‘ঘাড়ত্যাড়া’ নতুন প্রজন্ম ও আশাবাদ

চিররঞ্জন সরকার ১৭:১৭ , ফেব্রুয়ারি ০৮ , ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারনতুন প্রজন্ম, যাদের ইংরেজিতে বলা হয় নিউ জেনারেশন। বাংলাদেশে এই শ্রেণির এখন বাড়বাড়ন্ত। দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই যুবসমাজ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। এরাই দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি। এই নতুন প্রজন্ম নিয়ে রয়েছে নানা বিভ্রান্তি। তারা ঠিক কেমন, তাদের চাহিদা বা প্রত্যাশা কী, সেটা নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য কোনও গবেষণা নেই। আধুনিক যন্ত্রপ্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন প্রজন্মের রয়েছে তাৎক্ষণিক চাহিদা মিটে যাওয়ার বাতিক। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ক্রিকেট, ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল, ইউটিউব, ফেসবুক- এই হচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্রধান আকর্ষণ। এরা ক্যাশলেসও বটে। যখন যা ইচ্ছে, এরা অনলাইনে কিনে ফেলে। নগদ টাকা না থাকলেও অসুবিধা হয় না। এজন্য ক্রেডিট কার্ড আছে, পেমেন্ট অন ডেলিভারি আছে, ইনস্টলমেন্টের সুবিধা আছে; আর একদিনের মধ্যেই সাধারণত জিনিসটা বাসায় চলে আসে। কেউ সিনেমা দেখতে চাইলে ইউটিউব বা অন্য মিডিয়াতে সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পারে, কিংবা পে-চ্যানেলে গিয়েও দেখতে পারে। সিনেমাটা কাছের সিনেমা হলে আছে কী নেই নেই, শোর টাইমটেবল, টিকিট আছে কিনা– এসব নিয়ে কোনও ঝামেলাই নেই। একটা টিভি সিরিজ দেখার ইচ্ছে হলে সঙ্গে সঙ্গেই ইন্টারনেটে সেটা দেখে ফেলা যায়। পরের পর্বের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস অপেক্ষার ফলে সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সেটার কোনও বিষয়ই আর নেই এখন। কেউ কেউ তো আবার এতই অধৈর্য যে, মাঝের পর্ব বাদ দিয়ে একেবারে শেষ পর্ব দেখে ফেলে।

কেউ কেউ এই প্রজন্মকে ‘ঘাড়ত্যাড়া প্রজন্ম’ বলে ডাকে। কারণ, এরা পুরনো নিয়মনীতি প্রথাপদ্ধতির বড় বেশি ধার ধারে না। এরা নিজে যা ভালো মনে করে তা-ই করে। বড়দের অনুশাসন, বিধিনিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের কাজটি করে যায়। এদের আলাদা একটা জগৎ আছে, চিন্তাচেতনা আছে। বড়দের মুখের ওপর একটা কথা বলতে এদের একটুও আটকায় না। খারাপ ব্যবহার, ভালো ব্যবহার যা করে—সেটা ওরা নিজের বুঝ অনুযায়ীই করে। ওদের খামখেয়ালিপনাটুকু নিতান্তই ওদের। ওদেরকে এর জন্যে আলাদা কোনও শিক্ষা দিতে হয় না। শিক্ষা ওরা নিতেও চায় না!
গত দুই দশকে আমাদের সমাজে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। নগরায়ণ ঘটেছে, মানুষ বেড়েছে, মানুষের চাহিদা বেড়েছে, পেশার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এসেছে। রাজনীতির কারবারিরা ছাড়া প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে যন্ত্র-প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মের মধ্যে। এই প্রজন্ম দেখে আর ঠেকে শিখেছে, সরকারি চাকরির প্রত্যাশা করে লাভ নেই। নিজেদের রোজগার ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।
এরা এখন অনেকেই অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন পরিবহন চালায়। পাড়ায় পাড়ায় খাবারের দোকান, পোশাকের দোকান খুলছে এরা। এই প্রজন্মের শিক্ষিত বাঙালির ভাবনাচিন্তা পাল্টেছে। এরা আর ব্যবসাকে অপমানজনক বা অপরাধ ভাবে না। অটোবাইক চালানো বা খাবার সাপ্লাইয়ের কাজকেও নতুন প্রজন্মের বাঙালি আর অসম্মানের ভাবে না। বিশ্বায়িত অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে চায় এরা। চায় দিবারাত্রি কাজ করতে।

এরাই নতুন যুগের রানার। এরা মল কালচার, স্মার্টফোন, ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্টারনেট, ওটিপি ব্যবহারে দক্ষ। এরা ক্যাশলেস জেনারেশন। এরা খুব একটা আড্ডা দেয় না। কাজ আর কামাই নিয়েই এদের যাবতীয় ভাবনা। ওরা ভোগ করতে চায়। উপার্জন চায়। সেটা নিউইয়র্ক কিংবা ভুরুঙ্গামারী যেখানেই হোক।

নতুন প্রজন্ম এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। আগ্রাসনই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ পন্থা, এমনটাই বলা হয়। তাই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কিছুটা অত্যুৎসাহী হয়েই যেন ইংরেজিয়ানা চর্চা করছে। সে বুঝে গিয়েছে, এই বিশ্বায়িত দুনিয়ায় একটাই ভাষা। তার নাম ইংরেজি। তাই স্বাচ্ছন্দ্যে ইংরেজিতে কথা বলা রপ্ত করছে সে। বেঁচে থাকার তাগিদে। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া আরও অগ্রসর যারা তারা তাদের কথায় বাংলা টান ধরে ফেললেও, তাতে এই নতুন বাঙালির কিছু যায় আসে কি? কল সেন্টার, ব্যাংক, শপিংমল, অ্যাপ ক্যাব, হকার স্টল, জোম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, আমাজন-এর হয়ে লাস্ট মাইল জব—এদের কাজ বন্ধ হবে কি?

