রক্তাক্ত নিউ জিল্যান্ড: মানুষ তাহলে কোথায় নিরাপদ?

চিররঞ্জন সরকার ১৭:৪৪ , মার্চ ১৫ , ২০১৯

চিররঞ্জন সরকারশান্তি ও সুন্দরের দেশ নিউ জিল্যান্ডও এবার ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় রক্তাক্ত হলো। নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নুর মসজিদসহ দুটি মসজিদে হামলার ঘটনায় দুই বাংলাদেশিসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে মসজিদে নামাজ শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যে একজন বন্দুকধারী সিজদায় থাকা মুসল্লিদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

হামলার পর এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জ্যাকিন্ডা আরডার্ন বলেছেন, এটি নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম কালো দিন। নিশ্চিতভাবেই যা ঘটেছে তা অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ মাত্রার অপরাধ। বর্তমানে নিউ জিল্যান্ড সফরে রয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। হেগলে ওভালে শনিবার থেকে তৃতীয় টেস্ট খেলার কথা। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে নামাজ পড়তে বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে পৌঁছনোর পর দুই বন্দুকবাজ গুলি ছুড়তে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। নিরাপত্তাকর্মীদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত তারা নিরাপদ স্থানে ফিরে আসে। এই ঘটনার পর শনিবারের টেস্ট বাতিল করা হয়েছে৷ অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালরা। তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে হামলাকারী তার হেলমেটে বসানো ক্যামেরায় গুলি চালানোর পুরো দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করেছে বলে খবর দিয়েছে নিউ জিল্যান্ড হেরাল্ড। অটোমেটিক রাইফেলধারী ওই ব্যক্তি ভিডিওতে নিজের নাম বলেছেন ‘ব্রেন্টন ট্যারেন্ট’। ২৮ বছর বয়সের ওই হামলাকারীর জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়।

বন্দুকধারী ক্রাইস্টচার্চের ডিন্স এভিনিউতে আল নূর মসজিদের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় ‘লাইভ’ শুরু হয়। একটি ড্রাইভওয়ের কাছে তিনি গাড়ি পার্ক করেন। গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রচুর গুলি দেখা যায়। সেখানে পেট্রোল ভর্তি কয়েকটি ক্যানও ছিল।

ওই ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করে। এরপর মসজিদে ঢোকার পথেই সে একজনকে গুলি করে। ভেতরে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করে। সে বেশ কয়েকবার তার সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্রটিতে গুলি ভরে (রি-লোড) এবং এলোপাতাড়ি গুলি করে। এভাবে প্রায় তিন মিনিট ধরে গুলি করার পর সে মসজিদের সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাস্তার দিকে যাওয়ার সময় সে আশপাশের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

কেন এই সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে- তার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, আক্রমণকারী এক ধরনের মুসলিম-বিদ্বেষ মনোভাব থেকেই এমন হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। গোটা পৃথিবীজুড়ে জঙ্গিবাদীর প্রতি যে ক্ষোভ আর বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে, তারই বলি হচ্ছেন নিরীহ ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলিমরা। এই ঘটনার পেছনেও তেমন কোনও কারণ থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ঘটনার পেছনের কারণ যা-ই হোক, এই ঘটনায় নিউ জিল্যান্ড সরকারেরও দায় আছে। একজন ব্যক্তি সশস্ত্র হয়ে ‘লাইভ’ ভিডিও চালিয়ে প্রায় বিশ মিনিট ধরে ঠান্ডামাথায় এতগুলো মানুষকে খুন করলো, অথচ পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্মীরা কিছুই টের পেলো না, এগিয়ে এলো না- এটা নিঃসন্দেহে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা। আমরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনায় মুখর হই, যে কোনও ত্রুটি পেলে সরকারের গোষ্ঠী উদ্ধার করি। কিন্তু উন্নত বা ধনী দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না। নিউ জিল্যান্ডের সরকার কিছুতেই এই হতাহতের ঘটনায় তাদের ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না।

