কেমন হচ্ছে আমাদের বই মেলা!

রেজানুর রহমান ১৫:১১ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৯

রেজানুর রহমানঅনেকটা স্বপ্নের মতো মনে হয়। হ্যাঁ, স্বপ্নই তো! বাংলা একাডেমির আঙিনায় নরম ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে একসময় ছোট্ট যে বই মেলা শুরু হয়েছিল আজ সেই বই মেলা আকারে আয়তনে, বিষয় বৈচিত্র্যে  এতটাই বড় হয়েছে যে বিষয়টা মাঝে মাঝেই স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিন্তু এটাই বাস্তব। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা একদা বাংলা একাডেমির মাঠে নরম ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে যে বই মেলা শুরু করেছিলেন সেই মেলা এখন বাংলা একাডেমির বিশাল আঙিনার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকাজুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, শুধু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে যখন বই মেলাটি অনুষ্ঠিত হতো তখন ২০/২৫ মিনিট চক্কর দিলেই মেলা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যেত। আর এখনকার বই মেলার পুরোটা দেখতে গেলে একদিনে হয়তো সময়ে কুলাবে না অথবা অনেকের ধৈর্যও শেষ পর্যন্ত থাকবে না। মেলার বাংলা একাডেমি অংশে ঘুরতে তেমন সময় লাগবে না। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী অংশে ঢুকলেই সবাই অবাক হবেন। এই মেলা একদিন ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল? এবার বই মেলার স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজানো এতটাই আধুনিক হয়েছে যে ক্রেতা-দর্শকেরা মেলায় ঢুকেই প্রথমে অবাক হচ্ছেন। অবাক হওয়ার কারণ হলো, অনেকেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না এটা আমাদের সেই বই মেলা! কত পরিবর্তন। যেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি স্বপ্নময় বাক্যের মতো... মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়।

হ্যাঁ, মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। তবে সে জন্য মানুষকে লেগে থাকতে হয়। ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হয়। একটি ভবন গড়তে নকশা লাগে। ওই নকশাটাই হলো আসলে পরিকল্পনা। এই যে বাংলা একাডেমির বই মেলা আজকে এতো বড় হলো, তার জন্য নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অবদানের কথা স্বীকার করতেই হবে। মূলত তাঁর প্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব ভাবনারই ফসল আজকের বই মেলার এতো বিস্তৃতি।

শামসুজ্জামান খানই মূলত একুশে বইমেলার চেহারাটা পাল্টে দেন। তবে শুরুর দিকে তাঁর ভাবনার সাথে সবাই যে একমত হয়েছিলেন তা কিন্তু নয়। বাংলা একাডেমির আঙিনার বাইরে বই মেলা সম্প্রসারণের উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর অনেকেই বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। বলার চেষ্টা করা হয়েছিল বাংলা একাডেমির আঙিনার বাইরে একুশে বই মেলা সম্প্রসারণ করা ঠিক হবে না। এতে একুশে বই মেলা তার ঐতিহ্য হারাবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেয়েছিলেন শামসুজ্জামান খান। সবচেয়ে বড় কথা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই একুশে বই মেলাকে একাডেমির বাইরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করার কঠিন কাজটি অনেক সহজ হয়েছে। 

