‘রাইট পিপল ইন দ্য রাইট প্লেস’

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ১৬:৩৯ , জানুয়ারি ০৯ , ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাযত বদলায়, ততই অপরিবর্তিত থেকে যায়। ইউরোপীয় প্রবাদের মতো এমনটা এবার আর হয়নি। মন্ত্রিসভার চেহারাটা বদলেছে,ভালোভাবেই বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের জন্য সরকার গঠন করে যে মন্ত্রিসভা জাতিকে উপহার দিয়েছেন তার মধ্যে বড় নতুনত্ব আছে। মন্ত্রিসভায় কেবল নবীন রক্ত নয়, দেখা যাচ্ছে নতুন ভাবনা আবাহনের প্রয়াসও আছে।
প্রত্যাশা কিন্তু সেরকমই ছিল। সরকারের উন্নয়ন যেমন বড় অর্থে আলোচিত ছিল, তেমনি কিছু কিছু মন্ত্রীর কাজকর্ম ব্যাপক সমালোচিত ছিল। আর্থিক খাতের নানা কারণে অর্থমন্ত্রীর সৎ ভাবমূর্তিও প্রশ্নে মুখে পড়েছিল। খাদ্য, ত্রাণ মন্ত্রীরা সবসময়ই নানা কারণে সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা শাজাহান খান ব্যাপক সমালোচিত ছিলেন। তেমনিভাবে দশ বছর ধরেই মানুষের আলোচনার খোরাক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এসব সমালোচনা কতটা সঠিক আর কতটা অযৌক্তিক সে প্রশ্নে না গিয়ে বলা যায় প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই সরকারের মলিন ভাবমূর্তি দেখতে চান না, দুর্বল প্রশাসন চান না। তিনি চান না সরকারের শাসনযোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠুক। তিনি ভালো করে জানেন, বিরোধীরা ছুরি শানাবে, সুশীল সমাজ দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তা বলে মাঠ-ময়দান মুখরিত করবে। তাই প্রধানমন্ত্রী শক্ত হাতে হাল ধরতে চান। এখন আমরা দেখতে চাই প্রশাসনের শীর্ষে প্রকৃত ও বলিষ্ঠ সংস্কার তিনি করছেন।

নতুন মন্ত্রিসভার দিকে চাইলে একটা পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট হয়। ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটি চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, করপোরেট জগতে যাকে বলা হয় ‘রাইট পিপল ইন দ্য রাইট প্লেস’। একজন পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট অর্থমন্ত্রী এবং তিনি বিগত বছরগুলোতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে তার করপোরেট ভাবনার স্বাক্ষর রেখেছেন। কৃষিবিদ মন্ত্রী পেয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়, পাহাড়ের মানুষই হলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির একজন ব্যবসায়ী হয়েছেন পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, একজন ডাক্তার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। এমন করে প্রত্যেকের সম্পর্কে বলা যাবে হয়তো।

কিন্তু তবুও কিছু প্রশ্ন মাথায় জাগে। দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের বিদেশ নীতির প্রয়োগকে আরও সুচিমুখ করে তুলতে একজন দক্ষতাসম্পন্ন রাজনীতিকের প্রয়োজন ছিল কিনা সেটা ভাবছি। তবে যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন তার কূটনৈতিক কাজের অভিজ্ঞতা আছে এবং রাজনীতির জায়গাটা নিশ্চয় দেখবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, যিনি আবার দায়িত্ব পেলেন।

জোট-রাজনীতির মধ্যে এখনও মহাজোটের শরিকদের কাউকে মন্ত্রিত্বে দেখা যায়নি। তবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য  এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, এখনও তাদের কেউ মন্ত্রী হননি মানে যে হবেন না তা নয় এবং একইভাবে মন্ত্রিত্বের শর্তে জোটও হয়নি।

দেশের মানুষের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট দাবিতে পরিণত করে তার রূপায়ণের প্রচেষ্টাই দলের কাজ। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। নতুন মন্ত্রিসভা সেই ইঙ্গিত দেয় অনেকখানি। শাসনপ্রণালীতে একটা নতুন বৈশিষ্ট্য বা দিশা প্রদানের প্রচেষ্টা করছেন তিনি, সেটা বোঝা যায়। কোনও মন্ত্রী যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হন বা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তবে তাকে বাদ দেওয়াই কিন্তু শাসনপ্রণালীকে পরিশুদ্ধ করার শ্রেষ্ঠ পন্থা।

এবারের মন্ত্রিসভার দিকে চাইলে যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিকরা হতাশ হবেন না। বৃদ্ধতন্ত্রের অবসান হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু একটি দক্ষ, দায়বদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠনের চেষ্টাকে প্রায় সব মহল থেকেই স্বাগত জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগের মন্ত্রীরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, নতুনদের কড়া নজরে রাখা হবে। ফলে এরা পারফরমার হবেন, সেটাই প্রত্যাশা।

নিরঙ্কুশের চেয়েও বেশি আসন পাওয়ায় সংসদে বিতর্ক কতটা হবে সে নিয়ে অনেক কথা উচ্চারিত হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্টের সাতজন সদস্য যদি শেষ পর্যন্ত শপথ নেন, তাহলে তা হবে তাদের দিক থেকে সবচেয়ে যৌক্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। স্পিকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, তাদের সংখ্যা অল্প হলেও যদি ন্যায্য কথা বলেন, তাহলে সংসদে তাদের সময় দিন, একটু বেশিই দিন।   

জনগণ উজাড় করে ভোট দিয়েছে, বিজয়ী দল বলছে। তাই প্রয়োজন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যতটা বেশি জনমত যাচাই করা। জনগণ যেন তাদের কথাটা বলতে পারে, তাদের মনোভাবটা যেন সংসদে বিল পাসের সময় মনে রাখা হয়। তেমনিভাবে গণমাধ্যম বা নাগরিক সমাজ যেমন সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবে, তেমনি কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রশ্নও তুলতে পারে। আশা করবো বড় জয়ের বিশাল মহত্ত্বে সেসবকে প্রত্যাখ্যান না করে যৌক্তিক পন্থায় বিবেচনার চেষ্টা করা হবে।  

নতুন মন্ত্রিসভাকে সফল হতে হলে তাদের অবশ্যই নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হবে। আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে। স্বভাবতই এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকার এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে সরকার সত্যিকার অর্থেই সফল বলে বিবেচিত হবে। সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্নীতি প্রতিরোধ করে সুশাসন নিশ্চিত করা।

মন্ত্রিসভা গঠনের, পছন্দের ব্যক্তিদের অমাত্য নিয়োগ করার এখতিয়ার ও বিশেষাধিকার একান্তভাবে প্রধানমন্ত্রীরই। মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাসে তিনি নতুনত্ব শুধু চাননি, চেয়েছেন একটা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষদের তার পাশে জড়ো করতে। তিনি শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি লক্ষ্যহীন ও দায়সারা কিছু করছেন না সামনের পাঁচটা বছর।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

x