খালেদা জিয়া আর কতদিন জেলে থাকবেন

আনিস আলমগীর ১৪:১২ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৯

আনিস আলমগীরখালেদা জিয়ার জেল মুক্তির দাবি নিয়ে ইউটিউবে একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছে। কয়েক লাখ বার দেখেছে লোকজন। ‘দে দে জেল ভেঙে দে/তোরা দেরি করিস না/জেলের ভেতর মাকে আর থাকতে দেবো না।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ঠাট্টা করে বলছে এটা নাকি খালেদা জিয়ার জেল মুক্তির দাবির থিম সং। ভিডিওতে দেখা যায়, জনসভায় এই গানের তালে তালে দলের সমর্থক মহিলা-পুরুষ একসঙ্গে নাচছেনও। পৃথিবীর কোনও দেশে নেতানেত্রীর জেল মুক্তির দাবি নিয়ে এমন নাচ গান চলে কিনা আমার জানা নেই। অতীতেও দেখিনি।
গানের কথাগুলো খেয়াল করেন, ‘দে দে জেল  ভেঙে দে, তোরা দেরি করিস না।’ জেলটা ভাঙবে কে? বিএনপি কি অপেক্ষা করছে তাদের হয়ে কেউ জেলের তালা ভেঙে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে দিবে? কার গরজ পড়েছে- যাদের ছাড়া বিএনপির চলে না সেই জামায়াত-শিবিরের? জামায়াতের বড় নেতারা ফাঁসিতে ঝুলার পর জামায়াত-শিবিবের জেলের তালা ভেঙে যে বড় লাভ নেই- সেটা তো তারা জানে। বিএনপিও ভালো করেই জানে। জামায়াত নিজেদের জন্য রাজনীতি করে, বিএনপি তাদের সিঁড়ি মাত্র।
আর গত ১২ বছর খালেদা জিয়া আর তারেক জিয়ার ইস্যু ছাড়া বিএনপি জনগণের কোনও ইস্যুতে রাস্তায় নেমেছে কিনা কেউ দেখেনি। এবারের সংসদ নির্বাচনের আগে আগে কয়েক হাজার নিরীহ বিএনপি সমর্থককেও জেলে নেওয়া হয়েছে। বিএনপি তাদের মুক্তির জন্য, আইনি সহায়তার জন্য কিছু করেছে বলে শুনিনি। যারা জনগণের জন্য রাস্তায় নামে না, সমর্থকদের কোনও কাজে আসে না, তাদের দলের নেত্রীর জন্য জনগণ রাস্তায় নেমে মুক্তির আন্দোলনে শরিক হবে- বিএনপি যদি এমন স্বপ্ন দেখে থাকে করার কিছু নেই।

যেমন আন্দোলন তেমন ফল। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। বিএনপি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ওইদিন একটা প্রতিবাদ সভা করেছে। বক্তারা বলেছেন, আইনের সাহায্যে, আদালতের মাধ্যমে বেগম জিয়াকে জেল থেকে বের করা সম্ভব হবে না। অনেক বক্তা বলেছেন, এখন হরতাল-অবরোধের আশ্রয় নিতে হবে। অনেকে বলেছেন, হরতাল/অবরোধের ব্যাপারে বেগম জিয়ার নিষেধ আছে। অনেকে বলেছেন, এখন সে নিষেধাজ্ঞা আর মানা যাবে না।  

বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের বিচারকাজ বিচারিক আদালতে শেষ হয়েছে। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম জিয়ার শাস্তি হয়েছিল ৫ বছর আর অন্য আসামিদের শাস্তি হয়েছিল ১০ বছর করে। দুদক হাইকোর্টে এ নিয়ে আপিল করেছিলো। তার রায়ও হাইকোর্ট প্রদান করেছেন। হাইকোর্টের অভিমত হলো, চার্জশিটের প্রধান আসামিকে কম শাস্তি দিয়ে সহযোগী আসামিদের বেশি শাস্তি দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। সুতরাং হাইকোর্ট বেগম জিয়ার সাজাও ১০ বছর করে দিয়েছেন। 

চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় খালেদা জিয়ার শাস্তি হয়েছে ৭ বছর। এখন বেগম জিয়ার দুই মামলায় মোট শাস্তি হলো ১৭ বছর। খালেদা জিয়ার দল তার মুক্তি আন্দোলন সূচনাই করতে পারেনি। পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আবার তার দলীয় উকিলেরাও তার মামলা পরিচালনার ব্যাপারে অমনোযোগী। মাঝে মাঝে উকিল সাহেবরা আইনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় বলে নিজেদের ব্যর্থতা, অমনোযোগিতা ঢাকার চেষ্টা করেন। একই আসামি ভিন্ন ভিন্ন মামলায় ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে আদালতে দণ্ডিত হলে শেষ মামলায় আসামির উকিলকে সিআরপিসি ৪৭৮ ধারায় কোর্টকে বলতে হয় আসামির জেল যেন যুগপৎভাবে চলার ব্যবস্থা করার আদেশ হয়। 

