ডাকসু নির্বাচন: নুর কেন ভিপি হলো?

মাসুদ কামাল ১৯:৩৩ , মার্চ ১৩ , ২০১৯

মাসুদ কামালঅনিয়মের যত ঘটনাই গণমাধ্যমে আসুক, যত দৃশ্যই মিডিয়ায় প্রচারিত হোক, তারপরও ২৮ বছর পর হওয়া এই ডাকসু নির্বাচনকে আমি ইতিবাচক বলে মনে করি। এই নির্বাচন নিয়ে অনেকের মতো আমার মনেও কিছু প্রত্যাশা ছিল। সেসব বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়িত যে হচ্ছে না সেটা নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। তখন তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৃশ্যাবলি দেখে দেখে যখন হতাশা ভর করছিল, তখন চকিতেই মনে একটা প্রশ্ন জাগলো- আমার প্রত্যাশার ভিত্তিটা আসলে কী? সেই ভিত্তিটা কি খুব যৌক্তিক? কেন আমি অত বেশি আশা করছি? ২০১৪ ও ২০১৮’র সংসদ নির্বাচন, এবং সবশেষে দুদিন আগের উপজেলা নির্বাচনের পর সেরকম প্রত্যাশা কি একটু বেশি হয়ে গেলো না?
তারচেয়ে বরং কোনও প্রত্যাশা না থাকাই ভালো। ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন যে হচ্ছে, এই হওয়ার আনন্দটিই নিয়েই না হয় থাকি। একটি বন্ধ অচলায়তনের দরজা তো শেষ পর্যন্ত খুললো। এটাইবা কম কী? এভাবেই ভাবছিলাম দিনভর। কিন্তু নির্বাচনের ফল এবং পরদিন জয়ী নুরের সঙ্গে পরাজিত শোভনের আলিঙ্গন আমাকে অনেকটাই আশাবাদী করেছে।

এই একটি নির্বাচন আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেলো। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন দৃপ্ত ভঙ্গিতে জানিয়ে দিলো তারা কী চায়। বলে দিলো, আমরা বড়রা যা কিছু ভাবি, তার অনেক কিছুই তারা পছন্দ করে না। এটাও যেন বলে দিলো, ওপর থেকে যা কিছু একটা চাপিয়ে দিলেই তারা সেটা মেনে নেবে না। তাদেরও কিছু মতামত রয়েছে। তাদেরও কিছু চিন্তাভাবনা রয়েছে। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আজকে যারা তরুণ, তাদের চিন্তা বা মতকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

অনেকে মনে করেন, ডাকসু আসলে জাতীয় রাজনীতিরই একটা মিনি সংস্করণ। কিন্তু ছাত্ররা প্রমাণ করেছে, তাদের চিন্তা গতানুগতিকতার বাইরে। জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পরেই বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদের দলের তো অস্তিত্বই নেই। এবার নির্বাচনি ডামাডোলের আড়ালে ঢুকতে গিয়েছিল, তাড়া খেয়ে পালিয়েছে। আর এত যে বড় বিএনপি, তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল- এরা তো পূর্ণাঙ্গ প্যানেলই দিতে পারেনি। হলগুলোর কোনও কোনোটিতে তিন থেকে চারজনের বেশি প্রার্থী নেই তাদের! অথচ তারা যে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি– এমন অজুহাতও দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিল তাদের অবাধ পদচারণা। এই যে বেকায়দায় পড়ে যাওয়া, এটা আসলে অছাত্রদের হাতে ছাত্র সংগঠন ছেড়ে দেওয়ারই কুফল। এদিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। গত কয়েক বছর ধরেই তারা ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব আর আদুভাইদের হাতে দিচ্ছে না।

কেবল প্রার্থী দিতে না পারাই নয়, ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তাদের দুরবস্থা ছিল লক্ষণীয়। কোথাও, কোনও পদেই তারা ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেনি। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ভোট যথাযথ হয়নি, কারচুপি হয়েছে। তর্কের খাতিরে এসবকে যদি সত্য বলে ধরেও নেওয়া হয়, তাহলেও কিন্তু কেউ বলবে না যে, ছাত্রদলের প্রার্থীদের কোনও সম্ভাবনা ছিল।

