বিএনপির নেগেটিভ জনসমর্থন ছাড়া সম্পদই নেই

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৬:৩২ , জানুয়ারি ১০ , ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবিএনপির মুমূর্ষু অবস্থা। দলটির নেতারা মৃতসঞ্জীবনী সুধার তালাশে ব্যস্ত। উল্টো পথে হাঁটলে তা কখনও পাওয়া যাবে না। বাস্তবসম্মত রাজনীতির পথে হাঁটতে হবে। যে মাটিতে পা পিছালালো সেটি ধরে উঠতে হবে। বিদেশি দূতাবাসে ধরনা দিলে কি প্রতিকার পাবে তারা? বিএনপির প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা আত্মহননের দিকে যাচ্ছে। গত পাঁচ মাস তারা কী কাজ করলেন, কী কথা বললেন, সেসবের পর্যালোচনায় বসছেন না কেন? কর্মী বাহিনী যে বির্পযস্ত হলো তাদের উদ্ধারের জন্য কর্মসূচি নিচ্ছেন না কেন? মামলায় মামলায় কর্মী বাহিনীর অস্তিত্ব যে বিপন্ন হয়ে উঠেছে তার সমাধানের একটা পথ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন না কেন?
এই সবই তো নিজেদের সমস্যা। নিজেদেরই এই সমস্যা যতদূর সম্ভব সমাধান করতে হবে। এখানে বিদেশি দূতাবাসগুলো কার্যকর কী পদক্ষেপ নিতে পারবে? ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ কর্মী ও সমর্থক বাহিনী বিএনপি জামায়াতের অত্যাচারে বিপন্ন হয়েছিল। গ্রামাঞ্চলে কর্মী বাহিনী থাকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সেই সময় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাদের অফিসে ক্যাম্প খুলে কর্মীদের রক্ষা করেছিল। তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এখন বিএনপির সেই উদ্যোগ কোথায়?

বিএনপির এক ত্যাগী কর্মীর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সে গ্রাম ছাড়া দীর্ঘদিন। মাঝে মধ্যে ট্যাক্সি চালায়। মুখ দেখে উপবাস রয়েছে মনে হলে তাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিই। এমন অসহায় অবস্থায় বিএনপি তাদের পাশে না দাঁড়ালে তারা তো দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে না। বিচ্ছিন্ন পথে চলে যেতে বাধ্য হবে।

বিএনপির এই অবস্থা হলো কেন? জিয়াউর রহমান আওয়ামী বিদ্বেষী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে একত্রিত করে বিএনপি সৃষ্টি করেছিলেন। আওয়ামী বিদ্বেষী শক্তিকে পরিপূর্ণভাবে সঙ্গে রাখার জন্য তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাজনীতির মাঠে টিকতে দেননি। গ্রেনেড মেরে মেরে তার জনসভায় লোক হত্যা করে মোশতাককে রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় করে দিয়েছিলেন। নিজের শক্তি বাড়ানোর জন্য সাম্প্রদায়িক দলগুলোর ওপর থেকে বিধিনিষেধও প্রত্যাহার করেছিলেন তিনি।

সে কারণেই আমরা ১৯৭৯-এর সংসদে সবুর খান, আ.ন.ম. ইউসুফ, মাওলানা আব্দুর রহিম, শাহ আজিজ, আব্দুল আলিম, মশিউর রহমান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রমুখ যুদ্ধাপরাধীকে নির্বাচিত হতে দেখেছি। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের কারণে তখনও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমার পর জেলে রাখা সাড়ে তিন হাজার অপরাধীকে জিয়া ক্ষমা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

জিয়াউর রহমানের আওয়ামী বিদ্বেষ আর কখনও প্রীতির দিকে ফিরে আসেনি। বেগম খালেদা জিয়ার সময় তা আরও বেড়ে যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জনসভার মাঠে ও মঞ্চে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে খোদ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার প্রচেষ্টা ছিল সেই বিদ্বেষের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী আর তারেক জিয়া হাওয়া ভবনে কাশিম বাজার কুঠি স্থাপন করে নানান কুকর্মের অনুঘটক হয়েছিলেন। যে জজ মিয়া জীবনে কখনও গ্রেনেড দেখেনি তাকে গ্রেনেড চার্জের তালিম দিয়ে প্রধান আসামি করে চার্জশিট প্রদান করা ছিল আরেক বিরাট প্রহসন। ষড়যন্ত্রের শেষ পরিণতি কখনও ভালো হয় না। এখন তারই ইজা টানা ফলাফল ভোগ করছে বিএনপি। এটা তাদের কর্মের ফল।

গত নির্বাচনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে এত অহেতুক কথাবার্তা বললেন যে, সমগ্র প্রশাসনই তাদের বিরুদ্ধে চলে গেলো। জনাব জাফরুল্ল্যাহ চৌধুরীর কী প্রয়োজন ছিল এই কথা বলার যে, সামরিক বাহিনী কোনও বিতর্কিত ভূমিকা নিলে জাতিসংঘে যেসব বাংলাদেশি সেনাবাহিনী কর্মরত আছে তাদের পাঠিয়ে দেবে। জাতিসংঘের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব কি জাফরুল্ল্যাহ চৌধুরীর হাতে নাকি বিএনপির হাতে? পুলিশকে গালি দিলেন ড. কামাল হোসেন। তারা কি বোঝেন না, প্রশাসন একটা মৌলিক ফ্যাক্টর?

