। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের এক শিশুর ভাষায়, “আমার পাড়ার বন্ধুরা কোথায় সব হারিয়ে গিয়েছে। এখানে অনেক আমার বয়েসের বাচ্চা আছে। বন্ধু হয়নি। আমরা খেলতে পারি না তো। কাউকেই বিশ্বাস হয় না। খুব ভয় করে। আমি কি আর কখনও খেলব না?” রোহিঙ্গা শরণার্থী  শিশুদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে বলা কথাগুলো আরও একবার প্রমাণ করে, যেকোনও রকম বিপর্যয়ে, প্রাকৃতিক হোক বা রাজনৈতিক, বিনষ্ট হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। 

হ্যাঁ, এ জন্য আমাদের সহমর্মী হতে হবে। হয়তো আরও দীর্ঘকাল রোঙ্গিাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি ও সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর জন্য আমরা অনেক কিছুই করেছি, করছি। তাদের কঠিন অবস্থায় পাশে দাঁড়ানোর জন্যে দেশের অধিকাংশ মানুষ চেষ্টা করেছেন। রোহিঙ্গারা নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, এটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত। অসহায়, নিঃস্ব, অত্যাচারিত ও স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো মানুষ হিসেবে ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মানবিক দায়িত্ব। অবশ্য এ দায়িত্ব পালন করা যে কোনও মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ বাধ্য করতে পারে না। দেশ বা দেশের বাইরের সব মানুষের বিপদে পাশে থাকাটা মানুষ হিসেবে আমাদের নৈতিক কর্তব্য। এখানে ধর্ম, জাতপাত খোঁজা ঠিক নয়। 

এবার ক্ষুধার তাড়নায় অনেক রোহিঙ্গা হয়তো চুরির আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে, সেটা যেমন অবশ্যই অপরাধ, তেমন দু-একটা ঘটনা শুনে সমগ্র রোহিঙ্গাদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়াটাও অপরাধ। আর চাহিদা মতো টাকা বা সাহায্য না পেলে আমাদের এলাকাতেও অনেক ভিক্ষুক গালিগালাজ বা কটূক্তি করে চলে যায়। আমরা তখন কিছুটা রেগে গেলেও তাদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখি।

এই বিপর্যয়ে জাতিসংঘ, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা তাদের সামর্থ্য ও ক্ষমতা অনুযায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে আর এই সমস্যা মোকাবিলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠান শুধু জীবনধারণ ও রক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশের সমাজ যদি এই ভীতসন্ত্রস্ত মানুষদের আত্তীকরণ না করে, শুধুই যদি তাদের বহিরাগত বা আশ্রিত মনে করে, তবে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষদের, বিশেষত শিশুদের কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে না।

গ্লোবাল ইকোনমির দাপটে আমরা বিদেশি পণ্যে অভ্যস্ত হচ্ছি অথচ অন্য দেশের পীড়িত, বিতাড়িত মানুষকে পড়শি করে নিতে পারছি না। আসলে আমরা সবাই স্বার্থপর। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে আঘাত লাগলেই খেপে উঠি। আজ যাদের ভালোবাসা দিলে কাল আপনার সঙ্গী হতে পারত, আপনার সংকীর্ণতা, সন্দিগ্ধ চিত্ত ও ঘৃণা তাদের ঠেলে দিতে পারে বিপন্নতার অন্ধকারে।

হতাশ ও বিপন্ন মানুষ যদি তখন হাতে তুলে নেয় প্রতিহিংসার অস্ত্র, তারা সন্ত্রাসবাদী? নিপীড়িত মানুষের হাহাকার, করুণ আকুতি যখন ক্ষমতার প্রাচীর টলাতে ব্যর্থ হয়, তখনই শুরু হয় অধিকার কেড়ে নেওয়ার লড়াই। তখন তারা উগ্রপন্থী? মাথা নুইয়ে ভিক্ষে চাইলে আপনি খুশি। চোখ তুলে তাকালেই ওরা সমাজবিরোধী? ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে এ রকম সব বিপর্যয়েই শকুনের চোখ নিয়ে অপেক্ষা করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মৌলবাদীরা। ঘৃণার আগুনে জারিয়ে নিয়ে এরা এই বিপন্ন মানুষগুলোর মনে সঞ্চার করে প্রতিহিংসার লালসা। অধিকার রক্ষার লড়াইও অনেক সময় উল্টোপথে গমন করে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে হেরে গিয়ে।

অথচ ভেবে দেখলে এই সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিলাম আমি, আপনি, উভয়ে মিলে। একটু সহানুভূতি—অর্থ নয়—এদের স্বাভাবিক জীবন দিতে পারতো। জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত মানুষ মাত্রেই ফিরে যেতে চায় তার ফেলে আসা ভিটায়। কে চায় আশ্রিতের জীবন? পরিচিতিহীনতার জীবন? হয়তো কোনও এক নীল ভোরবেলা রোহিঙ্গারাও তাদের দেশে ফিরে যেতে পারবে। তাদের শস্যশ্যামলা দেশ তাদের নিভৃত আরাম দেবে। তবু তার আগে আসুন ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতো, পড়শির মতো মিশি। ওদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা ও সহানুভূতির প্রকাশ যেন কখনও নিঃশেষ হয়ে না যায়।

লেখক: কলামিস্ট।

 

/এমওএফ/

x