হিসাবের মারপ্যাঁচে শ্রমিকের বেতন কমেছে

শহীদুল ইসলাম সবুজ ১৩:৩৫ , জানুয়ারি ১১ , ২০১৯

শহীদুল ইসলাম সবুজসদ্য তারুণ্যে পা রাখা গার্মেন্ট শ্রমিক সুমনকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। সুমনের সহকর্মী ও আত্মীয়রা অভিযোগ করলো, সেদিন সাভারে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলার সময়ে বিক্ষোভকারী ভেবে সুমনকে তাড়া করে পুলিশ এবং একপর্যায়ে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেডের শ্রমিক সুমন মিয়া। সুমনের লাশ নিয়ে শ্রমিকরা কারখানায় ফিরে বিক্ষোভ করলে পুলিশ সেখানেও লাঠিচার্জ করে এবং গুলি চালায় বলে তাদের অভিযোগ।  এবং যথারীতি এখনও কোনও দায় স্বীকার না করার পাঁয়তারা চলছে।  ন্যায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে এই হয় পরিণাম! যখন কিনা আমরা উন্নত দেশের পথে পা বাড়িয়েছি বলে সরকার দাবি করছে তখন পাঁচ বছর পর প্রকৃত অর্থে পুরনো শ্রমিকের ইনক্রিমেন্ট হওয়া ন্যূনতম বেসিক মজুরি বাড়ানো হলো সর্বোচ্চ মাত্র ২৭১ টাকা আর অন্যদিকে কমানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৪২০ টাকা। এই মারপ্যাঁচ বোঝা এত সহজ না। হ্যাঁ, শিল্প অঞ্চলের গার্মেন্ট শ্রমিকরা এখন যে ন্যায়সঙ্গত বিক্ষোভ করছেন সেটা এই হাস্যকর রকমের ন্যূনতম মজুরি আর মজুরি বাড়ানোর নামে করা প্রহসনের বিরুদ্ধেই।

ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকার দাবিতে দীর্ঘ পাঁচ বছর গার্মেন্ট শ্রমিক ও নেতৃবৃন্দের অনেক লড়াই আন্দোলন আর জেল-জুলুম নির্যাতনের পর এই সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয় ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে। কিন্তু বরাবরের মতোই উপেক্ষা করা হয় শ্রমিক ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনসমূহের দাবি দাওয়া।

মজুরি কমানোর এই চালাকিটা শ্রমিকরা বুঝতে পারে ২০১৩ সালে মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণার সময় জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ওই প্রজ্ঞাপনের ১৩ অনুচ্ছেদে সাধারণ শর্তাবলিতে পরবর্তী প্রতি বছরে বেসিক মজুরির সঙ্গে ৫% হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বোঝার সুবিধার জন্য শর্তাবলিটি তুলে ধরছি–‘এই প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি সমন্বয় করিয়া ১ (এক) বৎসর কর্মরত থাকিবার পর কোন শ্রমিকের মূল মজুরি ৫% (শতকরা পাঁচ ভাগ) হারে বাৎসরিক ভিত্তিতে বৃদ্ধি পাইবে এবং পরবর্তী বৎসরে ক্রমবর্ধমান হারে পুনরায় মূল মজুরির ৫% (শতকরা পাঁচ ভাগ) হারে বৃদ্ধি পাইবে এবং সোয়েটারসহ অন্যান্য গার্মেন্ট শিল্প সেক্টরে পূরণভিত্তিক (পিস রেট) মজুরিতে কর্মরত শ্রমিকগণও বাৎসরিক ভিত্তিতে মূল মজুরির ৫% (শতকরা পাচ ভাগ) হারে মজুরি বৃদ্ধির সুবিধা পাইবেন।

ব্যাখ্যা: ‘একজন শ্রমিকের মূল মজুরি ৪১০০ (চার হাজার একশত) টাকা হইলে ১ (এক) বৎসর কর্মরত থাকিবার পর উক্ত শ্রমিকের বাৎসরিক মজুরি বৃদ্ধি পাইয়া তাহার মূল মজুরি ৪৩০৫ (চার হাজার তিনশত পাঁচ) টাকা হিসাবে নির্ধারিত হইবে এবং পরবর্তী বৎসরে ক্রমবর্ধমান হারে তাহার মূল মজুরি ৪,৩০৫ (চার হাজার তিনশত পাঁচ) টাকার ৫% (শতকরা পাঁচ ভাগ) বৃদ্ধি পাইয়া ৪৫২০.২৫ (চার হাজার পাঁচশত বিশ টাকা পঁচিশ পয়সা) টাকা হিসাবে নির্ধারিত হইবে’।

