‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রবল’ বাংলাদেশ!

আহসান কবির ১৬:৩৪ , ফেব্রুয়ারি ১০ , ২০১৯

আহসান কবিরজেনারেল জিয়াউল হক যখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেই সময়কার একটা গল্প দিয়ে লেখাটা শুরু করা যায়। মন্ত্রী গেছেন গ্রামে। গ্রামে ঢোকার আগে মন্ত্রীর গাড়ির নিচে চাপা পড়ে একটা কুকুরছানা মারা গেলো। মন্ত্রী গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘যাও তাড়াতাড়ি কুকুরছানার মালিককে খুঁজে আনো।’ ড্রাইভার তাড়াহুড়ো করে ছুটে গেলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ফিরলো সদলবলে। তার সঙ্গে আনন্দ করছিল কয়েকজন লোক। ড্রাইভারের গলায় ছিল মালা আর হাতে মিষ্টির প্যাকেট। মন্ত্রী অবাক হয়ে জানতে চাইলেন-ঘটনা কী?
ড্রাইভার বললো, ‘আমিও জানি না স্যার। শুধু গ্রামে ঢুকে প্রথম যার সঙ্গে দেখা হলো তাকে বলেছিলাম আমি মন্ত্রীর গাড়ি চালাই। আমিই কুকুরছানাটি মেরে ফেলেছি! তারপর কী যে হলো বুঝলাম না স্যার। আনন্দে পুরো গ্রাম যেন ভেঙে পড়লো।’
গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে কুকুর মারা গেলে ইউরোপ আমেরিকায় অনেক হ্যাপা পোহাতে হয়,শাস্তি পেতে হয়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেলে এক-তৃতীয়াংশ ঘটনায় কারও কোনও সাজাই হয় না। কখনও কখনও বোনাস হিসেবে জুটতে পারে মন্ত্রীর হাসি! (যিনি হেসেছিলেন তিনি ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত মন্ত্রিসভায় তিনি নেই)।

বাংলাদেশ ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রবল’ দেশ! বিশ্বাস না হলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য নিয়ে যাচাই করে দেখতে পারেন। বাংলাদেশ যেমন মধ্যম আয়ের দেশ, ঠিক তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা প্রবল দেশ হয়ে উঠেছে আমাদের মিলিত গাফিলতিতে! দেশের প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে,অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি বেড়েছে রাজপথের বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু।

ঢাকার সড়ক পথ রাজনীতি প্রভাবিত এবং ক্ষমতাসীনদের বলয়ভুক্ত। সাধারণ মানুষকে নিদারুণ ভোগান্তিতে ফেলে,সড়কে জিম্মি করে রাখাটাই কী বাস শ্রমিক-মালিকদের আসল চেহারা,মূল চরিত্র? পুরনো লেখা থেকে রেফারেন্স তুলে ধরছি–

ঢাকার রাস্তায় এবং ঢাকাসহ সারাদেশে যেসব বাস মিনিবাস চলে তাদের মালিক কারা? এককথায় মন্ত্রী,সাংসদ,ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই এসব বাস, মিনিবাস বা পরিবহনের মালিক। জাতীয় পার্টি,বিএনপি,জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও জড়িয়ে আছেন এই ব্যবসায়। আসলে ক্ষমতা যাদের, বাস-মিনিবাসও তাদের। পাবলিক জিম্মি। ‘শিখর পরিবহন’ উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া বেগম। এই পরিবহনের মালিক মাহমুদ হোসেন এবং তার সাথে আছেন সাবেক জাতীয় পার্টি নেতা মাইজুদ্দিন। ঢাকা-মাদারীপুর রুটের ‘সার্বিক পরিবহন’এর মালিকানা সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের পরিবারের। ‘কনক পরিবহন'-এর মালিক শাজাহান খানের ভাই আজিজুর রহমান। ‘জাবালে নূর’ পরিবহনে বাস আছে শাজাহান খানের শ্যালক নান্নু মিঞার।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি ‘সঞ্চিতা’ পরিবহনের মালিক। রাঙ্গা সাহেবের মতো জাতীয় পার্টির আরেক নেতা সালাহউদ্দীন আহমেদ ‘এসএ’ পরিবহনের মালিক। বিএনপি নেতা জিএম সিরাজ ‘এসআর’ পরিবহনের মালিক। ‘খালেক এন্টারপ্রাইজ’র মালিক বিএনপি নেতা এসএ খালেক। বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের পরিবহন ব্যবসা রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাহিদা তারিকের পরিবহনের নাম ‘প্রজাপতি’ পরিবহন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের এসি বাস ‘জেড এন করপোরেশন’র মালিক শামীম ওসমান এমপি। পরিবহন ব্যবসা রয়েছে খলনায়ক ও সাবেক বিএনপি নেতা ডিপজলের (ডিপজল আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন সম্প্রতি)। জামায়াত নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড কার্যকর হওয়া মতিউর রহমান নিজামীর ছিল ‘আজমেরি’ পরিবহন। সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব এনায়েত সাহেবেরও পরিবহন ব্যবসা রয়েছে এবং তিনিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত তিনি এনা পরিবহনের মালিক। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়-‘সবই আমরা আর মামারা’। সুতরাং সড়কে আমার বাস দুর্ঘটনা ঘটালে দেখবেন মামারা আর মামাদের বাস কোনও দুর্ঘটনা ঘটালে দেখবো আমরা। পুরো ব্যাপারটা ‘পপিচুস’ অর্থাৎ পরস্পর পিঠ চুলকানো সমিতি!

