গ্রেনেড হামলা মামলায় অপরাধীরা কি শাস্তি পাবে?

মোস্তফা হোসেইন ১৬:১৫ , অক্টোবর ১২ , ২০১৮

মোস্তফা হোসেইন

অপরাধীদের শাস্তি কি নিশ্চিত করা যাবে? এমন প্রশ্ন এসে গেছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার পরপরই। গ্রেনেড হামলা মামলায় অন্যতম অপরাধী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন নিজ দল পরিচালনার মাধ্যমে। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ও চেয়েছেন। সেই লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশের পাসপোর্টও জমা দিয়েছেন যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে। তিনি কি স্বেচ্ছায় আসবেন? সম্ভাবনার হার শূন্য।

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার কথা বলে তিনি আদালত থেকে জামিন নিয়ে যুক্তরাজ্যে যান। ওখানে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার পরও তিনি দেশে ফেরেননি। যদিও চিকিৎসা শেষ করে তার দেশে ফিরে আদালতে হাজির হওয়ার কথা ছিল। সে রকম অঙ্গীকার তিনি করে গেছেন আদালতে। এরমধ্যে বিএনপির ভিতরেও গুঞ্জন হয়েছে একাধিকবার, তিনি ফিরে আসছেন। পল্টন থেকে রিজভী সাহেবও বলেছেন অনেকবার, তারেক রহমান দেশে ফিরলে লাখ জনতার ঢল নামবে বিমানবন্দরে।

সরকারও অনেকবার বলেছে, তারেক রহমানকে দেশে আনার জন্য তারা ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু গত বছর এপ্রিলে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক স্পষ্ট বলেছেন, যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। অন্যদিকে গত মাসেও আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবরের আগেই তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হচ্ছে। বাস্তবতা, তাকে আনা যায়নি কিংবা তিনিও আইনি লড়াইয়ের জন্য দেশে আসেননি। স্বেচ্ছায় দেশে আসবেন এমন সম্ভাবনাও কম। সুযোগ গ্রহণ করছেন সে দেশের আইনের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেকেই মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। এবং তাদের দেশে আশ্রয় গ্রহণকারী যদি তার দেশে ফিরলে জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে ফেরতও পাঠায় না। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তবে যেহেতু তারেক রহমান মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাননি, তখন হয়তো বাংলাদেশ তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে।

গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্য গেলে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারেক রহমান তারও আগে দণ্ডিত অপরাধী হিসেবে আদালতে সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি প্রয়োজন তা নয়। যুক্তরাজ্যে বসে বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্ত হচ্ছে একটি চক্র দ্বারা। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলবদর নেতা চৌধুরী মইনুদ্দীন প্রায় ৪৫ বছর ধরে অবস্থান করছে সেখানে। সে তার বাহিনীর মাধ্যমে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে একাত্তরেই পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর একপর্যায়ে সে যুক্তরাজ্যে চলে যায়। সেখানে থেকেই অধ্যাপক গোলাম আযমের সঙ্গে মিলে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিল। ওই অপরাধীকে বাংলাদেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করা জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হওয়ার পরও তাকেও আনা যাচ্ছে না বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকার কারণে। এবং দেশে এনে চৌধুরী মইনুদ্দীনের ফাঁসি কার্যকর করা হবে, এমনটা ভেবেই সে দেশ তাকে ছাড়তে চাইছে না।

তারেক রহমান শুধু মানি লন্ডারিং মামলায় কিংবা গ্রেনেড হামলা মামলায়ই অপরাধী নয়, সে ওখানে অবস্থান করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে এখনো মামলা হয়েছে বলে জানি না। কিন্তু সেই অপরাধেও তার বিচার হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশবিরোধী চক্রের সঙ্গে তারেক রহমানের যোগসাজশ আছে কিনা জানি না। কিন্তু যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের চিহ্নিত অপরাধীরা বসবাস করে এক্ষেত্রে দ্বিমত থাকার কোনও কারণ নেই। যদি এই অপরাধীদের দেশে আনার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিরোধীদের স্বর্গরাজ্য হবে যুক্তরাজ্য। আবারও বলতে হয়, সেটা হবে একটা চুক্তি না থাকার কারণে।

যুক্তরাজ্য সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কারণেও কেন আজ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হয়নি তা বোঝা যাচ্ছে না। ইতিহাসের নৃশংস ঘটনায় যুক্তদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির রায় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের কৃতিত্ব পরিপূর্ণ হয়নি অপরাধীদের অনেকের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায়।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজন এখনও বিদেশে অবস্থান করছে। খুনি নূরের অবস্থানসহ কয়েকজনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন তাদের দেশে আনা যাচ্ছে না তাও অজানা। কিন্তু দেশে ভবিষ্যতে এ ধরনের নারকীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় বুধবার ঘোষণার পরও একথা কেউ বলতে পারছে না যে তারেক রহমানসহ অন্য অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কিনা।

যেহেতু যুক্তরাজ্য সরকার বন্দিবিনিময় চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করে, তাই যথাযথ উদ্যোগ নিলে আশা করা যায়, অতি দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বর্তমান সরকার এটি না করলে আর কখনো হবে বলে মনে হয় না। যদি কোনও কারণে এই সরকার পুনর্নির্বাচিত না হয় তাহলে অপরাধীরা শাস্তি ভোগ থাক দূরের কথা, তাদের দেখা যাবে অশূর রাজাকারের চরিত্রে। খুনিদের সহযোগিতার এবং পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস তাদের আছে।

যে আলবদর চৌধুরী মঈনুদ্দীন আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সেই মঈনুদ্দীনকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে দেশে আসতে দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশবিরোধী ওই নরহত্যাকারীকে বাংলাদেশের পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করেছিল। সেই দল যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে চৌধুরী মঈনুদ্দীন কিংবা তারেক রহমান কি আর সেখানে আত্মগোপনে থাকবে? এই ব্যক্তিরা যদি বীরের বেশে দেশে আসে তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে তা কি ভাবা যায়?

তারেক রহমানের দল আইনি লড়াইয়ে আদালতে হেরেছে। সরকার পক্ষ জয়ী হয়েছে। এই জয়কে স্থায়ী করতে হলে অপরাধীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। আর তা অতি দ্রুত করতে হবে।

তাই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হওয়ার পরই সন্তুষ্টির তেমন কিছু নেই। কারণ, এখনও অপরাধীরা জানতে পারছে খুন করে কোনোভাবে দেশত্যাগ করতে পারলেই হলো। তারপর কে আর নাগাল পায়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক। 

 

/ওএমএফ/

x