লবিস্টের কাজ করছেন ড. কামাল

আনিস আলমগীর ১৬:২৪ , ডিসেম্বর ০৪ , ২০১৮

আনিস আলমগীরবিএনপি দীর্ঘ দশ বছর কাদা মাটিতে আটকা পড়েছিল। ড. কামাল হোসেন হাতে ধরে কূলে তুলে নিলেন বিএনপিকে। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন আর ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ তাদের ফোনালাপে বিষয়টাকে যতই ছোট করে দেখাক না কেন–এ ব্যাপারে ড. কামালের অবদান তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মতো নয়। অগ্রসরমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি যে অংশগ্রহণ করেছে তাতে ড. কামালের অনেক সহযোগিতা পেয়েছে তারা। পাকিস্তানের সময় জেনারেল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বড় বড় নেতারা একইভাবে ‘এনডিএফ’, ‘কপ’ ইত্যাদি গঠন করে জোরালো আন্দোলন করার চেষ্টা করেছিলেন। আইয়ুবের বিরুদ্ধে সফল হতে অনেক সময় নিয়েছিল।
ড. কামালও তার রাজনৈতিক পূর্বসূরিদের মতো এমন একটা পথে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাচ্ছেন। এটা তার সার্বভৌম অধিকার–তাতে বাধা দেবে কে? কিন্তু তিনি ভুল পথে অগ্রসর হয়ে সম্ভবত জাতিরই ক্ষতি করতে উদ্ধত হয়েছেন। তিনি জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফেরত দেওয়ার নামে নিজেকে সাধু দাবি করে চোরের বাড়ি পাহারায় লিপ্ত হয়েছেন। শিয়ালের কাছে মুরগি পাহারা দেওয়ার জন্য জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন।

১৯৭৭ সালে ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ, আদি কংগ্রেসের মোরারজি দেশাই, ক্রান্তি দলের চৌধুরী চরণ সিং, সমতা পার্টির জর্জ ফার্নান্দেজ, জনসংঘের অটল বিহারি বাজপেয়ীকে ইন্দিরা গান্ধী ও তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধীর একত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একত্রিত করে ‘জনতা দল’-এর জন্ম দিয়েছিলেন। এবং নির্বাচনেও জিতেছিলেন তারা। যেসব নেতাদের নাম উল্লেখ করেছি তারা সবাই সৎ ব্যক্তি ছিলেন এবং প্রতিটি নেতাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উপযুক্ত ছিলেন। সে কারণে সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু ড.কামাল নিজে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তার সঙ্গীদের কোন ‘যোগ্য’ নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দিতে চাচ্ছেন?

ঐক্যফ্রন্ট করতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন শুরুতেই একটা ভুল করেছেন। তিনি ডা. বি. চৌধুরীর যুক্তফ্রন্টকে তার সঙ্গে ধরে রাখতে পারেননি। যাদের রেখেছেন তারা বড়মাপের কেউ নন, বিএনপির আশীর্বাদ ছাড়া এদের কারও জামানত থাকবে না। অনেকের রয়েছে নানা ধরনের কুকর্মের বদনাম। বি. চৌধুরীর কথাবার্তা তেতো হলেও তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী না। বিএনপির পরামর্শে তিনি বি. চৌধুরীকে বাদ দিয়ে নিজে বিএনপির সঙ্গে কোনও শর্ত ছাড়াই এক হয়েছেন। এতে সরকার পরিবর্তন হলে জাতি সমূহ বিপদে পড়ার সম্ভাবনা রয়ে গেলো।