আমি যতদূর জানি, বেগম খালেদা জিয়ার উকিল সাহেবেরা অনুরূপ কোনও আবেদন করেননি। এখন বেগম জিয়ার জেলের মেয়াদ ১০ বছর শেষ হলে দ্বিতীয় মামলার ৭ বছর কারাদণ্ড আরম্ভ হবে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, মিসফরচুন নেভার কামস এলোন। দুর্ভাগ্য কখনো একা আসে না। যাহোক, এখন বেগম খালেদা জিয়ার কিছু মামলা হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত আছে। কিছু মামলার তদন্ত চলছে। আবার কিছু মামলার বিচারিক আদালতে বিচার চলছে। 

কুমিল্লার মামলায় বেগম জিয়ার জামিন হয়নি। এ মামলায় খালেদা জিয়া হুকুমের আসামি। চৌদ্দগ্রামে চট্টগ্রাম থেকে আগত ঢাকাগামী নাইট কোচে বিএনপি/জামায়াত কর্মীরা পেট্রোলবোমা মেরেছিলো। ঘটনাস্থলেই আটজন যাত্রী নিহত হয়েছিলো। আর অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলো অনেকে। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর যে মামলায় ফাঁসি হয়েছিলো সে মামলায়ও তিনি ছিলেন হুকুমের আসামি। 

ভুট্টোর সঙ্গে দ্বিমত করে পিপিপি ছেড়েছিলেন আহমেদ রাজা কাসুরী। রাজা কাসুরীকে নাকি হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন ভুট্টো। কিন্তু আততায়ীরা যখন তাকে লক্ষ করে গাড়িতে গুলি করে তখন রাজা কাসুরীর পরিবর্তে পাশে থাকা তার বাবা নবার আহমেদ কাসুরীর গায়ে গুলি লাগলে তিনি নিহত হন। এই হত্যা মামলায় ভুট্টো হুকুমের আসামি ছিলেন। এটাকেই পুনরুজ্জীবিত করেছিল সামরিক বাহিনী। খালেদা জিয়াও হুকুমের আসামি এ কথা প্রমাণ করতে পারলে দণ্ড এড়ানো কঠিন। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বেগম খালেদা জিয়া তো যেকোনও উপায়ে দেশ স্তব্ধ করে দেওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন তার কর্মীদের।
খালেদার এ দুর্যোগের অবসান হবে কি? বেগম জিয়া দশ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। তিনি দশ বছর রাষ্ট্র চালিয়েছেন পঞ্চায়েত চালানোর মতো করে। বৃহৎ দুটি দেশের পাশে বাংলাদেশের অবস্থান। সুতরাং বাংলাদেশকে চলতে হবে খুবই সতর্কতার সঙ্গে। পাশের চীন-ভারত উভয় শক্তিধর রাষ্ট্র। চীন আগামী এক দশকের মাঝে বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার হবে আর ভারত সুপার পাওয়ার হতে না পারলেও প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক বড় শক্তিধর রাষ্ট্র হবে। আসামের বিদ্রোহী উলফাকে পাকিস্তানের আইএসআই’র মন্ত্রণা শুনে অস্ত্র সরবরাহ করতে যাওয়া কি বেগম জিয়ার সরকারের বিজ্ঞজনোচিত কাজ হয়েছিলো? বেগম জিয়া আবার নিজেই বলেছিলেন উলফারা তো স্বাধীনতা সংগ্রামী। রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসে পঞ্চায়েত চালানোর মতো করে রাষ্ট্র চালালে খেসারত তো দিতেই হবে। 