শুধু মালিক ও শ্রমিকরাই (বাস মালিকরাই আবার শ্রমিক সংগঠনের নেতা) যে সড়ক বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী তেমনও নয়। সড়ক ও জনপথের সড়ক রয়েছে ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। শতকরা ১৭ ভাগ সড়কে কোনও না কোনও কাজ চলে, যার জন্য যানজট তৈরি হয়। আগে যাওয়ার তুমুল প্রতিযোগিতা চলে। শতকরা ৬২ শতাংশ রাস্তার কোনও সাইন-সংকেত নেই। যেগুলো আছে তার কিছু অংশ গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে! কেউ কেউ নিজের মনে করে এসব সাইন সংকেত খুলে নিয়ে যায়।

চালকদের প্রশিক্ষণ,লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের জন্য সড়ক পরিবহন সংস্থার লোকবল আছে মাত্র ৬৫৯ জন। এরা কোনও কিছুই সঠিকভাবে করতে পারেন না। কোনও কোনও জেলার অফিসে চালকদের লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ার জায়গা ও ব্যবস্থা নেই। আর তাই সারা দেশে যে ৩৮ লাখ যানবাহন আছে তার মধ্যে ১৮ লাখ চলে ভুয়া ড্রাইভার দিয়ে। এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের ভরসা ‘দালাল’রা, ভুয়া লাইসেন্সই ভরসা। এই ‘ভুয়াদের’ই প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলা হয়! এরাই বাসস্ট্যান্ড দখল করে রাখে। এরাই যাত্রীদের জিম্মি ও হেনস্তা করে। এদের উৎসাহ দিয়ে বলা হয় ‘রাস্তায় নামা গরু ছাগল চিনলেই’ যে কেউ চালক হতে পারবে। কোনও মামলায় কোনও চালকের সাজা হলেই এরা হরতাল অবরোধ করে, মানুষকে জিম্মি করে। পরিবহনের নেতা মন্ত্রীরা বলেন, বাসের চাকায় পিষে কেউ মরে গেলেও ড্রাইভারের তিন থেকে পাঁচ বছরের বেশি সাজা হওয়া ঠিক না। আবার এটাও ঠিক, এই শ্রমিকদের জন্য নেই বিশ্রামাগার, নিয়মিত বেতন। একটানা ছয় সাত ঘণ্টা গাড়ি চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ। বাস মিনিবাসের ড্রাইভারদের নিয়মিত তেমন বেতন থাকে না। যাত্রী তুলে ভাড়া নিয়ে তাদের বেতন আদায় করতে হয়। তাই রাস্তায় এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের তুমুল প্রতিযোগিতা চলে। এক বাস যখন যাত্রী তোলে তখন সে রাস্তার মাঝামাঝি আড়াআড়ি রাখে বাস। যেন পেছনের বাস যাত্রী তুলতে না পারে কিংবা আগে যেতে না পারে। সে কারণেই ঢাকার বাসগুলোর কোনোটারই ছাল চামড়া ঠিক থাকে না। প্রতিযোগিতার ঘষায় বাসগুলোর অবস্থা হয় করুণ, রাস্তায় ভর করে ট্রাফিক জ্যাম, মাঝখানে বা নিচে পড়ে মারা যায় সাধারণ মানুষ। অপ্রতুল রাস্তায় সাধারণ মানুষের জন্য ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ যতটা বেড়েছে তার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেড়েছে ব্যক্তিগত ও কিছু প্রতিষ্ঠানের ছোট গাড়ি বা কার। বাস, মিনিবাস, ট্রাক, টেম্পু, লেগুনা, কাভার্ডভ্যানের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে মোটরসাইকেল।

উবার, পাঠাও, সহজ এবং ওভাই এমন সার্ভিসের জন্য ছোট গাড়ি ও মোটরসাইকেল সবসময় রাস্তায়ই থাকে। এ কারণেও জ্যাম কমছে না, দুর্ঘটনাও বাড়ছে।