অনেকে নতুন প্রজন্মকে শিকড়হীন বা ঐতিহ্যবিমুখ বলে সমালোচনা করেন। এটাও বাস্তবসম্মত নয়। কোনও একটি প্রজন্মকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে বিচার করা শোভন হবে না। একটি প্রজন্মের স্বভাব বা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য এবং সময়বিশেষে তার পরিবর্তনের পেছনে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক কারণাবলির গুরুত্ব অপরিসীম। বেঁচে থাকার তাগিদে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যদি নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-বিচারের বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগী না থেকে অপরাপর সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট হয়, তবে কি তাদের দোষ দেওয়া যায়? জৈবিক ধর্মের প্রথম মন্ত্রই যেখানে নিজেকে বাঁচানোর, তখন সূক্ষ্মতর চিন্তায় ভাবাবেগাপ্লুত হয়ে পেছনে পড়ে থাকা শুধু বোকামিই নয়, আত্মঘাতীও বটে! নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে সকলেই গর্বিত হতে চায়। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি সময়বিশেষে এর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষিত হলে জীবিকার বাজার যে সীমিত ও সংকুচিত হবে, তাতে তো দ্বিমত নেই। সে তুলনায় ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিতরা বহুগুণ বড় পরিসর পাচ্ছে এবং পাবে। সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির যে ক্লিষ্ট অবস্থা, তাতে শিক্ষিত কর্মক্ষম যুবশ্রেণির বহুলাংশকেই জীবিকার জন্য ভিন্নতর পথ বেছে নিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এটা বোঝে এবং এ কারণেই নানাবিধ ছোটখাটো স্বনির্ভর প্রকল্পে এবং বিভিন্ন ব্যতিক্রমী পেশা অবলম্বন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। যা কিনা অদূর অতীতে কেউ ভাবতে পারতো না। এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ যে, বাঙালি ছেলেমেয়েরা আজকাল কাজের কৌলিন্যকে বিচার্য বিষয় না করে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজের গুণগত মানকেই বিচার করছে।
নতুন প্রজন্ম সময়ের সঙ্গে চলতেই স্বচ্ছন্দ। মানিকগঞ্জ অঞ্চলের একটি প্রবাদ আছে, ‘যেমন কাল, তেমনি ফাল’ (লাফ)। ইংরেজ আমলেও যা ছিল সত্য, এখনও তা-ই। তখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজি শিখে নিতো, ইংরেজদের অধীনে কেরানিবৃত্তি করার দুর্মর তাগিদে। সেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে, তার থাকত কৃপণের আসক্তি, প্রেমিকের প্রীতি নয়, এমনটাই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দায় বাঙালি এদের ওপর চাপিয়েছিল কি? ইতিহাস কী বলে? নবজাগরণের নায়কদের জন্য আসন তবে পাতা হবে কোথায়?
রাস্তার দোকান থেকে, ছোট ব্যবসা থেকে নিজেদের ভাগ্যই শুধু এরা বদলায়নি, ‘আন্দোলনের রাজনীতি’কে বিদায় দিয়ে দেশে ‘পরিবর্তন’-এর চালিকাশক্তি এরাই। বর্তমান রাজনীতির প্যারাডাইম শিফট এখানেই। সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির আগ্রাসনকে উপেক্ষা করে তারা অসংগঠিত নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন আসলে বাঙালিত্বের দোহাই টেনে খুব একটা লাভ নেই। মুক্তিবেগের খোঁজে যেসব বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছেন, সচেতনভাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্পর্শ এড়িয়ে চলতে চাইছেন, তাঁদের বিরূপ সমালোচনা না করে, তাঁদের পাশেই বরং দাঁড়ানো উচিত। নতুন বাঙালিরা বিশ্ববাজারের অংশ হয়ে অন্য যেকোনও দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতার উন্মুক্ত ক্ষেত্রে শিংয়ে শিং দিতে চায়। ইংরেজিকেই অবলম্বন করে বাঙালির বিজয়রথ অপ্রতিরোধ্য রাখতে চায়। এদের কাছে আশা করা অন্যায়, এরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হবে। ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, এরা নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে পুরোমাত্রায় সচেতন। তাই সীমিত সামর্থ্যে লক্ষ্যপূরণে মরিয়া এরা। সবদিক বজায় রাখা সম্ভব নয়। একদিকে নিজের জীবনকেও জাগতিক সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যাবো, আবার একই সঙ্গে নিজের কৃষ্টি আর সংস্কৃতিরও নিরলস সেবা করে যাবো—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।

বাঙালির এই নতুন প্রজন্ম ‘সংস্কৃতিমান বাঙালি’ হওয়ার আদেখলেপনা যে দেখায় না, এটাই তাদের নির্ভেজাল সততা। জীবনানন্দের কবিতাপাঠে বা রবীন্দ্রসংগীতে এদের কোনও আগ্রহ না থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? জীবনের সর্বক্ষেত্রে চলছে দুরন্ত প্রতিযোগিতা। এদের লক্ষ্য ‘সব পেতে হবে’। লক্ষ্যের অভিমুখ নিয়ে এদের নিজের মধ্যে কোনও দোলাচল নেই। এরা জানে ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির বাহকরা ঠিকই বাঁচিয়ে রাখবে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। নতুন প্রজন্মের এই চিন্তাভাবনার স্বচ্ছতাকে কি আমরা কেবলই নাক সিঁটকে যাবো?

লেখক: কলামিস্ট

/এমওএফ/

x