হলফনামায় হলফ করে বলা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ১৫:২৫ , ডিসেম্বর ০৫ , ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলাদেশের জনমানসে রাজনীতিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক আগেই তলানিতে চলে গেছে। কিন্তু ক্রমেই কি তারা হাস্যকরও হয়ে উঠছেন? আমরা দেখছি এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের অনেকেই তাদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামায় সম্পদের বিবরণসহ যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে ট্রল চলছে সামাজিক মাধ্যমে। কারও নাম নিয়ে না হলেও সামগ্রিকভাবে এসব হলফনামায় দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে এখন নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের আট ধরনের তথ্য দিতে হয় যাতে মামলা, ব্যবসা বা পেশা, প্রার্থী ও তার ওপর নির্ভরশীলদের আয়ের উৎস, সম্পদ ও দায়ের বিবরণী, ঋণ ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করতে হয়। এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রচারেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
স্বনামখ্যাত ব্যবসায়ী যখন বলেন, তার বাড়ি গাড়ি কিছু নেই বা এক বড় রাজনীতিক যখন বলেন তিনি স্ত্রীর গাড়িতে চড়েন বা স্ত্রীর বাড়িতে থাকেন, নগদ অর্থ নেই বললেই চলে, তখন লোকে ভাবে আমরা এমন মানুষদেরই সংসদে পাঠাই, যারা হলফনামায়ও হলফ করে সত্যটা বলতে পারেন না।

আজ ক্ষমতায় আসতে চাইছে সবাই। অথচ অবক্ষয় সব দলে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে যদি বড় বড় নেতারা, বড় বড় মানুষেরা তাদের সম্পদ বৃদ্ধির সত্যটা কারপেটের নিচে লুকিয়ে মেরুকরণের রাজনীতির সস্তা পথে হাঁটে, তবে এই রাজনীতির পরিণতি কী তা নিয়ে ভাবতে হয়।

সংসদ সদস্যদের আসল কাজ আইন প্রণয়ন করা। তাহলে এমন মানুষদের যোগ্যতা কী হওয়া উচিত- এমন প্রশ্ন উঠতে পার ঠিকই, তবে প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, এমপি হতে গেলে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও মাপকাঠি নেই। স্কুলের গণ্ডিতে পা না-রেখেও সাংসদ হওয়া যায়। এমন নজিরও আছে যে, পুঁথিগত শিক্ষা না থেকেও ভালো সংসদ সদস্য।  

তো যদি শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও বাধ্যবাধকতা না থাকে তাহলে হলফনামায় বড় অসঙ্গতি থাকবে সেটাও প্রত্যাশিত। কিন্তু প্রার্থীরা হলফনামায় যখন লিখেন ‘আমি শপথপূর্বক বলিতেছি যে এই হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য এতদসঙ্গে দাখিলকৃত সকল দলিল-দস্তাবেজ আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল’– তখন আর মানুষ এসব আজগুবি তথ্য বিশ্বাস করতে চায় না। বিশ্বব্যাপী ধনীর তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তি যখন জানান তার নিজের বাড়ি গাড়ি নেই, নগদ অর্থ নেই, তখন হলফনামা যে নির্ভুল নয় সে বিষয়ে সন্দেহমুক্ত হওয়া যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, যারা হলফনামায় ভুল তথ্য দেবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটা কতটা পারবে কমিশন তা তারাই জানেন। কোনও কোনও প্রার্থী তাদের সম্পদের যে দাম উল্লেখ করেছেন, তা অবিশ্বাস্যভাবে কম, যা  হাস্যকর।

নাগরিকরাই ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেন। কিন্তু নাগরিকদের পছন্দে সব হবে সেটার সুযোগ নেই। রাজনীতি এখন অর্থ আর পেশির খেলা। ফলে নাগরিকদের তেমন কিছু বলার থাকে না। দল যাদের মনোনয়ন দেয় তাদের মধ্য থেকেই মন্দের ভালো বেছে নিতে হয়। হলফনামায় দেখা গেলো রাজনীতিকদের স্ত্রীদের সম্পদ বেড়ে যাওয়ার রেকর্ড। দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ ও তার স্বামী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথা উল্লেখ করা যায়। এরশাদের চেয়ে রওশনের সম্পদের পরিমাণ বেশি। এটি আরও অনেক ভিভিআইপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে ঘটেছে। 

সম্প্রতি এক সেমিনারে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন রাজনীতি এখন বড় লাভজনক ব্যবসা। জনপ্রতিনিধিরা দরিদ্র থেকে জনগণের সেবা করবেন, সেটি কেউ আশা করেন না। কিন্তু তাদের আয়-রোজগার সাধারণ মানুষের আয়ের ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে তো। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।  

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের অনেকেরই কৃষি ও মৎস্য খাতে ঝোঁক রয়েছে। অনেকে এসব খাত থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কৃষি ও মৎস্য খাতে বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এমনকি ঢাকার অনেক এমপি প্রার্থীরও কৃষি, মৎস্য ও পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ ও আয় রয়েছে। বাস্তবতা কি তা বলে? বাস্তবে কি কৃষি কাজ এত লাভজনক?

বাস্তবতা বলে এসব আসলে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া। কিন্তু কিছু করারও থাকে না। এখানেই ‘গতানুগতিক’ রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। জাতীয় রাজনীতির বড় প্রেক্ষিতে যেখানে দুর্নীতি শুধু নয়, খুন খারাবি করেও নাগরিক সমাজের সমর্থন পাওয়া যায় তখন ভালো রাজনীতির সম্ভাবনা কতটাইবা থাকে? তরুণ সম্প্রদায়ের একটা আদর্শবাদী অংশকে পাওয়া যাবে, যাদের অনেকেই আর গতানুগতিক প্রতিষ্ঠিত দলীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না। এই তরুণরা আজ হয়তো বড় প্রভাব রাখছে না, কিন্তু একদিন রাখবে– শুধু এটুকুই আশা জাগানিয়া। এই তরুণরা রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা দখলের নিরিখে না দেখে সৎ ও নিরলসভাবে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে, সেটাই বড় পাওয়া। ভবিষ্যতের হলফনামায় অনেক বেশি সত্য উঠে আসবে এবং সেটাই হবে ক্ষমতার হেঁশেলে ঢোকার পূর্ব শর্ত, এতটুকুই আশা।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

x