প্রতিবছর এমন বিশৃঙ্খলা আর রাস্তায় অশুভ প্রতিযোগিতার কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে গড়ে প্রায় পঁচিশ হাজারজনের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে এবং সড়ক দুর্ঘটনা খুব বেশিবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী চালকদের শাস্তি হয় না। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, সড়ক দুর্ঘটনার পর যত মামলা হয় তার শতকরা ৫৯ ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ দায়ী চালক, হেলপার ও ঘাতক বাসকে শনাক্ত করতে পারে না। যারা দুর্ঘটনার শিকার হয় সেসব পথচারী এবং দায়ী চালকরা আহত বা নিহত হলেও কেউ কোনও সরকারি চিকিৎসা সুবিধা পায় না। রাস্তায় যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হন তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার পান না, নিজের চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকলে পরিবারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রথমে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গুরুতর আহত এবং পরে মারা যাওয়া রাজিবের চিকিৎসা ভার ও ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। রাজীব নেই কিন্তু তার এতিম দুই ভাই কোনও সাহায্য পেয়েছে কিনা সন্দেহ আছে।

তাহলে সমাধান কী? গত বিশ বছর ধরে একই কথা শুনে আসছি। যেমন রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে, চার বা আট লেন হচ্ছে। ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও বৈধ লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাদের জন্য রেস্ট হাউজ এবং বিকল্প চালক রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যানবাহনের ফিটনেসের ব্যাপারে নজরদারি বাড়ছে। মামলা করে টাকা আদায়ের হার বাড়ছে। ইউলুপ কিংবা ফ্লাইওভার হচ্ছে। এক সময়ে সমাধান হবে এবং সবকিছু আয়ত্তে আসবে। কিন্তু এই ‘এক সময়টা’ গত বিশ বছরে আসেনি। উল্টো বাংলাদেশের মানুষ ভোগান্তি ও ধৈর্য পরীক্ষায় বিশ্বে এক নম্বরে স্থান পাবে। যখন মানুষ এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে চাচ্ছে তখন পরিবহন লাইনে ক্ষমতাসীনদের প্রতি নতজানু হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন, তাহলে উত্তর হচ্ছে– রুট পারমিট ও গেট পাস। ধরুন (উদাহরণ) ঢাকার গুলিস্থান থেকে মিরপুর রুটে পঞ্চাশটা বাস দরকার। ক্ষমতাসীনরা চাইলে এই রুটে সত্তর আশিটা বাস ঢুকবে। না চাইলে অন্য কারো বাস রুট পারমিশন পাবে না। তাই কোনও কোনও রুটে আছে উপচে পড়া বাস আবার কোনও কোনও রুটে যত বাস দরকার সেটা নেই। সবচেয়ে বড় নিয়ামক গেট পাস। ধরুন, ক্ষমতাসীন নেতা মন্ত্রী এমপির কেউ এক দুটো বাস কিনে একটা পরিবহন খুললেন। রুট পারমিট পাওয়ার পরে তখন সেই পরিবহনে আরও কিছু বাস মালিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর প্রতিদিন এসব বাসপ্রতি তিন থেকে পাঁচশত টাকা তোলা হয়। শ্রমিক বা মালিক কল্যাণের নামেও টাকা ওঠানো হয়। এসব বৈধ করার জন্য একবার সংসদীয় কমিটির মিটিংয়েও ব্যাপারটা তোলা হয়েছিল। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার বাস্তবতা তাই কখনও আসে না। সড়কের অবস্থা থাকে-‘ওলটপালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’! বাসের পেছনে বা গায়ে লেখা থাকে-‘পরিবহন লাইনে সুখ নাইরে পাগল’!

কী আর করা? ভারত ও পাকিস্তানে প্রচলিত একটা রেওয়াজ উল্লেখ করে শেষ করি। পাকিস্তানের জনসংখ্যা তুলনামূলক কম কিন্তু জ্যাম ও সড়ক দুর্ঘটনা বেশি। পাকিস্তান পুলিশের এক সদস্যকে জিজ্ঞাসা করা হলো সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? পুলিশ সদস্যের উত্তর- ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও সেনাবাহিনীর লোকেরা বেশি নিয়ম ভঙ্গ করে। আমরা তাদের পথ আটকাই। পরিচয় জানার পর স্যালুট দিয়ে ছেড়ে দেই। বারবার বলি- সরি স্যার, সরি স্যার।

জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও ভারত সড়কে শৃঙ্খলা অনেকটা ফিরিয়ে এনেছে। কীভাবে সম্ভব? এই প্রশ্ন এক ট্রাফিককে করার পর তার উত্তর ছিল-রাজনীতিবিদ হোক আর পুলিশ আর্মি হোক, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে আমরা তাদের পথ আটকাই, মামলা দিয়ে জরিমানা আদায় করতে ছাড়ি না। ওনারা বারবার ‘সরি’ বলেন কিন্তু আমরা সব ‘সরি’কে সম্মান জানাই না!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

x