জাতীয় রাজনীতিতে একটা কথা প্রায়ই বলা হয়, বিএনপি নাকি নির্বাচনে জেতে নেগেটিভ ভোটে। যারা আওয়ামী লীগের কাজকর্ম পছন্দ করে না, তারা বিকল্প হিসেবে বিএনপিকে বেছে নেয়। বিএনপির বিশেষ কোনও রাজনৈতিক আদর্শকে ভালোবেসে নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভোট দেয় বিএনপিকে। কিন্তু এই ফর্মুলা কেন কাজ করলো না ডাকসু নির্বাচনে? এখানে তারা বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের। আমার তো মনে হয়, এখান থেকে বিএনপির শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে। কেবল নিজেদের নেতা-নেত্রীর মুক্তির দাবি একমাত্র রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারে না। মানুষের দাবিগুলো নিয়েও মাঠে নামতে হবে। না হলে দুরবস্থা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।

কেবল বিএনপির ছাত্রদলই নয়, বামপন্থীদেরও বলতে গেলে একরকম ভরাডুবি হয়েছে এখানে। অথচ নির্বাচনি প্রচারের সময় বামপন্থীদের হাঁকডাক কিন্তু বেশ দেখা গেছে। কয়েকটি সংগঠন মিলেমিশে যৌথ প্যানেল দিয়েছে তারা। তারপরও ভোটের বাজারে কোনই আওয়াজ তুলতে পারেনি। অথচ একসময় এই ডাকসুতে বামপন্থীদের জয়জয়কার ছিল। জাতীয় রাজনীতির মতো ডাকসুতেও যে বামপন্থীদের এমন নিঃস্ব অবস্থা হতে পারে, সেটা সম্ভবত গণমাধ্যমের প্রচারণা দেখে অনেকেই বুঝতে পারেনি। অথচ গত কয়েক বছরের বন্ধ্যা সময়েও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক যত আন্দোলন দানা বেঁধেছে, তার প্রতিটিতেই এই বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল প্রবল। অথচ তারপরেও যখন ভোটের প্রশ্ন উঠলো, এদের কেন বিবেচনাতেই নিলো না সাধারণ ছাত্ররা? আমার মনে হয় বামপন্থী দলগুলোর জন্য এটা একটা গবেষণা বা আত্মোপলব্ধির সাবজেক্ট হতে পারে।  

তাহলে ভোট পেলো কারা? অথবা কেনইবা এরা ভোট পেলো? আসলে এটিই হচ্ছে আলোচনার বিষয়। এটিই হচ্ছে আশাবাদের কারণ। একটু ব্যাখ্যা করি। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে কি হয়নি– এটা নিয়ে নির্বাচনের শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কেউ বলবেন হয়েছে, কেউ হয়তো বলবেন হয়নি। তবে এ সিদ্ধান্তে সবাই একমত হবেন যে, এই নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা। ডাকসুর কেন্দ্রীয় প্যানেলে তারা একটা সংগঠনের নামের ব্যানারে থাকলেও হলগুলোতে ছিল ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে। সেভাবেই তারা বিপুল ভোট পেয়েছে। এত কারচুপির অভিযোগের মধ্যেও অনেক হলে জিতেছে। আর কেন্দ্রীয় কমিটিতে তো সবচেয়ে সম্মানজনক ভিপি পদেই জিতে গেছে।