আগামী নির্বাচনে বিএনপি একা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে ড. কামালের ভূমিকা কী হবে? পার্লামেন্ট সদস্যরা বিএনপির, প্রধানমন্ত্রী বিএনপির, মন্ত্রিসভা বিএনপির– এখানে ড. কামালের বলারইবা কী থাকবে? তিনি কি রাষ্ট্রপতি হবেন নাকি তার জন্য ন্যায়পাল পদ বানাবে বিএনপি? আর রাষ্ট্র পরিচালনায় এসব পদের কি কোনও গুরুত্ব অবশিষ্ট আছে বাংলাদেশে! কেমন গুরুত্ব তিনি পাবেন তার লক্ষণ তো এখনই স্পষ্ট। তাকে নেতা মেনে ঐক্যফ্রন্ট করেছে বিএনপি কিন্তু নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের সময় তাকে পাত্তা দেয়নি। স্কাইপে প্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন দণ্ডিত নেতা তারেক রহমান। বাস্তবতা হচ্ছে, তারেক রহমানের ইচ্ছার বাইরে বিএনপির কেউ প্রার্থী হতে পারবে না, ঐক্যফ্রন্টেরও না। তার সম্মতি ছাড়া ২০ দলেরও কেউ প্রার্থী হতে পারবে না। কারণ, এখন বিএনপি-জামায়াত আর ড. কামালের অনুসারী সবাই একাকার, সবার প্রতীক বিএনপির প্রতীক- ধানের শীষ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ড. কামাল নির্বাচনও করছেন না, তিনি পার্লামেন্টেও থাকবেন না, তবে কেন তিনি বড় বড় কথা বলে মাঠে নামলেন? কেন তিনি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে চান? তারেক জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর জন্য? আমরা যতটুকু বুঝলাম গত ২/৩ মাসে তার রাজনৈতিক ভূমিকা সম্ভবত আমেরিকার লবিস্ট ফার্মের মতো। টাকার বিনিময়ে সার্ভিস প্রদান করা।

বলার অপেক্ষা রাখে না বিএনপি একা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে পলাতক অবস্থা থেকে তারেক জিয়া বীরদর্পে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হবেন। সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠকের সময় এক সম্পাদক জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? তখন ড. কামাল বলেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যাকে নেতা নির্বাচিত করে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তো তারেককে নেতা নির্বাচিত করবেন, ওনাকে নয়। ড. কামাল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় বিষয়টা আরও সুস্পষ্ট, আরও সুনির্দিষ্ট হয়ে গেলো।

তারেক জিয়ার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করি। তার এক জন্মদিনে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর উপাধিধারী ২১ জন শিক্ষক তাকে ‘মহান জননায়ক’ বলে উল্লেখ করে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ড. কামালের মতো একজন খ্যাতিমান আইনজীবীকে তার ও তার দলের লবিস্টের ভূমিকা পালনের জন্য নিয়োগ দিতে পেরেছেন তারেক। তিনিও সুবোধ বালকের মতো তাই করছেন। জামায়াতকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলছেন দেশে কোনও স্বাধীনতা বিরোধী নেই, জামায়াত বলতে এখন আর কিছু নেই। তিনি তার নেতাদের নির্লজ্জ মিথ্যাচার, নিকৃষ্ট রাজনীতি দেখেও চুপ মেরে আছেন। আমি অপেক্ষা করছি নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে তিনি আর কী কী বলেন, করার বাকি কী রাখেন।

ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ করে বড় নেতা হয়েছেন সত্য কিন্তু আগেও এই জাতির জন্য স্মরণীয় কোনও ত্যাগ স্বীকার করেননি তিনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে (২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে ড. কামাল হোসেনকেও পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মিয়ানওয়ালি কারাগারে আর বলা হয় ড. কামাল হোসেন ছিলেন তার শ্বশুরবাড়িতে। অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন তিনি ছিলেন পৃথক আরেকটি জেলে। শুনেছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কখনও যদি পাকিস্তানিরা কোনও আলোচনা করতে চায় তখন তার সাহায্য নেওয়ার চিন্তা করেই ড. কামালকে তুলে নিয়েছিল তারা।