বিএনপি আগেভাগে হুমকি দিয়ে বসে রইলো তাদের কর্মী বাহিনী কেন্দ্র পাহারা দেবে। আওয়ামী লীগ পাল্টা ব্যবস্থা নিলো। আমি নিজে ভোট দিতে গিয়ে দেখি কেন্দ্র আওয়ামী কর্মীতে বোঝাই। সম্ভবত তা দেখে বিএনপি সমর্থক ভোটাররা ভোট দিতেও যাননি।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে সমাবেশে এক বক্তার মুখে ইনসেনডিয়ারি বোমার কথা শুনেছিলাম। এই বোমার নাকি আওয়াজ আছে, কিন্তু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নেই। বিএনপি নেতাদের মুখে ইনসেনডিয়ারি বোমার খই ফুটেছে যার কোনও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছিল না। দলীয় নেতাদের অসাবধান কথা দলের ক্ষতি করতে পারে এমন কাণ্ডজ্ঞানও বিএনপি নেতৃবৃন্দের নেই। জনে জনে মুখপাত্র। আবাসিক এক নেতা আছেন— রুহুল কবির রিজভী, তিনি দিনরাত বিএনপির নয়াপল্টনের কার্যালয়ে অবস্থান করেন আর সালুনে ব্যাঞ্জনে প্রেস ব্রিফিং করেন। মাঝে মধ্যে ৭০-৮০ জন কর্মী নিয়ে বিএনপি অফিস থেকে ফকিরাপুল মোড় অথবা নাইটিঙ্গেলের মোড় পর্যন্ত মিছিল করেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেন, এটা নাকি বেগম খালেদা জিয়া আর তারেক জিয়াকে দেখানোর জন্য রিজভীর মহড়া। এতে নাকি চাকরি শক্ত হয়!

বিএনপিকে এবারের নির্বাচনে বিপর্যস্ত করেছে মনোনয়ন বাণিজ্য। আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীন নেতাও নাকি টাকা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দুর্বল প্রার্থী দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রার্থী ছিল দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী, কারণ ইন্দুরখানি আর ভান্ডারিয়া একই কেন্দ্র। সেখানে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে বেছে নেওয়া হয়েছে লেবার পার্টির ইরানকে। আর দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলেকে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন একটি কেন্দ্রে। অথচ সাঈদীর নিজ উপজেলা ইন্দুরখানির চেয়ারম্যান তার আরেক ছেলে।

আমির হোসেন আমুর বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রার্থী ছিল ইলেন ভুট্টো, তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সোনারগাঁওয়ে লিয়াকত হোসেন খোকার বিরুদ্ধে বিএনপির উপযুক্ত প্রার্থী ছিল রেজাউল করিম। তাকে মনোনীত না করায় মনোনয়ন পেয়েছে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে। এই মনোনয়নে বিএনপির দাউদকান্দির স্থানীয় একজন নেতার মাধ্যমে স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী এক সদস্যকে ২ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। লেনদেন প্রক্রিয়ার কাহিনি আমি স্বয়ং জানি। আমার জানার মধ্যে অন্তত ৫৩টি আসনে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে। অজানা আরও কত আছে কী জানি!

বিএনপিতে সৎ নেতার অভাব খুবই প্রকট। তবু তাদের প্রতি একশ্রেণির মানুষের সমর্থন আছে। কারণ যুক্তিতর্ক বিহীন আওয়ামীবিরোধীদের জন্য অন্য কোনও প্ল্যাটফর্ম নেই। অবশ্য এবার শেখ হাসিনা তার মেয়াদ সুস্থ শরীরে ক্ষমতাসীন থেকে শেষ করতে পারলে তাতেও ভাটার টান পড়বে। কারণ ১৭ বছর একটানা নিস্ফলা বৃক্ষের নিচে কেউ বসে থাকে না।

খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলছেন, বিএনপি আর গণফোরাম থেকে নির্বাচিত ৭ সদস্য সংসদে যোগদান করবেন না। অবশ্য উকিল আব্দুস সাত্তার সড়াইল-আশুগঞ্জ আসনে বিজয়ী হওয়ায় তাদের সদস্য সংখ্যা এখন ৮ জন। তাদের সদস্যরা শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে যদি স্থির করে থাকেন তাহলে তা হবে আরেক অরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাতে বিএনপির রাজনীতির এক পয়সা লাভ হবে না, বরং সংসদে থাকাই হবে উত্তম সিদ্ধান্ত। এই ৮ জন সদস্য সংসদে থাকলে তার প্রতিক্রিয়া তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে।

আর জামায়াতের প্রেম ছাড়তে না পারলে বিএনপির আরও বিপদ। নবপ্রজন্মের ছেলেরা তাদের জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখে আসছে জামায়াত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন। সুতরাং এই প্রজন্ম জামায়াতকে ঘৃণা করে। এখন তারা যদি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করে তবে এ প্রজন্ম থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর সরকারি দলের সঙ্গে বিদ্বেষভাব ত্যাগ করে সম্প্রীতির ভাব গড়ে তুলতে হবে। ভারতের বিজেপি আর কংগ্রেসের মাঝে সরকারি ও বিরোধী দল হিসেবে যে সম্পর্ক বিদ্যমান সেটাই আদর্শ সম্পর্ক।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

 

/এসএএস/জেএইচ/

x