রাজার বাড়ি অনেক দূর

দাউদ হায়দার ১৮:০৮ , জানুয়ারি ০৯ , ২০১৯

দাউদ হায়দারপাবনার দোহারপাড়ার গ্রামীনকথা, ‘ভাইরে, বুড়ো-থুত্থুরে বাপ ইন্তেকাল করলো, দুঃখ নেই, কিন্তু যম যে বাড়ি চিনলো, এখন উপায়?’
বাংলাদেশের এক জ্যোতিবিৎ নাকি বলেছেন, ২০১৯ সালে বাংলার বহু নক্ষত্রের পতন হবে।
তার কথায়, নক্ষত্রকুলে রাজনীতিক-শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক।
একই দিনে চলে গেলেন দিব্যেন্দু পালিত, পিনাকী ঠাকুর। দিন কয়েক আগে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। মৃনাল সেন। প্রিয়জনের প্রস্থান মানেই একা, নিঃসঙ্গ, এতিম। চরাচর শূন্য। কলকাতাও অচেনা।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ফোন করেছিলুম দিব্যেন্দুদাকে। জানতুম অসুস্থ। কতটা অসুস্থ, অজানা। বাড়ির (তথা গৃহের) পরিচারিকা চিনু অধিকারীর কথায় বুঝলুম, কথা বলতে কষ্ট হবে দিব্যেন্দুদার।

দূর দেশ থেকে ফোন করেছি, চিনু দোনামোনা করেও দিব্যেন্দুদাকে ফোন দিয়েছেন। কম্পিত কণ্ঠ। অগোছালো-কথা। অস্পষ্ট। আন্দাজে বুঝে নিই কী বলতে চান। কানেও বোধ হয় কম শুনেছেন। বলি, ‘জানুয়ারি মাসে কলকাতায় আসছি।’ উত্তর: ‘মরার আগে এসো।’- কার, বলেননি।

কল্যানীদির মৃত্যুর খবর জেনেও যথাসময়ে ফোন করিনি। করলে, দিব্যেন্দুদার আর্তনাদমাখা-কণ্ঠ। অসহায়, কাবু হয়ে যাবো। পরম আত্মীয়-বিয়োগ অসহনীয়। চার দশকের বেশি আত্মীয়বিহীন, নির্বাসিত, কী মরমী আঘাত, টের পাই হাড়েমজ্জায়। বিধুর বিষাদে আদিগন্ত আচ্ছন্ন। ‘কেহ নাই, কেহ নাই।’

কল্যানীদিকে বড়োবেশি ভালোবাসতেন দিব্যেন্দুদা, রসিকতা শুনেছি, ‘তুমি চলে গেলে আমিও আসবো, ওয়েট করবো না।’ বেশিদিন করেননি।

দিন-তারিখ-মাস মনে পড়ছে না, না পড়ুক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার (১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত। ১৯৭১। স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ চিহ্নিত।) আট-দশমাস পরে (হয়তো), কিংবা তারও পরে (১৯৭২ বা ১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে) ঢাকা নিউ মার্কেটে, নলেজ হোম বুক স্টলে কলকাতার কয়েকজন কবির ‘কবিতার’ বই। একটি ‘রাজার বাড়ি অনেক দূরে।’ লেখক দিব্যেন্দু পালিত। গ্রন্থের নাম চমকপ্রদ। কৌতূহল হয়। কিনলুম।

কবিতার ভালোমন্দ বিচারের যোগ্যতা নেই। না থাকুক, কাব্যগ্রন্থের নাম মনে আছে যথারীতি। এই সুবাদেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। ঘনিষ্ঠতা। ১৯৭৫ সাল থেকে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যবিভাগে, স্নাতকপর্বে, নূপুর চৌধুরী, সই, একটি শারদীয় সংখ্যায় দিব্যেন্দু পালিতের উপন্যাস তুমুল আলোড়িত। পড়তে দেন। দিয়েই মৌনী নন, জানান, দিব্যেন্দু পালিত আমাদের তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন একদা। সুধীনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, নরেশ গুহ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তও পড়িয়েছে ওঁকে।