এই দুটি পক্ষের ভোট প্রাপ্তিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? ছাত্রলীগ ভোট পাবে, এটা স্বাভাবিকই ছিল। গত দশ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের ছিল একচেটিয়া প্রভাব। ছাত্রদল তো এই সময়ে হলে বা ক্যাম্পাসে ঢুকতেই পারেনি। হলে সিট পেতে হলে ছাত্রলীগের অনুমোদন নিতে হতো। ফলে সিট পাওয়ার স্বার্থেও সকলকে ছাত্রলীগ করতে হয়েছে। এভাবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গত দশ বছরে নিজেদের সংগঠনকে গড়ে তোলার এক অকল্পনীয় সুযোগ তারা পেয়েছে। সে সুযোগকে তারা কাজেও লাগিয়েছে। ফলে সবচেয়ে দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সংগঠন ভোটের দৌড়ে ভালো করবে- এতে আর অবাক হওয়ার কি থাকতে পারে। কিন্তু স্বতন্ত্রদের ভালো করার পিছনে রহস্যটা কী?

এখানে আসলে দুটি বিষয় কাজ করেছে। প্রথমত, যারা ছাত্রলীগকে পছন্দ করে না, তারা একটা বিকল্প খুঁজছিল। বিকল্পের সেই জায়গাটিতে প্রথাগত কোনও ছাত্রসংগঠন নিজেদের নিয়ে আসতে পারেনি। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর তাদের আনুগত্য ও লেজুড়বৃত্তিই তাদের সে জায়গায় আনতে পারেনি। আর এই শূন্যতার সুযোগে বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে স্বতন্ত্ররা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে এরা সেই আস্থার জায়গায় নিজেদের নিয়ে যেতে পেরেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, এটি যে সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণদের হৃদয়ের দাবি- সেটি কিন্তু মানতেই হবে। দুর্ভাগ্য হলো, দেশের ছাত্র সমাজের বৃহত্তম সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রলীগ এই বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পারেনি। একেবারেই যে পারেনি, তা হয়তো নয়। শুরুতে তাদের ভূমিকা কিন্তু এই আন্দোলনের পক্ষেই ছিল। কিন্তু মূল দলের সিনিয়র নেতাদের কারণে তাদের পিছু হটতে হয়েছে। এই জায়গাটিতেই তারা ভুল করেছে। এই জায়গায় কেবল ছাত্রলীগকেই নয়, তাদের মূল সংগঠন আওয়ামী লীগকেও শিক্ষা নিতে হবে। বুঝতে হবে, ছাত্রদের চাহিদা তাদেরকেই নির্ধারণ করতে দিতে হয়, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত ভালো ফল আনতে পারে না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেরকমই হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল নেতার সঙ্গেও কিন্তু বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রলীগের মতবিরোধ হয়েছে। তারপর আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই বাস্তবতা কি এখন আছে? নেই বলেই হয়তো কোটা সংস্কারের মতো একটা পপুলার ইস্যুতে পিছিয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। আর ইস্যুটির সঙ্গে থাকতে পারার কারণে নুরের মতো ছাত্রলীগেরই মাঝারি সারির নেতা বিপুল ভোটে ডাকসুর ভিপি হতে পেরেছে।

সবশেষে আশার জায়গাটা হচ্ছে শোভনের কোলাকুলি। সকালে নুরকে ধাওয়া দেয়ার পর, ভুল শুধরে বিকালে গিয়ে আলিঙ্গন করা- এটা ভালো। কেবল কোলাকুলিই নয়, সেই সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সে। আমার বিবেচনায় এসব ছাত্রলীগের ম্যাচিউরড রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। আশা করবো এই ম্যাচিউরিটির আয়ু মাত্র একদিন হবে না, বরং পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকবে। নুরকে ছাত্রশিবির বানানোর প্রচেষ্টা যে মোটেই কার্যকর কোনও রাজনীতি নয়, সংশ্লিষ্টরা সেটা যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন ততই মঙ্গল। নুর ছাত্রলীগেরই সৃষ্টি- এমন বিবেচনা এবং সে অনুযায়ী আচরণই বরং অধিকতর সুফল বয়ে আনতে পারে। আর তার প্রতিফলন হয়তো ডাকসুর আগামী নির্বাচনে পড়তে পারে।

লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলা ভিশন

/এসএএস/এমওএফ/

x