রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোন পথে?

লীনা পারভীন ১৭:২১ , ফেব্রুয়ারি ০৮ , ২০১৯

লীনা পারভীন

‘আবারও মিয়ানমার থেকে মানুষের ঢল’–শিরোনামে একটি সংবাদে চোখ আটকে গেলো। বিরক্তি ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। হচ্ছেটা কী এই রোহিঙ্গা ইস্যুতে? কেন আমাদের সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে পারছে না? কোথায় দুর্বলতা, কোথায় আটকে আছে ওদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি? ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার থেকে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছিল বাংলাদেশের সীমানায়। কেবল ২০১৭ নয়, এর আগেও এদেশে বসবাস করছিলো প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা, যারা এখন প্রায় স্থায়ী অবস্থানে আছে। ২০১৭ সালে যে বৃহৎ আকারে এসেছিলো সেই ধাক্কা এখনও সামলাতে পারছে না বাংলাদেশ। আমাদের দেশের গর্ব যা গোটা বিশ্বের কাছে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত সেই কক্সবাজার এখন প্রায় ধ্বংসের প্রান্তে। সেসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা আজকে প্রায় উদবাস্তু অবস্থায় আছে। জমিজমা দখলে নিয়ে একপ্রকার স্থানীয়দের মতোই বসবাস শুরু করেছে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা। কেবল সেখানেই থেমে নেই। তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে চলে যাচ্ছে বিদেশের সীমানাতেও। জড়িত হয়ে পড়ছে নানারকম অপকর্মে।

সর্বশেষ আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার নারী গর্ভবতী বলে জানা গিয়েছিলো। একেকটি পরিবারে রয়েছে ৭ থেকে ১০টি করে সন্তান। এই বিশাল জনসংখ্যার ভার সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম অবস্থায় আছে বাংলাদেশ। তারা জড়িয়ে পড়ছে নানারকম অপরাধমূলক কাজে। রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের মধ্যে মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। মাদকদ্রব্যের এক অবাধ বাজার গড়ে তুলেছে। কক্সবাজার, টেকনাফ, কুতুপালংসহ গোটা এলাকায় এখন কেবল মানুষ আর মানুষ। ক’দিন আগেও যেখানে ছিল সবুজ বনাঞ্চল এখন সেখানে ছোট ছোট ঘর আর মানুষের অবস্থান। সমুদ্রের পাড়ে এখন আর নেই দর্শনার্থীদের বিচরণ। আছে সেখানে নানা সাহায্যকারী সংস্থার লোকদের আবাসস্থল।

একদিকে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে অর্থনৈতিকভাবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকে এখন অনেকটাই স্থিতীশীল অবস্থানে আছে আমাদের দেশ। সামাজিক সূচকেও উন্নতির পথেই। তবে যে হারে রোহিঙ্গা সমস্যা বেড়ে চলেছে, জানি না আমাদের এই সুখের দিন আর কতদিন স্থায়ী হবে। সরকারের টানা তৃতীয় টার্ম চলছে ক্ষমতার।  পরিবর্তন এসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না আমরা এই একটি ইস্যুতে। নানা পর্যায়ে আলোচনা চলছে। মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে নিম্নস্তরে আমরা আছি বলে জানা যাচ্ছে। নানা বিদেশি সংস্থার আশ্বাস বাণীতে এখন আর আস্থা রাখার মতো দিন আছে বলে মনে হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো একের পর এক বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে তারা বলছে মিয়ানমারকেই ফিরিয়ে নিতে হবে এই রোহিঙ্গাদের, আবার অন্যদিকে বলছে রাখাইনে এখনও ফিরে যাওয়ার মতো স্থিতিশীল পরিস্থিতি নেই। তাহলে সেই পরিস্থিতি তৈরিতে কেন তারা ভূমিকা রাখছেন না সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন আমাদের মনে।