প্রথম আলাপে ‘তুলনামূলক সাহিত্যে পড়ি’, এই ভূমিকার পরে, ‘শুনেছি আপনিও পড়েছেন।’

জেনে খুশি হন সম্ভবত। কোন অধ্যাপক কী কী সাবজেক্ট পড়ান, জিজ্ঞেস করেন। কবিতার কথা, তথা, ‘রাজার বাড়ি অনেক দূরে’ কেনার অভিজ্ঞতাও বলি। নিজের লেখালেখি বিষয়ে কিচ্ছু বলেননি। চা খাইয়ে বিদেয় করার আগে, ‘আবার এসো, সন্ধের দিকে।’

প্রথম দর্শন-আলাপে মনে হয়েছিল রাশভারী, স্বল্প বাক্যই আওড়ান, বেশি নয়। দাম্ভিক। ভুল ভাঙে কিছুকাল পরেই। এক শীতবিকেলে, রবিবার, দেখা গড়িয়াহাটের মোড়ে। নিয়ে গেলেন ফ্ল্যাটে (৭ এফ-২, মেঘমল্লার। ১৬/৩ গড়িয়াহাট রোড। কলকাতা ৭০০ ০১৯)। চায়ের সঙ্গে টা। নানা বিষয়ে গল্প। কোথায় থাকি জেনে, “অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাড়িতে? যোধপুর পার্কে? অন্নদাশঙ্করকে কী করে চিনলে?” সবিস্ময়ে প্রশ্ন। পাশে ছিলেন কল্যানী (পালিত)। “তোমাকে বলেছি, ভুলে গেছ। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বড়ো মেয়ে জয়া রায় সাউথ পয়েন্টে পড়ান, আমাদের কলিগ। উনি বলেছিলেন।”

দিব্যেন্দু পালিতের উচ্ছ্বাস, ‘দারুন ব্যাপার। অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী লীলা রায় খ্রিস্টান, তুমি মুসলিম। একই বাড়িতে। এক সঙ্গে বাস। এরকম বোধ হয় গোটা ভারতে কারোর বাড়িতে নেই। এই সহাবস্থানই আমরা চাই বাংলায়, ভারতে। অন্নদাশঙ্করকে কী বলে সম্বোধন করো?’

-দাদু।

‘ওহ! দাদুনাতি সম্পর্ক!! তা বেশ!!’

পরে যতবারই দেখা, একথা-সেকথার পরে, ‘তোমার দাদু কেমন আছেন। আমাদের শ্রদ্ধা জানিও।’

যোধপুর পার্কের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে অন্নদাশঙ্কর বালিগঞ্জে (বিড়লা মন্দিরের বিপরীতে) স্থায়ী ঠিকানায় (নিজস্ব ফ্ল্যাটে) ঠাঁই নেন, আমাদের যে খুব ভালো লেগেছিল তা নয়, অন্নদাশঙ্কর সাক্ষাৎপ্রার্থীও বেড়ে যায়।

গড়িয়াহাট থেকে বালিগঞ্জ হাঁটাপথ, কোনও রবিবার বা ছুটির দিনে, বিকেলে, কল্যানীদি-দিব্যেন্দুদা হাজির। খুব বেশি সময় কাটাতেন না। আধঘণ্টা বা একঘণ্টা।

