সুলতানের শপথ এবং ৭০ ধারার জুজু

আনিস আলমগীর ১৭:১৩ , মার্চ ১২ , ২০১৯

আনিস আলমগীরমৌলভীবাজার-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ অবশেষে গত ৭ মার্চ শপথ নিয়েছেন। সিলেট-২ আসনে উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে বিজয়ী গণফোরামের মোকাব্বির খানও শপথ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিনি পিছিয়ে গেলেন। তবে আমার বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত তিনিও শপথ নেবেন। দেশে চরম নেতৃত্বের সংকট চলছে। মনসুর-মোকাব্বেররা সংসদে অংশগ্রহণ করে নিজেদের লাইমলাইটে এনে নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করবেন- এটাই স্বাভাবিক। এ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকা কখনও বিজ্ঞজনোচিত কাজ নয়।
তারা দুজনই ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসছেন। সুলতান মনসুর তো ডাকসুর ভিপি শুধু নয়, ছাত্রলীগের সভাপতিও ছিলেন। ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি তার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যথেষ্ট এগিয়ে আছেন। সিদ্ধান্তহীনতায় বেশি দিন সময় নষ্ট করেননি। সে জন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন কিন্তু রাজনীতির স্বার্থ জনস্বার্থকে ভুলিয়ে দেয় বলে আমরা সুলতান মনসুরকে প্রশংসা না করে নিন্দা করছি অনেকে।
ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, 'মানুষের মাথা কেনা যায় না, গরু-ছাগলের মাথা কেনা যায়। যারা গরু-ছাগলের মতো বিক্রি হয় তারা দালাল'। মনসুর বিক্রি হবে কেন? তিনি তো ঐক্যফ্রন্টের মার্কায় জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেননি। তিনি সংসদে যোগদান করেছেন। তার সংসদীয় এলাকার মানুষ তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন সংসদে তাদের সুখ-দুঃখের কথা বলার জন্য। তার এলাকার মানুষের কাছে তার দায়বদ্ধতার প্রশ্ন জড়িত। সুলতান মনসুর শপথ নেওয়ার যুক্তি হিসেবে শুরু থেকে তা-ই বলে আসছেন এবং সেটাই যুক্তিযুক্ত।
ড. কামালের ‘যারা গরু ছাগলের মতো বিক্রি হয়’ কথাটা অরুচিকর। তিনি একজন সম্মানিত লোক। আমাদের অনেকের চেয়ে বেশি জানেন। স্বীয় বিশ্বাসের আশ্রয় ত্যাগ করা কারও পক্ষে ভালো হতে পারে না। ড. কামালের জন্যও ভালো হয়নি। সুলতান মনসুর এ কথাটা দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি নির্বাচনকালেও বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শের কথা বলেছেন। সেটা বিএনপির কাছে বিব্রতকর ছিল, আওয়ামী লীগের কাছে বিরক্তিকর ছিল। বিএনপি যাকে বঙ্গবন্ধু বলতে কুণ্ঠিত, জাতির পিতা বলতে যাদের কোনও ইচ্ছাই নেই, তাদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা আদৌ কোনও যুক্তির কথা নয়।

