আগের রাতে ভর্তি!

আহসান কবির ১৭:২০ , মার্চ ১১ , ২০১৯

আহসান কবির‘আগের রাত’ শব্দটা মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কখন যে কী হয়ে যায়!
ধরুন আগামীকাল একুশে ফেব্রুয়ারি। সালটা ১৯৫২। আগের রাতে কী উত্তেজনা তখন ছাত্র যুবকদের মাঝে। কারফিউ দেওয়া হয়েছে। দশজনের বেশি রাস্তায় বের হলেই আইনের আওতায় শাস্তি হয়ে যাবে। ঘুম নেই চোখে,কী এক প্রেরণায় জেগে থাকলো মানুষ,জেগে উঠলো মানুষ। একুশ ফেব্রুয়ারি দশজন দশজন করে বের হওয়া। হাত ধরাধরি করা হাত উঠলো আকাশপানে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। তারপর পুলিশের গুলি। রফিক,শফিক,জব্বার আরও নাম না জানা কত মানুষের আত্মাহুতি। এরপর ইতিহাস। এরপর- ‘কাঁদতে আসিনি,ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। এরপর স্বাধিকার আন্দোলন,ছয় দফার আন্দোলন, সবশেষে স্বাধীনতার লড়াই,সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা। সবই আগের রাতের মাজেজার ধারাবাহিকতা। আসার মতো ‘আগের রাত’ আসলেই হলো। যদি থাকে নসিবে,আগের রাত এমনি এমনি আসিবে।

নসিবে ভালো অনেক জিনিসও থাকে। যেমন, একুশে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে অনেকে নেমে পড়েন ফুলের সন্ধানে। অনেকেই এখন হয়তো ফুল কেনেন,আগে বিভিন্নজনের ফুলের বাগান থেকে সংগ্রহ করা হতো ফুল। এই ফুল নিতে গিয়ে গালমন্দ কিংবা চড়-থাপ্পড় খাওয়ার গল্পও রয়েছে। তারপরও এই ফুল নিয়ে শহীদ মিনারে যাওয়ার মতো স্বর্গীয় দৃশ্য খুব কমই দেখা যায় এক জীবনে। জানি না ‘নিতান্তই আনুষ্ঠানিকতা’ এই ফুল দেওয়ার আনন্দকে ম্লান করে দেয় কিনা!

কিংবা ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর আগের রাতটা কল্পনা করুন। হয়তো কেউ কেউ আগের রাতে ভালো ছিলেন,ঘুমিয়ে ছিলেন। পরদিন ভোরে শব্দ শুনে জেগে উঠলেন। দেখলেন বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দেশ স্বাধীন হলো তবুও সেই বাবা আর ফিরলেন না। গলিত লাশ পাওয়া গেলো বধ্যভূমিতে। হায় ১৩ ডিসেম্বরটাই হয়ে গেলো বাবার সঙ্গে শেষ সুখস্মৃতির গল্পের দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের ঘটনা এমনই।

অথবা ধরুন ২৬ মার্চ। সালটা ১৯৭১। আগের রাত ২৫ মার্চ। ঘুমিয়ে থাকা মুক্তিপাগল স্বাধীনতাকামী মানুষদের ওপর হামলে পড়েছিল পাকিস্তানি হায়েনারা। ট্যাংক কামান আর আধুনিক অস্ত্রের ঝনঝনানিতে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়, সারা পূর্ব বাংলা হয়ে যায় মৃত্যুপুরী। আগের রাতের এই গণহত্যার কারণেই অনেকে চলে যান যুদ্ধে,যার শেষ হয় পাকিস্তানিদের লজ্জাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ২৫ মার্চ বাংলার মানুষের জন্য ছিল কালরাত আর পাকিস্তানের জন্য ছিল ‘নৃশংসতায় ভরা ভয়ঙ্কর এক ভুল রাত’! যে ভুলের মাশুল দিতে চলে যাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী,পাকিস্তানিরা তেমন ভুলই করেছিল।

ভুল হতে পারে পরীক্ষার আগের দিন বা রাতে,এমনকি পরীক্ষার হলেও। ওইদিনই ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারটা চেঞ্জ করা জরুরি হয়ে পড়তে পারে। গার্লফ্রেন্ডের অসুখ হলো কিনা সেটা কয়েকবার মোবাইল করে জানতে হতে পারে। পড়ার ভেতরে ডুবে যাওয়ার পর মনে হতে পারে আর মাত্র একটা বা দুইটা দিন পাইলে ফাটাইয়া ফেলতাম! কেউ কেউ বলে ফেলতে পারেন পরীক্ষার আগের রাতে ডিম খাওয়ার দরকার নেই। পরদিন গোল্লা পেতে পারো। কারও চিন্তা জাগতে পারে পৃথিবী থেকে পরীক্ষা পদ্ধতি উঠিয়ে দিলে কেমন হয়? পরীক্ষার আগের রাতে কারও কারও মনে হতে পারে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কারও মেধা যাচাই করা ঠিক না।