ড. কামাল বিয়ে করেছেন পাকিস্তানি মেয়ে। পাকিস্তানের নামজাদা আইনজীবী এ. কে. ব্রোহির নাকি ভাইয়ের মেয়ে। ড. কামাল নিজেও কথাবার্তায় অনেকটা পাকিস্তানিদের মতো। ভাঙা ভাঙা বাংলা বললেও উর্দু আর ইংরেজি ভালো বলতে পারেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তার বহু বক্তৃতা জনগণ শুনছে। তার সহকর্মীরা বলেন, কৃষকদের জন্য দরকারি কীটনাশককে তিনি নাকি বক্তৃতায় ‘কীর্তিনাশক’ বলতেন। অবশ্য আমি তার বাসায় মুখোমুখি বসে টিভির জন্য তার একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছি। ভাঙা ভাঙা বাংলা বললেও বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

তারেকের সঙ্গে জনগণের কোনও ব্যক্তিগত ক্লেশ নেই। সুতরাং তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে আমাদের ক্ষতি কী? রাষ্ট্র কোনও সংঘ নয়। রাষ্ট্র রাষ্ট্রই। রাষ্ট্র কোনও কৃত্রিম কিছু নয় এবং অপ্রয়োজনীয়ও নয়। সে অপরিহার্য। রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে চললেই রাষ্ট্রের মানুষ সুখী হয়। রাষ্ট্র একজনের লাভকে গগনচুম্বী করে অপরের ক্ষতিকে অতলস্পর্শী করতে পারে। সুতরাং রাষ্ট্রনায়ককে খুবই সুচতুর হতে হয়।

২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারেক জিয়া বনানীতে ‘হাওয়া ভবন’ খুলে প্যারালাল সরকার চালিয়েছেন। তখন দেশের মানুষ জেনেছে, দেখেছে তার আকাঙ্ক্ষার কোনও শেষ ছিল না। যার আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই তার পক্ষে কোনও সম্পদই যথেষ্ট নয়। নাইকো, গ্যাটকো যত মামলা হয়েছে কিছুই অহেতুক নয়। দ্বিতীয় কোনও দেশে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলাগুলো নিরপেক্ষ বিচারক দিয়ে বিচার নিষ্পত্তি করলেও তাদের শত বছরের জেল হবে।

ড. কামাল হোসেন বিএনপির মতো একটা দলকে, তারেক জিয়ার মতো একজন নেতাকে ক্ষমতায় বসানোর দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এখানে ড. কামাল ন্যায় নৈতিকতার কোনও তোয়াক্কা করছেন না। সম্ভবত তিনি আওয়ামী লীগের প্রতি বিদ্বেষবশত এসব করছেন। না হয় বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। ড. কামালকে আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিএনপিতে সৎ লোকের অভাব আছে আর তারেক জিয়ার ‘রাজা’ হওয়ার কোনও গুণই নেই। রয়েছে শুধু অপরাধ প্রবণতা। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা নয়, গ্রেনেড মেরে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা। ড. কামাল হোসেন যদি এদের ক্ষমতায় বসানোর উদ্যোগ ত্যাগ না করেন তবে জাতির বিপর্যয় অপরিহার্য।

ড. কামাল হোসেনের পূর্বসূরি রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের সংগ্রামে, দেশের প্রয়োজনে এমন কাজ কখনও করেননি। তিনি দেশের স্বার্থের নামে এমন কাজ কেন করতে যাচ্ছেন। তার পূর্বসূরিদের জীবনে এমন কোনও কাজ তো তিনি খুঁজে পাবেন না। লালনের একটা কথা বলে লেখা শেষ করবো– ‘ভাব না জেনে ভঙ্গি ধরা ভালো নয়। তাতে মহৎ লোকের ব্যঙ্গ হয়।’ ড. কামাল হোসেন বিএনপির লবিস্ট হয়ে আমাদের গণতন্ত্রের সংগ্রামের পূর্বসূরি সব নেতাকে ব্যঙ্গ করছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

x