আমরা দেখেছি, নির্বাচনের আগে অনেক সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ড. কামালকে জিয়াউর রহমানের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। ড. কামাল জিয়ার ক্যানভাস করলে নিজের মহিমা বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনায় যদি সতর্ক থাকেন তবে মনসুর অসতর্ক হয়ে বসে থাকবেন কেন? জীবন ন্যায়শাস্ত্রের সূত্র নয়। মাঝে মাঝে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য লক্ষ্যের পরিবর্তন করতে হয়। সুলতান মনসুর নির্বাচনের আগে তা-ই করেছিলেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের সামগ্রিক বিজয় আসেনি। ৭ মার্চ সাংসদ হিসেবে শপথ নিয়ে সংসদে যোগদান তার সৎ-উপলব্ধি। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকার শক্তিশালী সরকার। যোগ্য নেতৃত্বের হাতে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব রয়েছে। তাকে হটানো সহজ নয়। সর্বোপরি আওয়ামী লীগও শক্তিশালী গণসংগঠন। অনুরূপ পরিস্থিতিতে সরকার হটানো যখন সম্ভব নয় তখন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল সৃষ্টি করে সরকারকে সঠিক পথে রাখার চেষ্টা করাই তো উত্তম।
আশা করি মোকাব্বের সাহেবও অনুরূপ একটা উত্তম সিদ্ধান্ত নেবেন। শুধু মোকাব্বের সাহেব নয়, বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন সদস্য সংসদে যোগদান করলে আরও উত্তম হবে। আমি আগেও বলেছি, তারা ৮ জন মিলে একটা পার্লামেন্টারি গ্রুপ গঠন করতে পারতেন। শুধু সরকারে থাকলে যে জাতির উপকার করা যায় তা নয়, বিরোধী দলে থেকেও জাতির মঙ্গল করা যায়। গণতন্ত্রকে সার্থক করতে হলে চাই সুগঠিত জনমত এবং দায়িত্ববোধ। বিএনপির ছয়জন সংসদ সদস্য সংসদে যোগদান করলে জনমত গঠন আর দায়িত্ববোধ উভয় পালন করা হতো।
‘ক্ষমতা চরিত্রভ্রষ্টতা আনে’, ইংরেজ ঐতিহাসিক, রাজনীতিক ও লেখক লর্ড অ্যাকটন বলেছেন, ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চরিত্রভ্রষ্টতাকে পূর্ণতাদান করে’। বাংলাদেশ সংসদে আজ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মালিক। সুতরাং তাকে সতর্ক পাহারা দেওয়াই আজ বিরোধী দলের মুখ্য কাজ হওয়া উচিত। অথচ আজ তারা উদ্যোগ নিয়েছে দায়িত্বকে অবহেলা করে জাতিকে হতাশ করার তালে। ব্রিটিশ জাতিও বহুবার অনুরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু তাদের পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সতর্ক অবস্থানের কারণে সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কখনও ভ্রষ্টতা আনতে পারেনি।

