নির্বাচন ২০১৮: কী গুণগত পরিবর্তন হলো রাজনীতির?

মাসুদা ভাট্টি ১৬:২৩ , ডিসেম্বর ০৪ , ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিহিরো আলমকে দিয়েই শুরু করা যাক। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে নিজস্বতায় (এ নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে) উত্তীর্ণ হয়েছেন। মানুষ ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ চায়, হিরো আলম সেটা দিয়ে থাকেন। সে কারণেই তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এই জনপ্রিয়তাকে তিনি রাজনীতিতে বদলে দিতে চেয়েছেন। একইসঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছেন। তাতে কোনও দোষ নেই। কিন্তু রাজনীতিকে তিনি একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্নটি হলো—চাইলেই কি যে কেউ, যেকোনোভাবে, যেকোনও উদ্দেশ্যে, যেকোনও উপায়ে, যেকোনও দলে যোগ দিয়ে বা দলে যোগ না দিয়ে রাজনীতিতে নামতে পারেন? হিরো আলমের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছেটাই যে কেবল এসব প্রশ্ন উসকে দিয়েছে, তা নয়; বরং হঠাৎ করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনকেও আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আলোচনায় নিয়ে আসতে পারি। কারণ, ড. কামাল হোসেন আজীবন যে রাজনীতি করে এসেছেন, তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির কোনও মিল যেমন নেই, তেমনি তার সঙ্গে যারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই রাজনৈতিক পরিচয় বঙ্গবন্ধুর সৈনিক তথা আওয়ামী লীগার হিসেবে। ফলে তারাই যখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিংবা নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মাঠে নামেন, তখন এই প্রশ্নটিই মুখ্য হয়ে ওঠে যে, চলমান নির্বাচন আসলেই কি আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগই হচ্ছে? কিংবা আওয়ামী লীগের বিকল্প কি আওয়ামী লীগই?

বিএনপি নামক রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমটি আওয়ামীবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কোনও দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম উদাহরণ। কারণ, কোনও আদর্শ নয়, কোনও অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম নয়, এমনকি নয় কোনও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যও; কেবল আওয়ামীবিরোধিতার নাম দিয়ে দেশের ডান-বাম-ধর্ম সবভিত্তির রাজনীতি এক হয়ে মিশেছে গিয়ে বিএনপির পতাকাতলে। জেনারেল জিয়াউর রহমান এটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, সব আওয়ামীবিরোধী পক্ষকে একত্রিত করে একটি প্ল্যাটফরম দিতে। তিনি তাতে সফলও হয়েছিলেন। ফলে দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামীবিরোধীরা একত্রিত হয়ে বিএনপি নামক প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করে গেছেন। ১/১১-এর আমলে এসে প্রথমবারের মতো এই প্ল্যাটফরমটি একটি ধাক্কা খায়। এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এই প্ল্যাটফরমটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা শুরুর মাধ্যমে এই প্ল্যাটফরমটি যখন দেশ ও জনগণবিরোধী অবস্থানে দাঁড়ায়, তখনও তারা বুঝতে পারেনি যে, বিএনপি-জামায়াত আসলে সবচেয়ে বড় ভুলটি নিজেদের অজান্তেই করে ফেলেছে। খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতারা এই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের  পক্ষ নিতে গিয়ে ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে। সেটা যে আরও বড় ভুল ছিল, তা আজ  প্রমাণিত। আজ আদালতের নির্দেশে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড প্রাপ্তি এবং নির্বাচনে প্রায় অযোগ্য হওয়ার ঘটনা এদেশে হয়তো ঘটতে পারতো না, যদি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে বিএনপির উপস্থিতি থাকতো। কিন্তু সেটি না হওয়ায় আজ বিএনপির নেতৃত্বে প্ল্যাটফরমটি এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে যে, তাদের ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সাবেক আওয়ামী-লীগারদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেকে অবশ্য এ কথাও বলতে চাইছেন যে, ড. কামাল হোসেনসহ সাবেক আওয়ামী লীগারদের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ানোটা ছিল চলমান নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিএনপির একটি কৌশলমাত্র। এবারের নির্বাচনে যেন বিএনপি অংশ নিতে পারে এবং তার জন্য সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি বা আলোচনার জন্য যেন ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করা যায়, সে কারণেই এই কৌশলটি গ্রহণ করেছে দলটি। কারণ যাই-ই হোক, নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় এর চেয়ে কার্যকর  কোনও পথ বিএনপির জন্য যে খোলা ছিল না, তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু যে মুহূর্তে নির্বাচনি তফসিল ঘোষিত হলো, সে মুহূর্ত থেকেই আমরা দেখতে পেলাম, বিএনপি তার ‍পুরনো অবস্থানেই ফিরে গেছে। যে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি নতুন প্ল্যাটফরমে যোগ দিয়েছিল বা বলা ভালো সৃষ্টি করেছিল, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর থেকেই তা মূলত অকার্যকর হতে বসেছে। ড. কামাল হোসেনসহ বঙ্গবন্ধুর সাবেক সৈনিকদের চেয়ে যে বিএনপির কাছে তাদের পরীক্ষিত রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীই যে গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রমাণ করার জন্য বিএনপি কোনও ছল-চাতুরির আশ্রয় নেয়নি। তারা প্রকাশ্যেই জামায়াতকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন মিত্র জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের অগ্রাহ্য করেছে। বন্ধুবর আরিফ জেবতিক তার ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে দেখিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল চিহ্নিত ও শীর্ষ মানবতাবিরোধীদের, তাদের অনেকের শাস্তি কার্যকর করা হলেও যাদের বিচার প্রক্রিয়া এখনও শুরুই হয়নি, তাদের মধ্য থেকে অন্তত পাঁচজনকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে এবারের নির্বাচনে। তার মানে বিএনপি তার মিত্রদের ক্ষেত্রে কোনও লুকোছাপা করেনি, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও দলটির কোনও দ্বিধা নেই। প্রশ্ন হলো, ড. কামাল হোসেনসহ তার সাবেক আওয়ামী লীগার সঙ্গী-সাথীরা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? যতদূর বোঝা যাচ্ছে, তাতে ড. কামাল হোসেন নিজেই এখন এই মানবতাবিরোধী অপরাধ ইস্যুতে সম্পূর্ণ ‘কনফিউজড’ হয়ে পড়েছেন। কারণ, একে তো তার নতুন জাতীয় ঐক্যের প্রধান দল বিএনপি তাদের মনোনয়ন দিয়েছে, অন্যদিকে তার ঘরের ভেতর থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ-ইস্যুতে তিনি সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তার নিকটাত্মীয়ই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচানোর মিশনে দেশে-বিদেশে সবচেয়ে দৃঢ় ভূমিকা পালন করায় তার পক্ষে এখন প্রকাশ্যে ও কঠোরভাবে বিএনপির সমালোচনার কোনও মুখ অবশিষ্ট নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে ড. কামাল হোসেনের এই মুখ-হারানো একদিকে যেমন ঐতিহাসিক ভুল তেমনই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিকেও এই ভুলের মূল্য দিতে হবে চরমভাবে।

