সন্তান কি আমার কাছে নিরাপদ?

তুষার আবদুল্লাহ ১৩:৫৬ , ফেব্রুয়ারি ০৯ , ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহশিশুরা পরিবারে নিরাপদ নেই। যৌন নিপীড়নের শিকার ছেলে-মেয়ে উভয় সন্তানই। পরিবারের অতি নিকটজনের কাছে যৌন নিপীড়নের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হচ্ছে আমাদের সন্তানরা। এক সময় মায়ের কাছে, বড় বোনের কাছে, নানি-দাদির কাছে কখনও বা বাবা’র কাছে এসব অন্ধকার অভিজ্ঞতার কথা ফিসফিস করে বলা হয়তো। চাপাকান্না হারিয়ে যেতো ঠোঁটে বড়দের আঙুলের চাপে। শিশুদের এই পীড়নের কথা পরিবার কখনও কখনও বিশ্বাসও করতো না। ঘরে পীড়নের শিকার শিশুরা বাইরেও যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। মহল্লা, বাজার,পরিবহন থেকে শুরু করে স্কুল। এক প্রকার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে তাদের বড় হওয়া। নিজের শরীর, সম্পর্কের ওপর তৈরি হতে থাকে ঘৃণা। এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে চাকরি ও সাংসারিক জীবনে এরা আত্মকেন্দ্রিক, ভীত ও আস্থাহীনতায় ভুগেন। কারো কারো মানসিক ভারসাম্য হারানোর কথাও জানি। এখন সেই ঠোঁট চাপার দিন নেই। জানালা দুয়ার ঘুলঘুলি আটকেও  অন্ধকারের সেই ফিসফিস শব্দ আটকে রাখা যাচ্ছে না। শিশুরা কথা বলতে শুরু করেছে। মা কথা না শুনতে চাইলেও বাড়ির বাইরে গিয়ে বলছে। বাবাও যদি তার সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করে, নিস্তার নেই। কাঠগোড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে বাবাকেও। ভয়-ভীতি ভুলে শিক্ষকের আচরণের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হচ্ছে।

পরিস্থিতি যত বদলাচ্ছে ততই খবর আসছে বাবার দ্বারা কন্যার যৌন নিপীড়িত হওয়ার। এমন ঘটনা হুট করেই শুরু হলো এমন বলা যাবে না। বরাবর এমন  ঘটনা ঘটছে। এখন খবরগুলো সহজেই প্রকাশ পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার বিস্তার এর একটি বড় কারণ। তারপরও যতটুকু খবর আসছে, তা ঘটে যাওয়া বা যা ঘটে যাচ্ছে তারচেয়ে খুব সামান্যই। এখনও অনেক শিশু-কিশোর-কিশোরী পরিবারের প্রিয় মানুষটির যৌন পীড়নের কথা কারও কাছে বলতে পারছেন। ভয়ের চেয়েও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এখানে লজ্জা বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। নিজ পিতা, ভাই, মামা, চাচা’র এই চরিত্র বাইরের জগতের কাছে উপস্থাপন করতেও শিশুরা লজ্জা  পায়। একে তারা নিজের লজ্জা বলে মনে করছে। ফলে ভয়ংকর এই বেদনা-বিপন্নতা নিয়েই তারা বড় হচ্ছে।

আমরা অভিভাবকরা যে এখবর জানি না তা নয়। পরিবারের ওই মুখগুলো আমাদের কাছে অস্পষ্ট এমনটাও বলতে পারি না। শিশুর বিপন্নতার চেয়ে প্রিয়জনের মুখোশ সুন্দর মুখকে রক্ষা করাকেই দায়িত্ব মনে করছি। নষ্ট মুখগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রবণতা যে অপরাধ, এই বোধটুকুই আমাদের তৈরি হয়নি। আমরা সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার দিক দিয়ে দশ দিগন্ত পাড়ি দেওয়ার ভঙ ধরে বসে আছি। আসলে কিন্তু নিজেদের আমরা বসে আছি নষ্ট চিন্তার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। আমাদের চিন্তা কাঠামোর পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।

এই পুর্নির্মাণের জন্য সমাজের কোনও প্রস্তুতি নেই। পুঁজির পেছনে ছুটতে গিয়ে সমাজ ঠাওর করতে পারেনি কখন শ্রেণিস্তর গুলো ধসে পড়েছে।

যে মধ্যবিত্ত রাষ্ট্র-সমাজ নির্মাণ ও পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখে আসছিল, তারা অতি উচ্চতে লাফ দিলো। এই লাফ দিতে গিয়ে  কেউ হয়তো  উঁচুর দড়িটা ঠিক ধরতে পারছে, পিছলে পতিত হওয়ার সংখ্যাটাই বেশি। বিত্তকে ধরার জন্য এক প্রকার আপস ও মধ্যপন্থা সকলেরই। কিন্তু একসময় মধ্যবিত্ত নৈতিকতা ও শুভ চিন্তার বিকাশে ছিল আপসহীন। সেখান থেকে স্থানচ্যুতি ঘটেছে এই শ্রেণিটির। উচ্চ ও নিম্ন স্তর কখনোই সমাজ, রাষ্ট্রের মূল্যবোধ নিয়ে ভাবেনি। যা ভাবার তা মধ্যবিত্তই ভেবেছে। এখন এই শ্রেণিটিও যখন বিত্তের হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেলো, তখন সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে ভাববে কে? একদম কেউ নেই এমন ভাবা যাবে না। উঁচুতে উঠতে লম্ফ দেয়নি এমন মানুষ আছে। প্রাণ নিয়েই আছে। কিন্তু তাদের বাক প্রতিবন্ধি করে রাখা হয়েছে। বিত্ত তাদের দাস মনে করে। ফলে তারা যাই বলুক না কেন, সেই শব্দ উচ্চারিত বা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে না।তাই বলে ভাবলে চলবে না যে এমন বধির সময় টেকসই হবে। দীর্ঘজীবী হবে। কোনও কালে তা টেকসই হয়নি। এবারও হবে না। যে প্রতিধ্বনির শব্দ পাচ্ছি না আমরা। সেই শব্দই দেয়াল ভাঙবে। বিত্তের ইট সুরকিতে গড়া অনৈতিকতার দেয়াল ধসে পড়ার শব্দ শোনার অপেক্ষায় আছি আমরা। সেই পর্যন্ত আমাদের শিশুদের সুরক্ষা দেবে কে? আমি, আপনি পিতা-মাতা যদি হই সমাজের সব শিশুর তবেই এর একটি সমাধান আছে। আমরা এখনও নিজ সন্তানের পিতা বা মাতাই হতে পারছি না। সকলের হবো কেমন করে?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/

x