আমার সংস্কৃত মুখে দূর নক্ষত্রের ছায়া

প্রসূন রহমান ১৩:৪৯ , এপ্রিল ১৬ , ২০১৯

প্রসূন রহমান১৯৬১ সালে জন্ম হয়েছিল ছায়ানটের, আর ১৯৭৮ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৪০ বছর। বড় কোনও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের আর জন্ম হয়নি। জনগোষ্ঠী প্রসারিত হলেও শিল্পচর্চার জায়গাগুলো প্রসারিত না হয়ে ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। ১২০০ সিনেমা হল কমতে কমতে ১০০-তে এসে ঠেকেছে। যেখানে সিনেপ্লেক্সগুলো ছাড়া বাকি সব লাইফ সাপোর্টে আছে। নাটক মঞ্চায়নের জায়গা কমতে কমতে এক জায়গায় এসে স্থির। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতেও এখন আর নিয়মিত নাটক মঞ্চায়নের খবর শোনা যায় না। গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহনকারী খেলা-পালা অধিকাংশই এখন জাদুঘরে। আমাদের সাংস্কৃতিক পার্বণগুলো করপোরেট সংস্কৃতির পাঁকে পড়ে টেলিভিশন বন্দি হয়ে পড়ছে ক্রমে। আর আমাদের বইপড়া বা সাহিত্য চর্চার সময়টুকু বোধহয় এখন সবারই অনলাইনে মাথা গুঁজে পার হয়ে যায়।
এ হয়তো আমাদের ডিজিটাল সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু সে বাস্তবতা মোকাবিলা করার জন্যে, গণমানসে সংস্কৃতির মৌল প্রক্রিয়া সচল রাখবার জন্যে আমরা কি কোনও প্রস্তুতি নিয়েছিলাম? জাতির মননের দিকে, মানসিক গঠনের দিকে, সাংস্কৃতিক প্রবণতার দিকে আমরা বোধহয় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাইনি কখনোই।

একেকটি নগরীর বিশাল জায়গাজুড়ে বেড়ে উঠছে অফিস-আদালত, আবাসিক ভবন, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, শুধু কোথাও দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলার কোনও জায়গা নেই। মননশীল বিনোদনের কোনও স্থান নেই। সৃজনশীলতার কোনও চর্চা নেই। অর্থপূর্ণ কোনও উদ্যোগ নেই। আমাদের বিনোদিত করার সব ভার আমরা ছেড়ে দিয়েছি রাজনীতিবিদ আর অগণিত টিভি চ্যানেলের ওপর। রাজনীতিবিদগণ অভিনয় শিল্পী হয়ে আর টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন প্রচারের প্রধান টুলস হয়ে তৈরি করছেন আদর্শ ও নৈতিকতাহীন ভোক্তানির্ভর সমাজ।

রাজধানীর অনেক এলাকায় বিনোদনের জন্যে প্রায় কিছু নেই। গুলশানের লিংক রোডের মুখ থেকে উত্তরের শেষ মাথা পর্যন্ত অসংখ্য রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে, কিন্তু একটিও বইয়ের দোকান চোখে পড়বে না। ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড এবং বনানী ১১ নম্বর রোডের অবস্থাও তাই। একটিও বইয়ের দোকান চোখে পড়বে না।

নাগরিক জীবনে খাওয়া আর শপিং ছাড়া কোনও বিনোদন নেই। অনুসরণ করার মতো কোনও আদর্শ নেই, বরণ করার মতো কোনও ব্যক্তিত্ব নেই। শিল্পচর্চা ও প্রদর্শনের কোনও স্থান নেই। তবুও কোনোরকম পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই, কোনোরকম সোশ্যাল গাইডলাইন ছাড়াই একটা জনগোষ্ঠী এমনি এমনি মননশীল হয়ে উঠবে, এমনি এমনি অনেক সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল হয়ে উঠবে এমনটা বোধহয় আশা করা ঠিক হবে না।

সংস্কৃতির সব মাধ্যমেই এক ধরনের বন্ধ্যত্ব চলছে যেন। এক ধরনের অগভীর চর্চা আর অযোগ্যদের নিজেকে জাহির করবার প্রয়াস বেশি চোখে পড়ে। বইমেলার ৩০ দিনে ৩ হাজারের ওপর বই প্রকাশিত হয়, কিন্তু সৃজনশীল ও মননশীল সব শাখা থেকে ৩০টি মানসম্পন্ন বই পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনের অবস্থা এর মাঝে সকলেই জানেন। হাতে গোনা দুটি মঞ্চেও প্রতিবছর দুটো বা তিনটের বেশি ভালো প্রযোজনা নজর কাড়তে পারে না। সংগীত ধুঁকতে ধুঁকতে ভিডিও মাধ্যমের ওপর ভর করে একরকম বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চিত্রকলাতেও চেষ্টা ও চর্চা আছে, কিন্তু কোনোকিছুই কেন জানি সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় তেমন কোনও অবদান রাখছে না। অথবা খুব নীরবেই হয়তো কাজ হচ্ছে অনেক, আমরা সেসব জানতেই পারছি না। স্মার্টফোন হাতে আমাদের ডিজিটাল অ্যান্টেনা শুধু সেসব সংবাদ স্ক্রল করে যাচ্ছে, অনুভব করতে পারছে না। সংযোগ ঘটাতে পারছে না।