২০১৩ সালে নতুন মজুরি ঘোষণা হওয়ার পর তা কার্যকর হয় ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। প্রজ্ঞাপনের শর্তানুযায়ী ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে শ্রমিকরা ৫% বর্ধিত বেসিক মজুরি পাওয়ার কথা। তখন ১নং গ্রেডের শ্রমিকদের বেসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৫০০ টাকা। সেই হিসাবে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শ্রমিকরা পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৫% বৃদ্ধিতে বেসিক মজুরি পাবেন। ২০১৫ সালে ৮৫০০ টাকার সঙ্গে ৫%  যোগ করে বেসিক দাঁড়ায় ৮৯২৫ টাকা। ২০১৬ সালে ৮৯২৫ টাকার সঙ্গে ৫% যোগ করে বেসিক দাঁড়ায় ৯৩৭১ টাকা। ২০১৭ সালে ৯৩৭১ টাকার সঙ্গে ৫% যোগ করে বেসিক দাঁড়ায় ৯৮৩৯ টাকা। ২০১৮ সালে ৯৮৩৯ টাকার সঙ্গে ৫% যোগ করে বেসিক দাঁড়ায় ১০,৩৩১ টাকা। ২০১৯ সালে ১০,৩৩১ টাকার সঙ্গে ৫% যোগ করে বেসিক দাঁড়ায় ১০,৮৪৮ টাকা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আগের কাঠামো অনুযায়ীই ১নং গ্রেডের প্রতি শ্রমিকের ২০১৯ সালে বেসিক মজুরি হওয়ার কথা ১০,৮৪৮ টাকা। কিন্তু নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে তাদের বেসিক নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৪৪০ টাকা! সুতরাং প্রকৃতপক্ষে ৫ বছরের পুরনো শ্রমিক যার বেসিকের ইনক্রিমেন্ট হয়েছিল তিনি এখন আগের কাঠামোতেই যে বেসিকটা পেতেন তারচেয়েও ৪১২ টাকা কম পাবেন! 

একইভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, ২নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট হওয়া বেসিক মজুরি ২০১৯ সালে এসে আগের কাঠামো অনুযায়ী যত হতো নতুন কাঠামোর কারণে এখন তারা সেটি থেকে ৪২০ টাকা কম বেসিক মজুরি পাবেন এবং ৩নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকেরা পাবেন আগের থেকে প্রায় ৪৯ টাকা কম বেসিক মজুরি।

দেখা যাচ্ছে, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ ও ঘোষণার ক্ষেত্রে সরকার ও মালিকপক্ষ অত্যন্ত সচেতনতার সাথে কৌশলে পূর্বঘোষিত প্রজ্ঞাপন, নীতিমালা ও শর্তাবলি এড়িয়ে গেছে। এমনকি এক্ষেত্রে তারা ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ধারা– ১৪৯ ও ধারা-২৮৯ সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। এই দুটি ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে–

(ধারা ১৪৯) নিম্নতম মজুরি হারের কম হারে মজুরি প্রদান নিষিদ্ধ: 

# কোনও মালিক কোনও শ্রমিককে এ অধ্যায়ের অধীন ঘোষিত বা প্রকাশিত নিম্নতম হারের কম হারে কোনও মজুরি প্রদান করতে পারবেন না। 

# কোনও শ্রমিককে ঘোষিত নিম্নতম হারের অধিক হারে মজুরি অথবা অন্য কোনও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহতভাবে পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না, যদি কোনও চুক্তি বা রোয়েদাদের অধীন বা অন্য কোনও কারণে তিনি উক্ত রূপ অধিক হারে মজুরি পাওয়ার অথবা কোনও প্রথা অনুযায়ী উক্ত রূপ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন। 

(ধারা-২৮৯) নিম্নতম মজুরি হারের কম হারে মজুরি প্রদানের দণ্ড: 

# কোনও মালিক একাদশ অধ্যায়ের অধীন ঘোষিত নিম্নতম মজুরি হারের কম হারে কোনও শ্রমিককে মজুরি প্রদান করলে, তিনি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে, অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। 

# যে ক্ষেত্রে আদালত উপ-ধারা (১)-এর অধীন কোনও দণ্ড আরোপ করে সেক্ষেত্রে, আদালত উহার রায় প্রদানকালে, উক্তরূপ কোনও লঙ্ঘন না হলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে যে মজুরি প্রদেয় হতো এবং উক্তরূপ লঙ্ঘন করে মজুরি হিসাবে যে অর্থ প্রদান করা হয়েছে উহার পার্থক্যের পরিমাণ অর্থ তাকে প্রদান করার আদেশ দিতে পারবে।

