নববর্ষ এবং নতুন এক বাতিঘর ‘নুসরাত’

হারুন উর রশীদ ১৪:২১ , এপ্রিল ১৫ , ২০১৯

হারুন উর রশীদআমার মনে হয়েছে নুসরাত আমাদের বাতিঘর। তিনি জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেছেন সত্যানুসারী হতে। তিনি নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে বলে গেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন পরাজয় নয়, সত্য জয়ী হয়। আর সত্যের কাছে জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন তিনি। তিনি এক মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ। নববর্ষে এই নুসরাতকে জানাই সালাম। এক বীরযোদ্ধার প্রতি আমার অনিঃশেষ ভালোবাসা।
এবারের বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল ভাব নেওয়া হয়েছে রবি ঠাকুরের নৈবেদ্য থেকে- ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে আকাশে।’
আমি নৈবেদ্য’র (৪৮) সেই কবিতাটি পুরো এখানে তুলে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না।
এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়,

দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয় -

লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যুভয় আর।

দীনপ্রাণ দুর্বলের এ পাষাণভার,

এই চিরপেষণযন্ত্রণা, ধূলিতলে

এই নিত্য অবনতি, দণ্ডে পলে পলে

এই আত্ম-অবমান, অন্তরে বাহিরে

এই দাসত্বের রজ্জু, ত্রস্ত নতশিরে

সহস্রের পদপ্রান্ততলে বারম্বার

মনুষ্যমর্যাদাগর্ব চিরপরিহার -

এ বৃহৎ লজ্জারাশি চরণ-আঘাতে

চূর্ণ করি দূর করো। মঙ্গলপ্রভাতে

মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে

উদার আলোক-মাঝে উন্মুক্ত বাতাসে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং জাসিন্ডা আরডার্ন

এবারের এই যে মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল ভাব এটা কিন্তু শুধু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নেওয়া হয়নি। বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার মর্মান্তিক ঘটনাকেও। প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাপী অশান্তি আর অসুরের দাপটকে। তাই তো আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার তিমির বিনাশী এই আয়োজন। এই শোভাযাত্রা। মঙ্গলের শোভাযাত্রা। অসুর বিনাশী শান্তির ভোরের আশায় শোভাযাত্রা। আমি কখনো ভুলবো না নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্নের সেই কথা। মজজিদে হত্যাকাণ্ডের পর নিউজিল্যান্ডের টেলিভিশনসহ সম্প্রচার মাধ্যমে জুমার নামাজ প্রচারের দিন মুসলিম পোশাকে তার সেই ছোট্ট একটি বাণী, যা তিনি বলেছিলেন সেই নূর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে। "New Zealand mourns with you. We are one."

আর তার এই উচ্চারণ ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের দর্শন থেকেই উৎসারিত হয়েছে। তিনি তাই আগে সেই দর্শনের কথাই বলেন,

According to Muslim faith, the Prophet Mohammed - sallalaahu alaihi wa sallam (peace be upon him) - said, 'The believers in their mutual kindness, compassion and sympathy are just like one body. When any part of the body suffers, the whole body feels pain.'

আমার মনে হয়েছে আমাদের চিন্তার যে সংকট তৈরি হয়েছে। মনুষ্যত্বের যে অভাব তৈরি হয়েছে। মানবিক ভালোবাসার যে আকাল। তা থেকে বেরিয়ে এসে এক মানবিক বিশ্ব গড়ার জন্য অনেক মানুষ আত্মত্যাগ করছেন। সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছেন। শিকার হচ্ছেন ঘৃণা আর আক্রোশের। কিন্তু তার মধ্য দিয়েই জেগে উঠছে মানবিক বোধ। অসুরের বিপরীতেই আমরা দেখতি পাচ্ছি সুরের এক নতুন যাত্রা। তাকে কি নতুন পৃথিবীর পথ বলব? আমি বলতে চাই এক মানবিক পৃথিবীর আলো।