বাঙালির আত্মপরিচয়ের ক্যানভাসের দিকে চোখ ফেললেই ১৯৫২ এবং ১৯৭১ সালটাই বেশি করে ভেসে ওঠে। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে দেশে যে গণআন্দোলনের সূত্রপাত হয় পরবর্তীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপসহীন নেতৃত্বে ওই আন্দোলনই স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। শুরু হয় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আনন্দের ব্যাপার হলো, এবারের বই মেলায় একটা থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘৫২ থেকে ৭১’। বাংলা একাডেমির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী স্বয়ং বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও চরম আবেগের এই দুটি সময়কে এবার বই মেলায় থিম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক্ষেত্রে সুন্দর ও মায়াময় একটি ব্যাখ্যাও দিলেন তিনি। বললেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ৫২ কি ৭১ কি সেটা জানে না। ৫২-এর কথা বললে অনেকে হা করে চেয়ে থাকে। ৭১ সম্পর্কে অনেকে গুছিয়ে দু-চার লাইন বলতেও পারে না। এজন্য কি ওরা দায়ী? নিশ্চয়ই না। আমরা বড়রাই এজন্য দায়ী। কারণ, আমরা ওদের সামনে সঠিকভাবে দেশের ইতিহাস তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। তাই বলে সময় কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। ভালো কাজ যেকোনও সময় থেকেই শুরু করা যায়। আমরা ভেবে দেখলাম বই মেলায় বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসে। তাদের সামনে ১৯৫২ এবং ১৯৭১ সালকে তুলে ধরলে কেমন হয়? নিশ্চয়ই ছেলেমেয়েরা এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবে। প্রশ্ন তুললেই উত্তরও পাবে। বই মেলা দেখতে দেখতে দেশের ইতিহাসও জানা হয়ে যাবে।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর এই ভাবনাটিকে শ্রদ্ধা জানাতেই হয়। ৫২ থেকে ৭১ এই বিষয়টা মেলার সর্বত্রই বিশেষভাবে প্রদর্শন যোগ্য করে রাখা আছে। একদিন দেখলাম একটি ছোট্ট শিশু ৫২ আর ৭১ দুটি অংক সংখ্যা দেখে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো, মা ওরা ৫২ আর ৭১ লিখে রেখেছে কেন? মা মৃদু হেসে পরম মমতায় ছেলেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা বলতে লাগলেন। ছেলেটি মনোযোগ দিয়ে মায়ের কথা শুনছিলো! দৃশ্যটি দেখে আনন্দে সত্যি সত্যি মন ভরে গেল। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ বাংলা একাডেমির গোটা পরিবারকে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন একুশে বই মেলার এতো প্রশংসা করছি। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় একটি কথা আছে। ট্যাকায় করে কাম। মিছায় মদ্দের নাম। প্রমিত বাংলায় যার অর্থ হলো- টাকাই কাজ করে, শুধু শুধু মানুষের নাম হয়। অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন একাডেমির টাকা আছে। টাকা থাকলে তো এমন কত কিছুই করা যায়। তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি না। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, টাকা থাকলেই কি সবাই সবকিছু করতে পারে। ভালো কাজের জন্য টাকার পাশাপাশি ভালো মানসিকতাও প্রয়োজন। বোধকরি এবারের বই মেলায় ভালো মানসিকতাই অতীতের মতোই জোরেশোরে কাজ করেছে। প্রখ্যাত স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরসহ অনেক গুণী স্থপতি এবার বই মেলার কাঠামোগত বিন্যাস অর্থাৎ বই মেলার নকশা প্রণয়ন করেছেন। তাদের নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা তাদের স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছেন অনেকটা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে। আর তাই এবারে বই মেলায় বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার স্টল ও প্যাভিলিয়ন ক্রেতা-দর্শকের অনেক বেশি পছন্দ হয়েছে। তারা সবচেয়ে বেশি খুশি বই মেলার খোলামেলা পরিবেশ নিয়ে। মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকলেই পরিবেশ দেখে মন ভরে যাবে সবার। মেলার বিভিন্ন জায়গায় বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। ঘুরতে ঘুরতে আপনি যখন ক্লান্ত হয়ে যাবেন তখন অনায়াসেই বসার এই আসনগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। শিশু-কিশোরদের জন্য এবারও রয়েছে শিশুকর্নার নামে বিশেষভাবে নির্ধারণ করা এলাকা। এখানে সিসিমপুরের সৌজন্যে শিশুদের জন্য আনন্দ করার জায়গাও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আপনি যখন আপনার বাচ্চা ছেলেমেয়েকে বই মেলায় নিয়ে আসবেন তখন তাদের সুন্দর পরিবেশে খেলার জায়গা দেখিয়ে দিতে পারবেন। শিশুরা খেলবে তারপর বই কিনবে, এর চেয়ে মজার জায়গা আর কি হতে পারে? বই মেলায় লেখক কর্নার নামে প্রতি বছরই একটি বিশেষ স্থান বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু সেই স্থানটির প্রতি তেমনভাবে কারও কোনো নজরদারি থাকে না। এবারের বই মেলায় লেখক কর্নারকেও নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ‘লেখক বলছি’ নামের এই বিশেষ আয়োজনে প্রতিদিনই পাঁচজন করে নবীন-প্রবীণ কবি, লেখক তাদের প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে হাজির হচ্ছেন। পাঠকের মুখোমুখি কথা বলছেন। অনুষ্ঠানটি প্রতিদিন বিকেল ৫টায় শুরু হয়। মেলার এই নতুন অনুষ্ঠানটি বেশ সাড়া ফেলেছে।

নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান একুশে বই মেলায় একটি বিশেষ আকর্ষণীয় দিক। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে প্রতিদিনই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাগম ঘটছে। নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানটিও এবার ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