অন্যদিকে যেসব গ্রেডে বেসিক বেড়েছে সেটা পুরনো শ্রমিক, যারা ইনক্রিমেন্ট হওয়া বেসিক পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে এতটাই সামান্য যে সেটা দিয়ে বড়জোর দুই বেলা থেকে পাঁচ বেলার খাবরের খরচ চলতে পারে! উপরে ১নং গ্রেডের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আমরা যেভাবে হিসাব করেছি সেভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে, ৭নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট হওয়া বেসিক মজুরি ২০১৯ সালে এসে আগের কাঠামো অনুযায়ী যত হতো নতুন কাঠামোর পর এখন তারা সেটি থেকে মাত্র ২৭১ টাকা বেশি বেসিক মজুরি পাবেন, ৬নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকেরা পাবেন মাত্র ১৯২ টাকা বেশি, ৫নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকেরা পাবেন মাত্র ১৬৫ টাকা বেশি আর ৪নং গ্রেডের পুরনো শ্রমিকদের বেসিক প্রকৃত অর্থে বাড়বে মাত্র ৮০ টাকা!

বেসিক মজুরি শ্রমিকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেসিকের ওপর বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ নির্ভর করে। তাই বেসিক কম হওয়া মানে শ্রমিকের ভাতার পরিমাণও কমে যাওয়া। সুতরাং দেখা যাচ্ছে মালিকপক্ষ ও সরকার গার্মেন্ট শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত বেড়েছে তার বিশাল বিশাল শতাংশের হিসাব দেখালেও প্রকৃত অর্থে মালিকপক্ষ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির যে চাপ সেটির একটি বড় অংশ ওপরের গ্রেডের এবং পুরনো শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। মনে রাখতে হবে, একদম নিচের গ্রেডে শ্রমিক মাত্র ১০ শতাংশ। বেশিরভাগ শ্রমিকই পুরনো এবং ৫ম থেকে দ্বিতীয় গ্রেডের মধ্যে কাজ করেন। তাই পুরো ইন্ডাস্ট্রির কথা চিন্তা করলে আমরা অনুমান করতে পারি যে, মালিকপক্ষ পাঁচ বছর পর এসে যে হাস্যকর পরিমাণে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়েছিল সেই অকিঞ্চিৎকর মজুরি বাড়ার চাপেরও একটা বড় অংশ কতটা ন্যক্কারজনকভাবে তারা নিজেদের ঘাড় থেকে পুরনো ও উপরের গ্রেডের শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

শ্রম আইন, প্রজ্ঞাপন, নীতিমালা, শর্তাবলি, সর্বোপরি প্রায় ৫০ লক্ষ শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠন-নেতৃবৃন্দ সবার দাবি দাওয়া উপেক্ষা করে সর্বমোট বেসিক ও ভাতাসহ গড় মজুরি ৮০০০ টাকা নির্ধারণ এবং করা হয়। ঘোষণার সময় বলা হয় এই মজুরি কার্যকর হবে ডিসেম্বর মাস থেকেই। শ্রমিকরা মনে করেছিলেন ডিসেম্বর থেকেই তারা নতুন মজুরি পাবেন, তাই দেখা যায় ডিসেম্বরের ৮ তারিখ থেকেই নতুন মজুরির দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে। ঘোষণার সময় স্পষ্ট করা হয়নি ডিসেম্বর মাসের বেতন জানুয়ারিতে কার্যকর হবে। কিন্তু এখন এই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এসে শ্রমিকরা যখন বুঝতে পারছেন যে মজুরি বৃদ্ধির কথা বলে উল্টো তাদের বেসিক মজুরি-ই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছে বাঁচার মতো মজুরির অধিকার থেকে। তখন তারা অধিকার আদায়ে রাজপথ বেছে নেবেন এটাই তো স্বাভাবিক। আবার অনেক কারখানার শ্রমিকরা বলছেন তারা কোনও গ্রেডের শ্রমিক মালিকরা তা স্পষ্ট করছে না। বেতন দেওয়ার সময় মালিকরা তাদের সুবিধাজনক গ্রেড অনুযায়ী শ্রমিকদের ঠকাবে বলেও সন্দেহ করছেন শ্রমিকরা। শ্রমিকরা বলছেন আন্দোলন ছাড়া তাদের অধিকার আদায়ের বিকল্প কোনও পথ নেই। তাই তারা রাজপথকেই বেছে নিয়েছেন। আর একারণেই মরেছেন সুমন মিয়া। সুমনের এই রক্ত বৃথা যেতে দেবেন না শ্রমিকেরা। দুনিয়ার মজদুর এক হবেই!

লেখক:  শ্রমিক নেতা ও অ্যাকটিভিস্ট

 

 

/এমওএফ/আপ-এফএস/

x