সেই চেহারা এই চেহারা!

রেজানুর রহমান ১৪:১৮ , নভেম্বর ০৮ , ২০১৮

রেজানুর রহমানসোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক শোকরানা সমাবেশ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। সমাবেশে যোগদানকারী মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক ও সম্মানিত আলেমগণ যে যার মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকটি দিয়ে ছাত্র-শিক্ষক ও আলেমদের মধ্যে যারা বেরিয়ে আসছিলেন তাদের চোখ-মুখ দেখে অনুমান হচ্ছিলো তাদের মধ্যে অনেকেই বোধকরি রাজধানী শহরে নতুন এসেছেন। বিশেষ করে ছাত্রদের অনেকের চোখে-মুখে অপার বিস্ময় খেলা করছিল। কারণ, চোখের সামনে যা দেখছে বোধকরি সবকিছুই তাদের কাছে নতুন। টিএসসির সামনে গোলচত্বরের ভাস্কর্যটির দিকে অনেকেই বিস্ময় ভরা চোখে তাকাচ্ছিলো। সাহস করে একজন ছাত্র ভাস্কর্যটিকে পেছনে রেখে নিজের মোবাইলে সেলফি তোলা শুরু করা মাত্রই আশপাশে দাঁড়ানো অন্যরাও একই কায়দায় মোবাইলে সেলফি তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষক। তাদেরই একজন ছাত্রদের সাথে সেলফি তুলতে শুরু করলেন। অপার বিস্ময়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। মনে হচ্ছিলো অচলায়তন ভেঙে যাচ্ছে। ধর্মীয় গোড়ামির মোড়কে তৈরি করা অদৃশ্য বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে মানবিক আধুনিকতা আলো ছড়াতে শুরু করেছে। ভাস্কর্য আর মূর্তি যে একই বিষয় নয়, বোধকরি তা বুঝতে পেরেছে মাদ্রাসায় পড়ুয়া আমাদের মেধাবী সন্তানেরা। কী যে ভালো লাগছিল! এগিয়ে গিয়ে একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই তুমি যে এভাবে ছবি তুলতেছ এটা তো শরিয়তবিরোধী। মূর্তির সামনে ছবি তুলতেছো...? আমার হঠাৎ প্রশ্নে প্রথমে সে একটু ভয় পেয়েছিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, কে বলেছে এটা মূর্তি? এটাতো ভাস্কর্য! ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা শরিয়তবিরোধী না! বলতে বলতে অন্যদের সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো ছেলেটি!

আমি যারপরনাই অভিভূত। ছেলেটির কথায় এতটাই দৃঢ়তা ছিল যে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধার পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়ে গেলো। ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। ষাটের দশকে আমি ভর্তি হয়েছি স্কুলে। আর আমার ফুফুর ছেলে ভর্তি হয়েছিল মাদ্রাসায়। সন্ধ্যায় একই বাড়ির আঙিনায় শীতল পাটি বিছিয়ে লণ্ঠনের আলোয় দুজনই ক্লাসের পড়াশুনা মুখস্থ করতাম। কোনও ভেদাভেদ নেই। বরং আমার ফুফা আমাকে পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন। বাবা উৎসাহ দিতেন তার ভাগ্নেকে। ভালো রেজাল্ট করার সাহস জোগাতেন তারা। বড়বেলায় এসে হঠাৎ কেন যেন মনে হলো স্কুল আর মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে কোথায় যেন একটা অলিখিত বিভাজন শুরু হয়েছে।

আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে দৈনিক ইত্তেফাকে। একটানা ১৯ বছর দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা করেছি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছিল আমার সাংবাদিকতার প্রধান বিষয়। আর তাই সারাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর ওপর আমার নজর ছিল বেশি। সে সময় খেয়াল করেছি সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে কোথায় যেন এক ধরনের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। মাদ্রাসা শিক্ষা মানেই নিয়ন্ত্রিত জীবন। এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না। আর সাধারণ শিক্ষায় স্বাধীন জীবন। যত পারো সৃজনশীল কাজে নিজেকে বিকশিত করো। সৃজনশীল কাজ মানে নাচ, গান, চিত্রকলা, অভিনয় ও নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যাপক আপত্তি মাদ্রাসা শিক্ষায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা থাকতেই পারে। কিন্তু যুগের বিচারে প্রগতির জানালা তো বন্ধ রাখা উচিত নয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয়েছে’। তার মানে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সমমর্যাদা লাভ করলো কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরায়ে হাদিস’। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরির জন্য উভয়ই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। কাজেই সাধারণ শিক্ষায় যেসব বিষয় পড়ানো হয় সেসব বিষয় তো মাদ্রাসা শিক্ষায়ও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বোধকরি এটাই সময়ের দাবি। মাদ্রাসা শিক্ষায় যারা পাঠদানে জড়িত থাকেন তারা বোধকরি অধিকাংশই এই মনোভাব পোষণ করেন যে ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে একচুলও নড়া যাবে না। কিন্তু সময়ের প্রয়োজন বলে একটা কথা আছে। আমরা মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি এই যে এত নির্ভরশীল হয়ে উঠেছি, এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন কী বলে? ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্কস জুকার বার্ক আমাদের ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী নন। কিন্তু তার আবিষ্কারের সুফল তো ভোগ করছি। এটাকেই বলে যুগের দাবি। টিএসসির সামনে ভাস্কর্যকে সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাসার ছাত্ররা এই যে সেলফি তুললো, এটাও কিন্তু যুগেরই দাবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে গোটা পৃথিবী এখন একজন সাধারণ মানুষেরও হাতের মুঠোয়। সেখানে কোনও শিক্ষার্থীকে এক্ষেত্রে বিধিনিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা ঠিক হবে না। তাকে জ্ঞান আহরণের সুযোগ করে দিতে হবে।

একটি পত্রিকায় দেখলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা সমাবেশে যোগদানের পর মাদ্রাসার অনেক ছাত্র জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও গিয়েছে। তার মানে তাদের শেখার ও দেখার আগ্রহ প্রচুর। কাজেই তাদের এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রদান করা প্রতিটি মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। অভিযোগ আছে, দেশের অনেক কওমি মাদ্রাসায় প্রাত্যহিক শিক্ষাকার্যক্রম শুরুর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় না। এটা ঠিক নয়। দেশের প্রতিটি মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা সময়েরই দাবি। পাশাপাশি ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালনের ক্ষেত্রেও প্রতিটি মাদ্রাসাকে আন্তরিক হতে হবে।

শেষে একটি ভালো লাগার কথা বলি। কয়েক বছর আগে মাদ্রাসার এই ছাত্ররাই দলবেঁধে ঢাকায় এসেছিল। সেদিন তাদের অনেকের চেহারা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি দেখে কিছুটা শঙ্কা জেগেছিল মনে। ভেবেছিলাম ওরা তো আমাদেরই সন্তান। ওদের ব্যাপারে মনে এত শঙ্কা হচ্ছে কেন? এবার ওদের দেখে সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। দেশকে ভালোবেসে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ওরা মানবিক পরিবেশে বেড়ে উঠুক, সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই প্রার্থনা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এমওএফ/

x