অন্নদাশঙ্কর-লীলা রায় স্নেহ করতেন ওঁদের। বিশেষত, কল্যানীদিকে বেশি। দিব্যেন্দু পালিত বোম্বে শহরে (যাওয়ার আগে ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিয়েছিলেন), অনন্দবাজার পত্রিকার বিজ্ঞাপনের দায়িত্বে, আছেন পালি হিলে। একদিন ঢুঁ মারি। কোথায় আছেন জেনে, পরদিন বিকেলে কল্যানীদিসহ হাজির। আছি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছোট কন্যা তৃপ্তি রায়ের বাড়িতে (বান্দ্রার চকমিলান ফ্ল্যাট)। তৃপ্তির স্বামী অশোক রায়, লারসেন অ্যান্ড ট্যুবরোর একটি শাখার মহাকর্তা। নিমন্ত্রণ করেন। খানাপিনার নানা আয়োজন। আলাপ পরিচয়ে আত্মিকতা। ওটা অছিলা, বাহ্যিক। দিব্যেন্দু পালিত জানেন, কী করে বিজ্ঞাপন বাগাতে হয়। অশোক রায়ের সঙ্গে দহরমমহরম।মাসখানেক পরে দেখি, লারসেন অ্যান্ড ট্যুবরোর হাফ পৃষ্ঠাব্যাপী বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনমহলে নিশ্চয় মহার্ঘ ছিলেন, আনন্দবাজার ছেড়ে ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ যোগ দেন, বিজ্ঞাপন বিভাগের কর্তা। দ্য স্টেটসম্যান ছেড়ে আনন্দবাজারে, চিঠি লিখেছেন, কেন (চিঠির বয়ান দেখুন)।

দিব্যেন্দু পালিত নানা সময়ে, নানা উপলক্ষে চিঠি লিখেছেন, চিঠির সংখ্যা বিস্তর। তাঁর চিঠির অন্তরঙ্গ বিষয় পরিবারে। কলকাতা তথা ভারতের রাজনীতি, ডামাডোল, অসহিষ্ণুতা, ‘দেশ কোথায় যাচ্ছে?’ সাহিত্য নিয়েও কথা। বিশ্ব-রাজনীতি নিয়েও। বাদ দেন না কী লিখছেন। এক চিঠিতে, “অন্নদাশঙ্কর বলছিলেন, সুনীলেরও (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) কথা, গদ্য ভালো লেখো। গদ্য কেন লিখছো না? তোমার চিঠির গদ্য সুপাঠ্য।” ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ যোগ দিয়ে লেখা চান। ‘জলদি পাঠাও।’

দাউদ হায়দারকে লেখা দিব্যেন্দু পালিত-এর চিঠি

দিব্যেন্দুদা যখন আনন্দবাজারে, সোম থেকে শুক্রবার, দুটো থেকে আড়াইটে, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের কফি হাউজে হাজির। আমরা সামিল। আসেন নিত্যপ্রিয় ঘোষ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ধ্রুবমিত্র (রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা সুচিত্রা মিত্রের প্রাক্তন স্বামী), রবিসেন (অশোক মিত্রর একটি প্রবন্ধে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ), পুলক চন্দ (কলকাতা চলচিত্র আন্দোলনের ‘পান্ডা’), দ্য স্টেটসম্যানের ধরণী ঘোষ, প্রাবন্ধিক সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় (দিল্লি থেকে কলকাতায় এলে) প্রমুখ। সন্দীপন-উবাচ : ‘ইন্টেলেকচুয়াল আড্ডা’!!

মেঘমল্লার’ কমপ্লেক্স-এ আরো তিনটি বিল্ডিং। একই কমপ্লেক্স-এ দিব্যেন্দু পালিত, শরৎ-বিজয়া মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুর বার। একজনকে না পেলে আরেকজনের ফ্ল্যাটে।

এক বন্ধুর হাতে (বন্ধু বার্লিনে থাকেন) ‘সতর্কবার্তা’ কাব্যগ্রন্থ পাঠিয়েছেন। প্রাপ্তিসংবাদ জানিয়ে ফোনে জিজ্ঞেস করি , ‘মন্ত্রী কবে হচ্ছেন?’-সশব্দে হাসেন। ‘তুমি একা নও, আরো অনেকের প্রশ্ন। রাজার বাড়ি অনেক দূরে।’ ‘সতর্কবার্তা’ উৎসর্গ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। 

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/

x