এই ভোট চেয়েছিল বুঝি!

আমীন আল রশীদ ১৪:২৭ , মার্চ ১২ , ২০১৯

আমীন আল রশীদঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ প্যানেলের প্রার্থী নুরুল হক নুর ভিপি হয়েছেন বলেই নির্বাচন ভালো হয়েছে আর পুরো প্যানেলে ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন ছাত্রলীগ জয়ী হলে ভোট কলঙ্কিত—বিষয়টা এত সরলরৈখিক নয়। বরং দেশের সবচেয়ে গর্বের ও অহঙ্কারের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ সবক’টি পদে কে বা কারা জয়ী হলেন, তার চেয়ে বড় কথা, ২০১৯ সালের ১১ মার্চ এখানে যে নির্বাচন হলো, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিনির্মাণ ও নেতৃত্ব বিকাশের প্রয়োজনে ভোটের নামে যা হলো, তা এই প্রতিষ্ঠানের এতদিনের গর্ব ও অহঙ্কারের জায়গায় যে শুধু একটি বড় ধরনের আঘাত দিলো তা-ই নয়, বরং এই ঘটনা ছোট ও বড় আকারে বেশ কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
ভোটের এই ফলাফল খুব কি স্বাভাবিক? কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টির মধ্যে ২৩টিতে জয়ী হয়েছে ছাত্রলীগ। বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল একটি পদেও জয়ী হয়নি। আবার মেয়েদের ৫টি হলের মধ্যে ৪টিতেই জিতেছেন স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। তাছাড়া নুর যেখানে ভিপি হলেন, সেখানে তার প্যানেলেরই জিএস ও এজিএস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাত্র দুটি পদ ছাড়া সব পদেই জয়ী ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। যে ভোটাররা ভিপি পদে নুরকে ভোট দিলেন, তারা কেন জিএস ও এজিএস পদে তার প্যানেলের প্রার্থীদের ভোট দিলেন না? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা নুরকে ভোট দিলেন, অথচ বাকি সব পদে ছাত্রলীগকে ভোট দিলেন, এর ব্যাখ্যা কী? ফলাফল ঘোষণার পরও ভিপি নুর সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি মনে করেন এই নির্বাচন পুরো দেশবাসীকে হতাশ করেছে। পক্ষান্তরে ছাত্রলীগও এই ফলাফলের প্রতিবাদে ভিসির বাসভবন ঘেরাও করেছে। অতীতে কখনো কি এমন হয়েছে যে, ভিপি পদে জয়ী এবং পরাজিত উভয় প্রার্থী ভোট নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন? জয়ী হওয়ার পরও ভিপি আনন্দিত প্রতিক্রিয়া দেননি, এরকম ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম।
কেন এমনটি হলো, সেসব নিয়ে হয়তো আরও বিশ্লেষণ হবে। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে রাখা ভালো, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের যে মডেল বা নমুনা দেখা গেলো, সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনের হাওয়া কিছুটা স্তিমিত হয়ে যাবে; সেখানে আর এই উন্মাদনাটা আদৌ থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যে নেতৃত্ব বিকাশের কথা বলি বা অতীতের যেসব উদাহরণ নিয়ে শ্লাঘা বোধ করি; দেশের নানাবিধ সংকট ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অতীত ইতিহাস, সেই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ভোটের নামে এমন একটি কালো দাগ লাগিয়ে দেয়ার পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। কারণ, ১১ মার্চের এই ভোটটি না হলে বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মানুষের মনে যে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সমীহর ব্যাপারটি ছিল, সেটি অন্তত ক্ষুণ্ন হতো না। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাশীল এই প্রতিষ্ঠানটিকে কারা বিতর্কিত করলেন এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
২৮ বছরের প্রতীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শুধু এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই নন, বরং দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ মানুষেরও ব্যাপক আগ্রহ ছিল। যে কারণে ভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকেই কোনও না কোনোভাবে ডাকসু নির্বাচনের ইস্যুটি গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চরম বৈরিতা থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দুটি দলের ছাত্রসংগঠনের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখা গেছে, যা রাজনীতিতে অনেক সমস্যার মধ্যেও মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছিল। দীর্ঘদিন পরে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরে থাকা ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি, সংবাদ সম্মেলন সেই সহাবস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করে। মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয় যে, জাতীয় রাজনীতিতে যত সংকটই থাকুক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই স্রোতে গা ভাসায় না। বরং এখানে এক ধরনের সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার চর্চা আছে। ভোটের আগের দিন পর্যন্ত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যাই থাকুক না কেন, মানুষের মনে এরকম একটি বিশ্বাস ছিল যে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আর যাই হোক একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।