আমাদেরকে এমন সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর অ্যাকটিভিস্ট করে তোলার পাশাপাশি চলমান সংস্কৃতির যে সংকট সেটা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কোনও মাধ্যমের একার নয়। এ সংকট সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের, পুরো জাতির। দেশের ৬৪টি জেলায় মোট ৬৪টি শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে অথবা, কেন্দ্রীয় একাডেমির প্রতিটি জেলায় ১টি করে শাখা রয়েছে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হচ্ছে- ৩টি থানা নিয়ে সবচেয়ে ছোট যে জেলাটি গঠিত সেই মেহেরপুরের ৬ লাখ মানুষের জন্যে যেমন একটি শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে তেমনি ২ কোটি মানুষের এই শহরেও একটিই শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে। পুরনো ঢাকার সোয়ারিঘাটে প্রতিষ্ঠিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমিরও আরও ২টি শাখা রয়েছে ধানমন্ডি ও মতিঝিলে। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত শিল্পকলা একাডেমির এই শহরে আর কোনও শাখা নেই। আমরা শিল্পচর্চার, শিল্প প্রদর্শনের কোনও স্থান তৈরি করছি না। কিন্তু আশা করছি এই শহরের লোকজন, এই দেশের লোকজন খুব মননশীল, সৃজনশীল এবং সুশৃঙ্খল ও সাংস্কৃতিক হয়ে উঠবে।

একটি দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়ে সে দেশের প্রায় সবকিছুর ওপরে। আমরা চাই- বন্ধ হোক সব ঘৃণার চাষাবাদ। সম্ভবত এটা শেষ সময়, রাজনীতির নিজের মান উন্নয়নের পাশাপাশি, সমাজনীতি ও সাংস্কৃতিক দুর্বলতার দিকেও একটু চোখ তুলে তাকানোর। তাছাড়া তিন রকমের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রেখে আমরা যে ৩ ধরনের প্রজন্ম তৈরি করছি, আর তারা যে ভবিষ্যতের কোনও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেই কখনোই একমত হতে পারবে না এই ব্যাপারটা মনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানোর কথা ভাবতে হবে।

দেশে নানারকমের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। কিন্তু এটিকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বলা যাবে না যদি সাংস্কৃতিক কোনও উন্নয়ন না ঘটে। কারণ সংস্কৃতিই একটি সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি। সংস্কৃতিই একটা সমাজের উন্নয়নের প্রধান পরিচায়ক। সমাজ যদি একটি শরীর হয় সংস্কৃতি তার মুখাবয়ব।

মানুষ তার মেধা ও সৃজনশীল ক্ষমতার প্রয়োগে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে বলেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর এই সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রক্রিয়াই হচ্ছে শিল্প। যে শিল্প সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে সামাজিক ভারসাম্য যেমন রক্ষা করে তেমনি আনে স্থিতিশীলতা। আমাদের ভাইয়েরা, আমাদের আত্মীয় বন্ধুরা, আমাদের সন্তানেরা বিপথগামী হওয়ার আগেই জীবনের সৌন্দর্যটুকু যেন বুঝতে পারে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, রাষ্ট্র থেকে সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। বাণিজ্যিক ক্যাম্পাসে সার্টিফিকেট নির্ভর পড়াশুনা আর কোচিং সেন্টারের চক্রে বাঁধা না পড়ে তারা যেন খানিকটা শিল্পের সান্নিধ্যে আসতে পারে সে ব্যবস্থা করা হোক। তারা জানুক জীবন কতটা সুন্দর। তারা জানুক মানুষ জীবন দিতে পারে না বলেই অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার তার নেই। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পারার মাঝেই বেঁচে থাকার আসল আনন্দ।

জীবনের সকল আনন্দ উদযাপিত হয় সংস্কৃতির নানা শাখার ওপর ভর করে। জগতের আনন্দযজ্ঞে যদি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে নিরানন্দ এসে গ্রাস করে নিতে পারে কিছু মানুষের জীবন। যারা অন্যের জীবনকেও অন্ধকার করে তুলতে পারে অনায়াসে। আমরা কেমন পৃথিবীতে জীবন যাপন করে যাচ্ছি আর আমাদের সন্তানদের কেমন পৃথিবীতে রেখে যাবো, তা গুরুত্বের সঙ্গে একবার ভেবে দেখবার সুযোগ হোক।

অকাল প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ বলতেন, ‘সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা হচ্ছে রিলে-রেসের মতো। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করে যায়।’ আমাদের প্রজন্মের ওপর সংস্কৃতির সে আলোকবর্তিকা এগিয়ে নেওয়ার যেটুকু দায়িত্ব ছিল তা যদি আমরা পালন করে যেতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতের কাছে আলোর বদলে কেবল অন্ধকার রেখে যেতে হবে।


লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

 

/এসএএস/এমএমজে/

x