ভুট্টো যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখন ঘোষণা করলেন যে পাকিস্তান ঘাস খেয়ে হলেও বোমা বানাবে। আমেরিকার তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। নিক্সন ভুট্টোকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে বোমা বানানোর উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিলেন। ভুট্টো লাহোরের মোচি গেটে এক জনসভায় নিক্সনের চিঠি পাঠ করে মানুষকে শুনালেন আর চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে নিক্সনকে বলেছিলেন, আমি আপনার কথা শুনবো না। আমি বোমা বানাবই। ভুট্টো এ কাজটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষা করে গোপনে চিঠি লিখে নিক্সনকে জানাতে পারতেন। ওই রাতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার ভুট্টোকে ফোন করে বলেছিলেন, আপনি শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজের প্রতিশোধের আপেক্ষায় থাকেন। সিআইএ’র হত্যার খাতায় ভুট্টোর নাম উঠলো। আর ১৯৭৯ সালে হত্যার হুকুমের আসামি হওয়ার অজুহাতে তার ফাঁসি হলো। কিসিঞ্জার ১৭টি বই লিখেছেন, তা মনোযোগ সহকারে পড়লে সবই বুঝা যায়। 

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরের সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি ছিলো। তিনি জামায়াতে ইসলামীর হরতালের অজুহাতে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন। এটা ছিলো চরম কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ। আমাদের মিডিয়ায় এসেছে, একবার বেগম জিয়ার সঙ্গে ভারতীয় কিছু কর্মকর্তার লন্ডনে বৈঠক হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। দিল্লি থেকে এক কর্মকর্তা নাকি লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন আর এক কর্মকর্তা নাকি প্লেনে ছিলন। বৈঠকের আগে লন্ডনে থাকা কর্মকর্তা শর্ত দিয়েছিলেন বৈঠকে তারেক রহমান থাকতে পারবেন না। এ কথা শুনে বেগম জিয়া আর তারেক রহমান নাকি বৈঠক বাতিল করে দিয়েছিলেন। এটা ভারতের মতো একটা বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে খামখেয়ালি আচরণ।

চীনারা তাদের ‘এক চীন’ নীতিতে যে রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখে না। এমনকি চীনের সঙ্গে যখন আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় তখন আমেরিকা তাইওয়ানের সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে দিয়েছিলো। বেগম জিয়া যখন ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তখন তারেক জিয়া এবং বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাইওয়ানের কাছ থেকে ‘টাকা নিয়ে’ তাইওয়ানকে ঢাকায় তাদের বাণিজ্য মিশন খোলার অনুমতি দিয়েছিলেন। চীনের হুমকিতে ঢাকায় তাইওয়ানের বাণিজ্যিক মিশন বন্ধ হলেও তারেক ও আমীর খসরু সম্পর্কে চীনের ধারণা সম্পূর্ণ খারাপ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আমীর খসরু মাহমুদকে বাণিজ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। 

কূটনৈতিক চ্যানেলে বিএনপির তৎপরতা অন্য যেকোনও দলের চেয়ে বেশি। অনেক কূটনীতিক, বিশেষ করে ভারতের প্রধান শর্ত হলো তারেক রহমানকে কোনও পদ পদবীতে রাখা যাবে না। আবার চীনও গভীরভাবে তারেকের ওপর অসন্তুষ্ট। 

পার্শ্ববর্তী দুটি বৃহৎ দেশ যদি দলীয় অস্থায়ী প্রধানের ওপর অসন্তুষ্ট থাকে তবে দলটির চলার পথ সহজ হওয়ার কথা নয়। বিএনপির অবস্থা হয়েছেও তা-ই। আমাদের দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়েও চীন ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কাজ করে। পশ্চিমা বিশ্বের কোনও দেশ ভারতকে ডিঙিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনও কথা বলতে চায় না। অনেকে হয়তো এ কথাটা স্বীকার করবে না কিন্তু বাস্তবতা হলো এটাই।

সুতরাং বিএনপি এখন যদি বাস্তবসম্মত পথে অগ্রসর না হয় তবে তাদের অবস্থা আরও খারাপ ভিন্ন ভালো হবে না। তাদের ছয় এমপি শপথগ্রহণ করে সংসদে যোগদান করে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা দরকার এবং বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম জিয়াকে তার দলকে এ পরামর্শ দেওয়ার কথা বলবো। ধীরে ধৈর্য নিয়ে চললে ডিভিডেন্ড পাওয়া যায়। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড প্রত্যাশী। ছয়জন নির্বাচিত সাংসদ সংসদে যোগদান করলে এবং প্রতিদিনের সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে চূড়ান্ত পর্যায়ে বিএনপি একটা ডিভিডেন্ড প্রত্যাশা করতে পারে। তাদের পদত্যাগে কিছু আসবে যাবে না। বাংলাদেশ কখনও ভেনেজুয়েলা হবে না যে এখানে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর জন্য এক পরাশক্তি আর বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুয়াদোর জন্য আরেক পরাশক্তি মাঠে নামবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

anisalamgir@gmail.com

 

/এমওএফ/

x