কিন্তু ভোটের দিনের প্রথম প্রহরেই মানুষের সেই ধারণা ও বিশ্বাস বদলে যেতে থাকে। কুয়েত-মৈত্রী হলে ভোটের বাক্সে আগেই ব্যালট পেপার থাকা, ব্যালটভর্তি বস্তা উদ্ধার, রোকেয়া হলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট বাক্স না থাকা, বিভিন্ন হলে ভোটারের দীর্ঘ লাইন এবং ভোটগ্রহণে ধীরগতি অথবা সাধারণ ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করার মতো ঘটনা দিনভর সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। খোদ উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদও স্বীকার করেছেন, এ জাতীয় ঘটনা দুঃখজনক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারে না। রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেছেন, তারা এই ঘটনায় বিব্রত। নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলও বলেছে, ভোটে প্রচুর অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেল ভোট বর্জন করে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষকর্তা উপাচার্য আখতারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন ঠিক তার উল্টো। তার দাবি, সব ঠিক আছে। সম্প্রতি ১০ টাকায় চা সিঙ্গারা চপ সমুচা ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে তিনি হাস্যরসের পাত্র হয়েছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের উপাচার্যকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন হাস্যরস শুধু তার নিজের জন্যই নয়, বরং পুরো জাতির জন্যই দুঃখজনক ও লজ্জার।
বহু বছর আগে প্রখ্যাত লেখক আহমদ ছফা ‘গাভীবিত্তান্ত’ উপন্যাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ডহীন উপাচার্যর যে বর্ণনা দিয়েছেন, তিন দশক পরে এসে সেই চরিত্র স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে বলেও অনেকে ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন। ফলে এই ঘটনা আমাদের আরও যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় তা হলো, কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন, কারা প্রভোস্ট ও প্রক্টর হচ্ছেন, কারা ভিসি হচ্ছেন?
ভোটের ঠিক দুদিন আগেই ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট ড. মিজানুর রহমানের ছেলে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে দুর্ব্যবহার করলে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রভোস্ট ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এই ঘটনার আগে সাধারণ মানুষ জানতো না যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পরে আবার হল প্রভোস্টের মতো দলীয় পদে নিয়োগ পেয়েছেন আইনের এই অধ্যাপক। এই সামান্য সুযোগটুকু গ্রহণ করে তিনি কি নিজেকে খুব মহান করলেন নাকি এরকম একজন অধ্যাপকও যে শেষমেশ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে   উঠতে পারেন না, সেটি প্রমাণ করলেন?
ভোটের দিন আলোচনায় এলেন কুয়েত-মৈত্রী হলের প্রভোস্ট শবনম জাহান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তার জ্ঞাতসারেই ব্যালটভর্তি বস্তা এখানে আনা হয়েছে। ফলে ছাত্রীদের দাবির মুখে তাকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যাপক নাসরিন জাহানকে প্রভোস্ট করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, যে প্রভোস্টের কারণে পুরা নির্বাচনটি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হলো, সেই কাজটি তিনি কি নিজের ইচ্ছায় বা নিজের সিদ্ধান্তে বা ব্যক্তিগত অতি উৎসাহে করেছেন, নাকি করতে বাধ্য হয়েছেন? বাধ্য হলে কে বা কারা তাকে বাধ্য করলেন? এই একটি হলের ঘটনাটি জানাজানি হয়েছে। বাকিগুলোয় কী হয়েছে?
ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের একাধিক প্রার্থীকে মারধরের অভিযোগ এসেছে শুধু নয়, সেই ছবিও গণমাধ্যমে এসেছে। যিনি ভিপি হয়েছেন, ভোটের দিন তিনিও মার খেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যদিও একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তিনি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছেন। ফলে সবকিছু মিলিয়ে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তা হলো, কেউ কি চাচ্ছে দেশের পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থাটাই বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হোক এবং পরিস্থিতি এমন হোক, যাতে মানুষ ভবিষ্যতে কোনও ধরনের ভোটের ব্যাপারে আগ্রহী না হয়? ভোট ছাড়াই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একাধিক উদাহরণ এরইমধ্যে তৈরি হয়েছে।
তবে ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের নামে যা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গ একটু পাশে সরিয়ে রেখে পুরনো সেই প্রশ্নটাই আবার নতুন করে উসকে দেয়া যায়, তা হলো- ডাকসু নির্বাচন হয়েছে বলেই কি এখন দেশের ছাত্র রাজনীতি বা ছাত্র আন্দোলনের চেহারা বদলে যাবে কিংবা দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে অথবা দেশ কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন কারা রাজনীতি করেন এবং তাদের উদ্দেশ্য কী? ষাট ও আশির দশকের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে এই সময়ের সবচেয়ে বড় পার্থক্য লোভ, ব্যক্তিস্বার্থ এবং ছাত্র সংগঠনকে মূল সংগঠনের ক্যাডার বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা। এই যদি হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতৃত্ব গড়ে উঠবে সেই ধারণার সাথে একমত পোষণের কোনও সুযোগ নেই। বরং এতদিন যে অবস্থা ছিল, এখন ভোটের সেই লোকগুলোর পরিচয় বদল ছাড়া কাজকর্মে বড় কোনও পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা ভুল। বছরের পর বছর ধরে ছাত্র রাজনীতির নামে যে সহিংসতার চেহারা দেশের মানুষ দেখেছে, সেই জায়গা থেকে মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে একটা নতুন সূচনা করার যে সুযোগ ২৮ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তৈরি হয়েছিল, বলাই বাহুল্য, সেই সুযোগটিও এবার নষ্ট হলো। মনে রাখা দরকার, ক্রিকেটে যেমন মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে বেশি খেলা হয়, তেমনি ডাকসু নির্বাচনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চেয়ে ক্যাম্পাসের বাইরের কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলা বেশি হয়েছে বলেই আপাতত প্রতীয়মান হয়।

লেখক: সাংবাদিক

 

/ওএমএফ/

x