বাংলা একাডেমিতে বই মেলার মূলমঞ্চে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা চলছে প্রতিদিনই। বিকেলে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে। চলাচলে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য মেলায় হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিয়োজিত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন ২৪ ঘণ্টা পালা করে মেলা প্রাঙ্গণে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন বিকেল ৩টা বাজার আগে বই মেলায় ঢোকার জন্য শত শত মানুষ ভিড় করছেন। আসছেন লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকরাও। আসছেন দেশের সকল প্রচার মাধ্যমের প্রতিনিধিরাও। কিসের টানে? শুধু কি বই মেলার? ঠিক তা নয়। সকলে আসছেন প্রাণের টানে! একুশে বই মেলা বাঙালির ঐতিহ্য ও অর্জনের এক সাহসী ঠিকানা। এই বই মেলায় প্রিয়জনের সাথে দেখা হয়। বন্ধুর ঠিকানা মেলে। কতদিন দেখি না তোমায় অন্তর ছোঁয়া এই কথা বলে অনেকেই তার প্রিয় বন্ধু, স্বজনকে জড়িয়ে ধরেন। আর তাই একুশে বই মেলায় এলেই দেশজুড়ে শিল্প সাহিত্য অঙ্গনসহ পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটা জাগরণ দেখা দেয়।

বই মেলায় এবার নানা ক্ষেত্রে জাগরণের গতিটা বেশ জোরালো। ইতোমধ্যেই বই মেলা জমে উঠেছে। বইমেলায় বেচা-বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকাশকদের সন্তুষ্টির কথাও শোনা যাচ্ছে। সবই আশাব্যঞ্জক সংবাদ। কিন্তু বইয়ের মেলায় সবার নজরে আসছে কি ভালো বই? অবশ্য ভালো বইয়ের সংজ্ঞা নিয়ে মতভেদ আছে। কোনটাকে আমরা ভালো বই বলবো? আকর্ষণীয় প্রচ্ছদে ছাপা সুন্দর বই কি ভালো বই? তথ্যপ্রযুক্তির উন্মেষ ভাবনায় প্রতিটি বইয়ের কাভার এখন বেশ জৌলুস পাচ্ছে। কাভার দেখলেই মন চায় বইটা কিনে ফেলি। কিন্তু বাইরের সৌন্দর্যই কি সব? ভেতরের গুণটাই তো আসল। কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে কে তার গুণ বিচার করবে, পাঠকই তো নাকি? কিন্তু আমরা পাঠকেরা কতখানি সচেতন? এমনও হয় বই মেলায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে বই কেনার ঝামেলায় না গিয়ে পরিচিত অথবা জনপ্রিয় ধারার কবি লেখকদের বইয়ের খোঁজ করতে থাকেন অনেকে। এর ফলে নতুন প্রতিভাবান কোনো কবি লেখকের বই তার নজরে আসে না। গত বছরও যার লেখা বই কিনেছেন এ বছরও তার লেখা বই কিনতে আগ্রহী থাকেন অনেকে। কিন্তু এর ফলে তো নতুন করে লেখক সৃষ্টি হবে না। আর নতুন করে যদি কবি লেখক সৃষ্টিই না হয় তাহলে আমাদের এতো বড় বই মেলার অর্জনটাইবা কি?

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবেন তাহলে বই মেলা থেকে ভালো বই খুঁজে নেয়ার উপায় কি? উত্তরটা সহজ নয়। আবার কঠিনও নয়। আপনি যদি সচেতন পাঠক হন তাহলে আপনার উচিত শুধু বই মেলা নয়, বছরজুড়ে আমাদের সাহিত্যের গতি-প্রকৃতির দিকে নজর দেওয়া। তাহলেই আপনি বুঝে নিতে পারবেন নতুন কে বা কারা ভালো লিখছেন। কার বই কেনা উচিত।

লেখাটি শেষ করি। তার আগে একটি অনুরোধ করতে চাই। এই যে আপনি প্রায় প্রতিদিনই বই মেলায় যাচ্ছেন কয়টা বই কিনেছেন? ভেবে দেখেছেন কি আমরা যারা বই মেলায় যাই তারা যদি প্রত্যেকে একটা করেও ভালো বই কিনি তাহলে পরিবেশটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ভালো বই কিনুন। প্রিয়জনকে ভালো বই উপহার দিন। বই, একমাত্র বই-ই কিন্তু মানুষের অনেক ভালো বন্ধু! 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো।

/এমওএফ/

x