বিএনপি রাগের মাথায় নির্বাচনের পর পর সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। বিষয়টা নিয়ে তাদের পুনরায় চিন্তাভাবনা করা উচিত। এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্যও প্রয়োজন। সংসদে এ ছয়জন সদস্য তাদের মুখপাত্র হয়ে কাজ করলে সংসদের ভিতরে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি গণমানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছতো। বিএনপি বারবার সংসদ নিয়ে যে খেলা খেলেছে তাতে তাদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। যখনই বিএনপিকে বিরোধী দলে অবস্থান নিতে হয়েছে তখনই তারা সংসদ সচল রাখার চেষ্টা করেননি। যে কারণে এখন তারা নেতৃত্বের সংকটে পড়েছে।
নেতৃত্বের সংকট থাকলে দল সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না। সুষ্ঠু রাজনীতি না করলে দলেও ভালো নেতাকর্মী সৃষ্টি হয় না। পরাধীনতার সময় স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলে বহু কালজয়ী নেতা সৃষ্টির সুযোগ থাকে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নেতা সৃষ্টি একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাঝে হয়। দল সে প্রক্রিয়ার মধ্যে না থাকলে নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে কি করে!
এ পর্যায়ে একটা প্রশ্ন উঠেছে সুলতান মনসুরের সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না? কারণ, তিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যোগদান করেছেন। ড. কামাল নাকি সুলতান মনসুরের সদস্যপদ খারিজ করার জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে/নির্বাচন কমিশনে গণফোরামের পক্ষ থেকে চিঠি দিচ্ছেন। ড. কামাল খ্যাতিসম্পন্ন একজন প্রবীণ আইনজীবী। সুতরাং তার চিঠি প্রকাশ ফেলে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো শাসনতান্ত্রিক কোন ভিত্তিটাকে তিনি হাইলাইট করে সুলতান মনসুরের সদস্যপদ খারিজের আবেদন করতে যাচ্ছেন।
শাসনতন্ত্রের ৭০ ধারায় সংসদ সদস্যের পদ খারিজের কথা উল্লেখ রয়েছে। ষোড়শ সংশোধনীর রায় এবং রায়ের পরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিলো তাতে এই ৭০ ধারা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা অনেকের কেটে গেছে। এ রায়ের বিতর্ক চলার সময় ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘রায়ে বারবার বলা হয়েছে সাংসদেরা স্বাধীন নন। সংবিধানের ৭০ ধারা তাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। এ কারণেই যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা তাদের হাতে থাকা উচিত নয়, যারা নিজেরাই স্বাধীন নন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সাংসদেরা স্বাধীন। কারণ, ৭০ ধারায় বলা আছে, কোনও সাংসদ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না। যদি দেন তবে তার সদস্যপদ বাতিল হবে। সংসদে ভোটাভুটিটা কিন্তু কোনও দলের পক্ষে-বিপক্ষে হয় না। সেটা হয় খসড়া বিলের পক্ষে-বিপক্ষে। একবারই দলের পক্ষে-বিপক্ষে হতে পারে, যখন নো কনফিডেন্স মোশন থাকে। সে ক্ষেত্রে ৭০ ধারার কথা আসে।’
লাগামহীন স্বাধীনতা কখনও স্বাধীনতা নয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের প্রদত্ত অবাধ স্বাধীনতার কুফল তখন সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন। সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং ছিলো নিত্যদিনের ঘটনা। কিছু সংখ্যক সদস্য ফ্লোর ক্রস করে যখন আওয়ামী লীগে যোগদান করতেন, তখন আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হতেন। আবার যখন তারা ফ্লোর ক্রস করে কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগদান করতেন তখন আবুল হোসেন সরকার মুখ্যমন্ত্রী হতেন। এ অবাধ স্বাধীনতা ভোগকারী সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগ দলীয় ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটওয়ারীকে মাইকের ডান্ডা ছুড়ে মেরে সংসদের ভিতরে গুরুতর আহত করেছিলেন। আর তিনদিন পরে হাসপাতালে তিনি মারা যান। এ অরাজকতাকে স্বাধীনতা বলা যায় না। এমন তিক্ত ইতিহাস ছিল বলে ১৯৭২ সালের শাসনতন্ত্রে ৭০ ধারা সংযোজিত হয়েছিলো।
সুলতান মনসুর দল থেকে পদত্যাগও করেননি, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে উপস্থিত থেকে ভোটদানে বিরতও থাকেননি। সুতরাং তার সদস্যপদ যাবে কেন? আর মৌলিক প্রশ্ন হলো, এই ৭০ ধারাটি সংযোজিত হয়েছিলো সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিং থেকে বিরত রাখার জন্য। কারণে অকারণে সংসদ অকার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিলে তা সমর্থন করার জন্য নয়। নবম সংসদের শেষের দিকে জাতীয় পার্টি থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাংসদ এইচ এম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি শেষ পর্যন্ত সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে বহাল ছিলেন। অষ্টম সংসদের শেষ দিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ আবু হেনাকে বহিষ্কার করা হলেও তার সদস্যপদ বহাল ছিল। দুটি ক্ষেত্রেই সংসদের ব্যাখ্যা ছিল, দল তাদের বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তারা দল থেকে পদত্যাগ করেননি। দশম সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্যপদ হারিয়েছিলেন। কারণ, তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
যাক, সুলতান মনসুরের সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না সে বিষয়টা হয়তো সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত সিদ্ধান্তের জন্য যেতে পারে। সুতরাং হয়তো দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পেতে। আওয়ামী লীগের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আমার মনে হয় ৭০ ধারার সুস্পষ্ট একটা বয়ান থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৭০ ধারা কি একজন সংসদ সদস্যকে যে কোনও দলীয় সিদ্ধান্তে হ্যাঁ হ্যাঁ করতে বাধ্য করছে নাকি নো কনফিডেন্স মোশন ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ রেখেছে- সেটা স্পষ্ট করা দরকার। আশা করি সরকার ৭০ ধারার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাদানের জন্য প্রয়োজনে একটা সংশোধনীও আনবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

x