এই ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনার পর গোটা দুনিয়াজুড়ে ক্ষোভ আর নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বিশ্বনেতারা যথারীতি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করছেন তাদের ঘৃণা আর অঙ্গীকারের কথা। ঘটনাটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনও মানুষের জন্যই অত্যন্ত শঙ্কার, উদ্বেগের। আমাদের দেশেও নানা সময়ে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। যারা একটু ভিন্ন চিন্তাধারায় বিশ্বাসী, মুক্তমনা, ভিন্ন ধর্ম কিংবা আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাসী, তাদের অনেককেই বোমা, গুলি কিংবা চাপাতির কোপে জীবন দিতে হয়েছে। আমাদের সরকার হামলাকারীদের শায়েস্তা করার ব্যাপারে আন্তরিক নয়, পুলিশি ব্যবস্থা দুর্বল ইত্যাদি কথা বলে আমরা আমাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে যারা উন্নত, জননিরাপত্তা যেসব দেশে প্রধান রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার, সেসব দেশে যখন সন্ত্রাসী হামলা ঘটে, মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তখন আমরা ভীষণ রকম কুঁকড়ে যাই। ভীত হই। অসহায় বোধ করি। অশুভ শক্তির হাতে বিনা কারণে প্রাণ ত্যাগ করাই কী তবে মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়ালো?

অথচ বিশ্বটা এমন ছিল না। আমেরিকায় টুইন টাওয়ারে জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়েই যেন বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তছনছ হয়ে যায়। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী আক্রমণ, যা বহুলভাবে ৯/১১ বলে পরিচিত। জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে এই প্রেক্ষাপটের একটা ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এই আক্রমণের রেশ টেনে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে পশ্চিমারা প্রথমে আফগানিস্তান পরে ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছে। তালেবানদের আশ্রয়ে থাকা ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে কেনিয়া ও তানজানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে হামলার অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে এ হামলা চালায়। কিন্তু এর পেছনে এদের একটা বৃহৎ স্বার্থ কাজ করেছে, মধ্য এশিয়ার মুসলিম বিশ্বের খনিজ সম্পদ তথা তেল সম্পদের ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম করা।

আর এরই প্রেক্ষিতে ‘বুশ-সাম্রাজ্যবাদ’ এর বিরোধিতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ‘আল্লাহর আইন’ কার্যকর করার জন্য পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে, ইহুদি-খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে। জিহাদের অংশ হিসেবে চলে সন্ত্রাসবাদ, বোমা হামলা, নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। আর এরাই সমাজে জঙ্গি বলে স্বীকৃতি পায়।

৯/১১-এর জঙ্গি হামলার জের যেন এখনও থেকে গেছে। বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটে চলেছে একের পর এক হামলা। তা সে মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক-সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, বাংলাদেশের জেএমবি, জামায়াত, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ নানা নামের সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী, ভারত-পাকিস্তানে লস্কর-ই তৈয়ব, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন কিংবা আফগানিস্তানের তালিবান অথবা আইএস-এর হামলা৷ এখনও বুঝতে পারি না কীভাবে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে আইএস এবং তালেবানি নেটওয়ার্ক। সন্ত্রাস রুখতে গোটা বিশ্ব একজোট হয়েও কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? ভাবতে বসলে চিন্তাগ্রন্থি কেমন অবশ হয়ে আসে!

এখন দেখা যাচ্ছে অনেক পশ্চিমা ব্যক্তি মুসলিম-বিদ্বেষ থেকে নিজেরা সন্ত্রাসী হয়ে উঠছেন। সুযোগ পেলেই নিরীহ মুসলিমদের ওপর বর্বর হামলা চালাচ্ছেন। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব? সেটা নিয়ে কাউকে তেমনভাবে ভাবতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা-গবেষণার দরকার আছে।

দেশে দেশে অভিবাসী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, স্থানীয়দের সঙ্গে বহিরাগতদের দ্বন্দ্ব, জাত্যাভিমান ইত্যাদি বিষয় উন্নত দেশগুলোতে যে সন্ত্রাসবাদের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা কি বিশ্ববাসীর কাছে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে? সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক উদ্যোগ-আয়োজন ও গবেষণা করা দরকার। আমাদের দেশে সন্ত্রাসবাদের বিকাশ সম্পর্কে বলা হতো, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা ও কাঠামোর অভাব সন্ত্রাসবাদ বিকাশে সহায়ক। কিন্তু নিউ জিল্যান্ড, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে যখন মৌলবাদী হামলার ঘটনা ঘটে, তখন আমরা কী বলব? রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর অভাব? আসলে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস, ডিসকোর্স, রাষ্ট্রীয় নীতি সবকিছুই নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

লেখক: কলামিস্ট

 

/ওএমএফ/

x