ড. কামাল হোসেনের বাকি সঙ্গীরা যারা একসময় মুজিব কোট পরতেন, তারা এখন সেই মুজিব কোটের বুক পকেটে ধানের শীষ গুঁজে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। কিন্তু ড. কামাল হোসেন সেটি পারেননি বলেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তেমন কোনও হেরফের হয়নি তার নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে। কারণ, যতই অস্বীকার করা হোক না কেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আসলে আর কিছু নয়, দেশের রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াতকে ফিরিয়ে আনার ‘বাফার’ হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে। এতে দোষ নেই, কিন্তু ড. কামাল হোসেন শেষ বয়সে এসে এ রকমটি না করলেও পারতেন বলে অনেকে মনে করেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এর ফলে দেশের রাজনীতি নতুন কী পেলো? কিংবা এতদিন ধরে ড. কামাল হোসেন ও তার সঙ্গীরা যে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার কথা বলতেন, তার কতটা কী অর্জিত হলো, সে বিষয়টি আসলে প্রশ্নই থেকে গেলো। বরং আমরা দেখতে পেলাম, এই গুণগত পরিবর্তনের জন্য গঠিত মঞ্চে গিয়ে আশ্রয় নিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিতরা, যারা এতদিন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে চাইলেও নির্বাচনে মনোনয়ন চাইলেন ধানের শীষ তথা আওয়ামীবিরোধী সবচেয়ে বড় শিবিরের। একে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন বলবো, নাকি সুবিধাবাদী রাজনীতির সবচেয়ে নোংরা প্রকাশ বলা যাবে, সেটির বিচারের ভার পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি। রাজনীতি হয়তো এমনই, সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হলে এক জীবনের সকল অর্জন এভাবেই শেষ হয়ে যায়। ড. কামাল একদা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে বিরোধের কারণে তিনি দলত্যাগ করে নিজের দল করেছিলেন, আবারও শেখ হাসিনার বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি তার সব অর্জনকে খোয়ালেন। এর মধ্য দিয়ে দেশ কী পেলো? রাজনীতি কী পেলো? কী পার্থক্য থাকলো ড. কামাল হোসেন ও হিরো আলমের মধ্যে? কিংবা হিরো আলমের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছার ফলে সৃষ্টি হওয়া প্রশ্নাবলির কয়টির উত্তর আমরা পেলাম ড. কামাল হোসেনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীর রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে? যা জানার অধিকার সাধারণ জনগণের রয়েছে। অধিকার রয়েছে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলারও।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

 

masuda.bhatti@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

x