এক বাংলাদেশি নুসরাতের প্রতিবাদের ভাষা

নুসরাত পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ১০ এপ্রিল রাতে। তাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। কথিত বিচারের মাধ্যমে ফ্রান্সের বীর কৃষক কন্যা জোয়ান অব আর্ককে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল ১৪৩১ সালে। আর আধুনিক এই বাংলাদেশে প্রতিবাদী নুসরাতকে কোনো কথিত বিচার ছাড়াই ক্ষমতার দম্ভে পুড়িয়ে হত্যা করেছে সমাজপতিরা।

নুসরাতের চিঠি, তার লেখা ডায়েরি, তার জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এক যোদ্ধার গল্প। ছড়িয়ে আছে এক প্রতিবাদী নারীর কথা। আছে এক বীরকন্যার গল্প। নুসরাত আগুনে জীবন দিয়েছেন। কিন্তু ঘাতকের, যৌন নিপীড়কের আগুন চক্ষুকে ভয় পাননি। তিনি অগ্নিস্নানে আরো পবিত্র হয়েছেন। বাংলাদেশকে পবিত্রতার পথ দেখিয়েছেন।

চিঠিতে নুসরাত অনেক আগে লিখেছেন, 'আমি লড়বো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে, সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।'

আর ৬ এপ্রিল তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুর্বৃত্তদের বলেছিলেন, ‘আমি যা বলেছি সত্য বলেছি। জীবন দিতে হলেও আমি মিথ্যা বলব না। আমি তার প্রতিবাদ করেছি। আমি এ অন্যায়, এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।’

এক নিরন্তর প্রতিবাদী নারী

২৭ মার্চ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা নুসরাতকে যৌন হয়রানি করে রাজনীতি, পুলিশ আর প্রশাসনকে সাথে নিয়ে পার পেতে চেয়েছিল। কারণ অতীতে তার ক্ষমতার দাপটে সে আরো অনেক যৌন নিপীড়ন করে পার পেয়েছে। কিন্তু নুসরাত তা হতে দেননি। পরিবারের সহায়তায় মামলা করেছেন। সেই মামলা করতে গিয়েও থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের জিজ্ঞাসাবাদের নামে আরেক দফা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন নুসরাত। তারপরও সটান দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। মেরুদণ্ড সোজা করে। এই যুদ্ধকালে তিনি পীড়িত হয়েছেন। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। আর দুর্বৃত্তরা জানত এই নুসরাত প্রতিবাদী। যেকেনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে, নির্যাতিতকে রক্ষায় ছুটে যাবেন। তাই দুর্বৃত্তরা ৬ এপ্রিল পরীক্ষার সকালে তাকে মাদ্রাসার ছাদে নিয়েছিল তার (নুসরাত) এক বান্ধবীকে মারপিটের মিথ্যা খবর দিয়ে। আর সেখানেই তার শরীরে আগুন দেওয়া হয়।

এর আগেও ওই মাদ্রাসারই আরেক যৌন নিপীড়ক দুর্বৃত্ত তার চোখ নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাতেও হার মানেননি নুসরাত। ঠিকই তিনি তার পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। চোখের যন্ত্রণা নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। আর সব পরাজিত শক্তি এক হয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছে। কিন্তু এই মৃত্যু যে জীবনের চেয়েও শক্তিশালী তা তারা জানে না। তারা জানে না প্রতিবাদের কখনো মৃত্যু হয় না।