ঠিক তেমনি বিয়ের আগের রাত নিয়ে উল্টাপাল্টা বলা ঠিক না। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ের আগের রাতটা নিয়েও আলোচনা আছে। এই রাতের আধুনিক নাম ব্যাচেলর নাইট। ব্যাচেলর পার্টিতে অনেকেই অংশ নিতে পছন্দ করেন। এদিন চাইলে ইচ্ছেমতো খানাপিনা করতে পারবেন,পুরনো প্রেমিকা বা প্রেমিকের সাথে ‘শেষ’বারের মতো কথাও বলতে পারবেন। আগের রাত নাকি স্বাধীনতার শেষরাত,পরদিন থেকেই ‘শৃঙ্খলে বন্দি’ জীবন। রাস্তার ট্রাফিক সাইনের মতো বউ-ই বলে দেবে কোন পথে যাবেন,কোন পথে যেতেই পারবেন না। বামে যাবেন নাকি ডানে যাবেন সেটাও নিয়ন্ত্রণ করবেন পরদিন থেকে স্ত্রী। ইস আগের রাত যদি চিরস্থায়ী হতো।

এখন অবশ্য ব্যাচেলর নাইটটাও অনেকে করতে পারেন না। কারণ, আগের রাতে পর দিনের পরিকল্পনা,কেনাকাটা কী হয়েছে,সাজুগুজু কেমন হবে,কারা কারা কী কী পোশাক পরে আসবে,খাওয়া-দাওয়ার প্রস্তুতি কেমন, সেলিব্রেটি কে কে আসছেন,ডিজে পার্টিতে কে বা কারা আসছেন এই সবের সঙ্গে এখন রাতভর এমন টেলিফোন আলাপও চলে–

-(মেয়ে) আগেও দুবার রিং দিয়েছি। ধরলেন না কেন? কল ওয়েটিং ছিল। এখনই এই অবস্থা? বিয়ের পর তো আমার নম্বর ব্লকই করে দেবেন! আগের গার্লফ্রেন্ড কী খুব সেন্টু খেয়েছে আপনার ওপর?

- (ছেলে) আপনি করে বলছো কেন? দুজনই তুমি তুমি করে বলি?

-প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলেন কেন? আর আমার কী মাথা নষ্ট? আমার ছোট চাচার দূরসম্পর্কের বন্ধু, যে কিনা আমার চেয়ে আট বছরের বড়, আমি তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি, তুমি করে বলতে পারবো না। শোনেন, মোটা ফ্রেমের বোকা চশমা পরা বাদ দেন। নরম বালিশ ছাড়া ঘুমাই না। আপনার বুকের ওপর নরম বালিশ রেখে ঘুমাবো। বুঝতে পারছেন?

-জ্বি। আর কিছু?

-হ্যাঁ। কাল বিয়ের শেষে গাড়ি থেকে নামিয়ে বাংলা সিনেমার নায়িকার মতো আমাকে দুই হাতে তুলে ঘরে নিতে হবে।

-জ্বি ,জ্বি। তোমার ওয়েট?

-কমই আছে। ডায়েট চকোলেট আর কোক খাই। ১২০ কেজি থেকে ওজন ১১৮-তে নেমেছে!

এমন ঘটনা ঘটলে বিয়ের আগের রাতে কেউ ঘুমুতে পারবেন না। পরদিন অর্থাৎ বিয়ের রাতে ভূমিকম্প অনুভূত হতে পারে সেই বিয়েবাড়িতে! আসলে আগের দিন আর পরের দিনের এসব গল্প কেন তুলে ধরছি? তাহলে একজনের কথা শুনুন-

‘জেলা উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে দূরে ভোটকেন্দ্র হয়। এ কারণে আগের দিন এসব কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ব্যালেট বাক্স পাঠাতে হয়। এখানে ভোটের দিন সকালে ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার নিয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু যদি ইভিএমে ভোটের ব্যবস্থা করা যায়,তাহলে আর ভোটের আগের দিন রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার সুযোগ থাকবে না।... সমাজের মধ্যে অনিয়ম ঢোকে। তা প্রতিহত করতে পদক্ষেপ নিতে হয়। এ কারণে কমিশন ভাবছে ইভিএমে ভোট নেওয়া শুরু করবে।’

যিনি এই কথা বলেছেন তার নাম কে এম নূরুল হুদা। ভদ্রলোক প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের শরিক কয়েকটি দলসহ বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট,বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং ইসলামী আন্দোলন এই নির্বাচনে সীমাহীন অনিয়মের অভিযোগ করে। এর ভেতরে ভোটের আগের দিন রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার অভিযোগটি নতুন ওঠে এবং অভিনব হিসেবে প্রতীয়মান হয়। কারণ, এমন অভিযোগ আগে ওঠেনি। যদিও নির্বাচনের পরে নূরুল হুদা সাহেব বলেছিলেন নির্বাচন ছহিহ অর্থাৎ সুষ্ঠু,সুন্দর ও শুদ্ধ হয়েছে।

এদিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা সভায় আরেকজন নির্বাচন কমিশনার শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী বলেছেন-‘আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরা কিংবা ভোটের দিন ভোট গ্রহণের পর গণনার সময় কোনও অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না’। এই দুজনের কথা শুনে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সিইসি ও একজন কমিশনার যদি এমন কথা বলে থাকেন তাহলে ধরে নিতে হবে জাতীয় নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। প্রকারান্তরে তারা এটা স্বীকার করে নিয়েছেন।

আমরা স্বীকার কিংবা অস্বীকার কোনোদিকে না যাই। তবে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা একটা অভিনব ব্যাপার।

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমওএফ/

x