লোক দেখানো ফানুসের বিজ্ঞাপন

শেগুফতা শারমিন ১৫:৩৮ , ফেব্রুয়ারি ০৭ , ২০১৯

শেগুফতা শারমিনসবাই বললো বা বলছে এবং আরও কিছু দিন বলবেও। এবার নিজে একটু এই বিষয়ে না বললে হয়? মানুষে কী বলবে? এই যে ‘মানুষে কী বলবে’– এই ভাবনাতেই আমাদের সময়, মেধা, সামর্থ্যের প্রায় সবটুকু অপচয় করে  ফেলছি। মানুষে বলবে বলেই আমরা এখন খাই। মানুষে বলবে বলেই পড়ি। সে পোশাক হোক বা পুস্তক। এমনকি মানুষের বলার জন্যই যেন লিখিও। পরিষ্কার করে যদি বলি, কী খাই, কোথায় খাই, কীভাবে খাই এটা আর এখন খেয়ে নিজে উপভোগ করার বিষয় নয়। যেন লোক দেখানোর বিষয়।
পোশাকের ব্যাপারেও তাই। কী গায়ে পরলাম, কতটা স্বস্তি পেলাম বা পেলাম না, সেটা ব্যাপার না। ব্যাপার হলো, লোককে দেখাতে পারলাম কিনা। পার্টি ড্রেস থেকে রাত পোশাক সবকিছুই যেন সবাইকে দেখানোতেই সার্থকতা। আর পড়াশোনা? সে আর কী বলবো, এটাও এখন গল্পের বিষয়। একসময় মানুষ গল্পের বই মানে পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই পড়লে বকা খেত। তবুও সে সময়ই মানুষ সবচেয়ে বেশি বই পড়তো। সময়ের পরিবর্তনে সেই পড়ার পরিমাণ কমে এসেছে প্রমাণিতভাবে। এখন হয়েছে গল্পের বই পড়াও একটা গল্পের বিষয়। লোক দেখানোর বিষয়। এই যে বইমেলা চলছে বাংলা একাডেমির মাঠে, আর ফ্রি প্রদর্শনী চলছে, ফেসবুকের নিউজফিডে, কে কী বই কিনলো। খটকা লাগে বই কী পড়ার জিনিস না কিনে ছবি পোস্ট করার জিনিস, ভেবে পাই না। ‘বই সে তো তারও একখানা রয়েছে’ উত্তর-পুরুষেরা এখন বইকেও ভাবে লোক দেখানোরই বিষয়।

আর লোক দেখানো লেখার কথা আর কী বলবো। এখন দেশে যত হাত তত লেখক। সবাই লেখেন। সবাই বিষয়ের অপেক্ষায় থাকেন। একটা বিষয় পেলে তাই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন। খামোখা পিছিয়ে পড়বেন কেন? তাছাড়া এই বিষয়ে যদি কিছু না লিখি লোকে কী বলবে! সুতরাং লোকের মুখরক্ষায় লেখো। রান্না থেকে রাজনীতি, সংসার থেকে সমাজনীতি, ইয়োগা থেকে অর্থনীতি, মন খারাপ থেকে মনোবিজ্ঞান,  পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা পর্যন্ত সবাই সবকিছুর বিশেষজ্ঞ। ছোটবেলায় বড়বোনদের গাইড বই দেখতাম, ‘একের ভেতর তিন উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি’। আর এখন বড়বেলায় বড় মানুষদের জ্ঞানের বহর দেখি। ‘একের ভেতর সব উচ্চ ভাবের এসকেলেটর’।

তো এইবার মূল জায়গায় ফিরি। নিজেও একটু বাহাদুরি দেখানোর সুযোগ কাজে লাগাই। নইলে আবার ‘লোকে কী বলবে?’

বেশিদূর না যাই, এই গত সপ্তাহের বাজার কাটতি সবচেয়ে আলোচিত বিষয়েই থাকি। চট্টগ্রামের এক স্বামীর আত্মহত্যা। সবার অবশ্য সবকিছু বলা শেষ। বহু আবেগীয়, ধর্মীয়, সামাজিক, মনোবৈজ্ঞানিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, মতামত বহু কিছু দেখলাম, পড়লাম। স্বামীর পক্ষে স্ত্রীর বিপক্ষে, মৃদুস্বরে স্ত্রীর পক্ষে, স্বামীটির কাপুরুষতার সমালোচনা করে। সাথে ফ্রি ভিডিও, রগরগে গল্পের ফ্রি বর্ণনা তো আছেই। এতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চোখে পড়লো; অথচ এই যে লোকে কী বলবে নামের সেই জুজুর গল্পটা নজরে এলো না এতদিনেও।

যতটুকু দেখলাম পড়লাম, পুরোটাই মনে হলো ডাক্তার  দম্পতির লোক দেখানোর গল্প। জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান, সামর্থ্যের বাইরে কাবিনের অংক, মৃত স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী, মন ভেঙে যাওয়ার পরও বিয়ের আয়োজন। সবকিছুর পেছনে আছে লোক দেখানোর দায়। লোকে কী বলবে নামের জুজুর আতঙ্ক। ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো তাদের শত শত ঝলমলে রঙিন ছবিও সাক্ষ্য দেয়, ভালোবাসা বা কমিটমেন্ট থাকুক বা না থাকুক, লোক দেখানোর চর্চাটা ছিল প্রচণ্ড। সবশেষে আমরা দেখতে পাই, লোক দেখানোর ক্লান্তির এক মর্মান্তিক পরিণতি।

এই যে এক দম্পতির গল্প এখন ওপেন সিক্রেট, সবাই জানি। জেনে গেছি। তাই মতামত দিয়ে যাচ্ছি। হয়তো যে নিজে মত দিচ্ছে, সে নিজেও কোনো না কোনোভাবে লোক দেখানোর যুদ্ধে শামিল হয়ে আছে। যতদিন লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে, আমরা লোকে দেখছি, বাহবা দিচ্ছি, তালিয়া বাজাচ্ছি। যুদ্ধে সে হেরে গেলে বা পিছিয়ে পড়লেই, যার যার লোক দেখানোর লড়াই অস্বীকার করে আবার আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে।

কতকিছু সামনে আসবে। আসবে না শুধু লোক দেখানোর যুদ্ধের সরল স্বীকারোক্তি। আমরা ভুলে যাই, লোক দেখানোর লড়াইয়ে নামা মানুষগুলো আর মানুষ থাকে না। এরা হয়ে ওঠে একেকটা রঙিন ফানুস। চোখ মেললেই আজকাল শুধু তাই ফানুস দেখা যায়, বহু রঙের ফানুস, যার রঙ ফুরালেই ঠুস!

লেখক: উন্নয়নকর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

x