মানবিক শিক্ষা

নুসরাত বেড়ে উঠেছেন ফেনীর সোনাগাজীর এক নিভৃত গ্রামে। পড়াশোনা মাদ্রাসায়। তার বাবাও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মাওলানা। তাই হয়তো তিনি তার মেয়েকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা তাকে কি শিক্ষা দিতে পেরেছে আমি তা জানি না। কিন্তু নুসরাত যে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন তা নিশ্চিত। ধর্মীয় শিক্ষার মাঝেই তিনি তার মানবিকতা খুঁজে নিয়েছেন। বোরকা বা হিজাব নিয়ে যারা অহরহ সমালোচনা করেন সেই বোরকা বা হিজাব তার স্বাধীন মনে কোনো কালো ছায়া ফেলতে পারেনি। তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবেই গড়ে তুলেছেন। আমরা যাকে আধুনিক শিক্ষা বলি তা হয়তো নুসরাত পাননি। তবে কথিত আধুনিক অথবা ধর্মীয় শিক্ষাকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি মানবিক শিক্ষাকে। সেটা যেভাবে পাওয়া যায় সেটাই আসল এবং প্রকৃত শিক্ষা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কওমি শিক্ষার্থীদের যখন মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিহত করতে মাঠে নামানো হয় সেটা কুশিক্ষা। যখন নারীকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে ধর্ষণের জন্য পোশাককে দায়ী করা হয় সেটা কুশিক্ষা। আবার আধুনিক শিক্ষার নামে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পহেলা বৈশাখে নারীদের যৌন হয়রানি করা হয় তখন সেটাও কুশিক্ষা। কে কোন পোশাক পরবেন এটা তার স্বাধীনতা। কে কোন ধরনের শিক্ষা নেবেন সেটাও তার স্বাধীনতা। তবে শিক্ষা হতে হবে মানবিক। নুসরাত পরিবার থেকে হোক, নিজের আলোয় হোক অথবা যেভাবেই হোক তিনি একজন সুশিক্ষিত নারী। মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী। হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠান তাকে এই শিক্ষা দেয়নি। কিন্তু যে শিক্ষাটা তিনি অর্জন করেছিলেন, এই শিক্ষা আমাদেরও অর্জন করতে হবে।

বিচারই শেষ নয়

নুসরাত হত্যার পুরো বিষয়টি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে তদন্তে। কিছু আসামি ধরাও পড়েছে। কেন এবং কারা তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে তাও পরিষ্কার হচ্ছে। আর ওই দুর্বৃত্ত হত্যাকারী চক্র যৌন নিপীড়কদের সহযোগীদের পরিচয়ও মিলছে। সমাজের মুখোশধারীদের মুখোশ আরো খুলে পড়বে আশা করি। এই হত্যার বিচার হয়তো হবে। অপরাধীরা শাস্তিও হয়তো পাবে। কিন্তু বিচারেই বিষয়টি শেষ হবে বলে আমি মনে করি না।

আমি মনে করি নুসরাত নতুন এক আলোও আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। সত্যের জন্য জীবন দেওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে লড়াই করতে হয় তা আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

নিউজিল্যান্ডের মসজিদ থেকে সোনাগাজী

নিউজিল্যান্ডের মসজিদের ঘাতককে পৃথিবীর মানুষ ঘৃণা জানাবে চিরকাল। মনে রাখবে একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্নকে। যারা ঘাতকের গুলিতে জীবন দিয়েছেন তারা একই সঙ্গে এক মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন ছড়িয়েছেন। নুসরাতের ঘাতকরাও ঘৃণার আগুনে পুড়বে চিরকাল। আর নুসরাতও তার জীবন দিয়ে এক মানবিক বাংলাদেশের কথা বলে গেছেন। এই নববর্ষে আমরা নুসরাতের সাহসে ভর করে সেই মানবিক বাংলাদেশের কথাই বলতে চাই।

কৃষক কন্যা জোয়ান অব আর্ককে ১৮ বছর বয়সে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আর আমাদের নুসরাতকেও একই বয়সে (১৯) পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। কিন্তু জোয়ান অব আর্ককে বাস্তবে হত্যা করা যায়নি। সে ফ্রান্সে যে আলো ফেলেছিল সেই আলোই জ্বলছে। জানি না নুসরাত জাহান রাফির জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হবে কি না। কিন্তু এটা জানি, তিনি আমাদের জোয়ান অব আর্ক। তার আলোও আমাদের পথ দেখাবে।

শুভ নববর্ষ।

লেখক: সাংবাদিক

 ই-মেইল:swapansg@yahoo.com

/এসএএস/এমএমজে/

x