দুইদিন পর পর জাতিসংঘের দূতেরা আসছেন। ঘুরে যাচ্ছেন। নিজেদের মতো করে হা-হুতাশ করে দিন কাটিয়ে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে খেলা করছেন। সবই করছেন কিন্তু তাদের এই আসা-যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? এই উত্তর কি আমরা কেউ জানি? বিশ্ববিখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে কক্সবাজার এলাকা। বড় বড় সংবাদ ছাপানো হচ্ছে অথচ তাদের কারও মুখেই মিয়ানমারের জন্য কোনও বাণী নেই। হয়তো অনেকে বলবেন এতে ফান্ড আসছে।

বাংলাদেশের ঘাড়ে তো আর খরচের চাপ পড়ছে না। খরচ কমানোই কি আমাদের লক্ষ্য? বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এরমধ্যে আগের ও পরের মিলিয়ে রোহিঙ্গা আছে ১৬/১৭ লাখ, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশু। আবার আসা শুরু করেছে নতুন করে। কিছুদিন আগে ভারত থেকেও রোহিঙ্গাদের এ দেশের সীমান্ত দিয়ে ঢোকার খবর দেখেছি। অর্থাৎ চারপাশ থেকে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। এই বিরাট বহিরাগত জনসংখ্যার চাপ কেমন করে সামলাবে সরকার? বিষয়টা খুব একটা পরিষ্কার হচ্ছে না এখনও। কেবল আলোচনা করেই কি পাওয়া যাবে সমাধান? নাকি শক্ত চাপ তৈরি করতে হবে মিয়ানমারের ওপর? ভারত ও চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক এখন ভালো। এই সমস্যা সমাধানে তাই ভারত ও চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহকারে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনে কী বলে সে জায়গাগুলোকে সামনে আনাটাও জরুরি। মিয়ানমার কি তার ইচ্ছামত এভাবে আরেকটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের ঘাড়ে চেপে বসতে পারে? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় গোটা বিশ্বের কাছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশ এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে উপেক্ষা করে কেবল মিয়ানমারের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতো বাস্তবতা এখনও হয়নি।

বাংলাদেশের উচিত অত্যন্ত কৌশলী হয়ে আইন ও বাস্তবতার নিরিখে জোরেশোরে লবিং শুরু করা এবং যেভাবেই হোক মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে বাধ্য করা। এভাবে আর কত চলবে? চলতে পারে না। একটি স্বাধীন দেশের ওপরে এমন একটি স্বেচ্ছাচারিতা চালানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। মিয়ানমারের সঙ্গে অনেকবার বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে। কোনও লাভ হয়নি। তারা এগিয়ে আসেনি। রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে মিয়ানমার অত্যাচার চালিয়ে আসছে সেটি কোনোভাবেই মানবতার সংজ্ঞায় আসে না।  ‘এথনিক ক্লিনজিং’ একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আর মিয়ানমার সেটাই চালিয়ে যাচ্ছে প্রথম থেকেই। তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে তারা বাংলাদেশের ওপর চাপাতে পারে না। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক যে বাণিজ্যিক হিসাব সেখানে বাংলাদেশের নিজের জায়গাটা আগে অংক করে বের করতে হবে। মিয়ানমারকে কেমন করে টেক্কা দিয়ে নিজেদের দিকে চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রকে টানা যায় সেই জায়গাটি যদি বের না করা যায় তবে আরও অনেক ভোগান্তি আছে আমাদের কপালে।

মানবতার স্বীকৃতি কেবল বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। রোহিঙ্গাদের মানবতা এখানে কোথায়? একা বাংলাদেশের পক্ষে এ মানবতা বেশি দিন ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। নিজেদের সমস্যায় যে দেশটি জর্জরিত তাদের জন্য অন্য আরেকটি দেশের সমস্যাকে টেনে বয়ে চলার কোনও মানে হয় না।

নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশ যেমন ঠেকাতে হবে তেমনি পুরনো রোহিঙ্গাদের যে করেই হোক ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মিয়ানমারকে বাধ্য করার রাস্তাও খুঁজে বের করতে হবে শিগগিরই।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এমওএফ/

x