প্রথম ধাপের পর লোকসভা নির্বাচনের দৃশ্যপট

আনিস আলমগীর ১৬:৩৩ , এপ্রিল ১৬ , ২০১৯

আনিস আলমগীরভারতের লোকসভা নির্বাচন আরম্ভ হয়েছে, ৫৪৩ আসনের মাঝে প্রথম ধাপে ১১ এপ্রিল ৯১ আসনের নির্বাচন হয়েছে। সাত পর্বের নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে ১৮ এপ্রিল। সর্বশেষ পর্ব ১৯ মে আর ভোটের ফল গণনা হবে ২৩ মে। জল্পনা-কল্পনার সীমা নেই– কে জিতবে? এ পর্যন্ত যা জরিপ হয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জোট এগিয়ে আছে। অনেকে বলছেন ম্যাজিক ফিগার ২৭২ আসনে না জিতলেও মোদি নাকি কাছাকাছি পৌঁছবে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ উন্মাদনা বিজেপিকে এগিয়ে দিয়েছে।
কাশ্মিরের পুলওয়ামায় পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদের গাড়িবোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের বলাকোটে ভারত তথাকথিত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে। ভারত দাবি করেছে তারা এ হামলায় ৩০০ জঙ্গিকে হত্যা করেছে। এরপর থেকেই নরেন্দ্র মোদি নিজেকে নিরাপত্তার প্রহরী বা চৌকিদার হিসেবে চিত্রিত করে যাচ্ছে। অথচ রয়টার্স, বিবিসিসহ বিদেশি মিডিয়া বলেছে, ভারতীয় হামলায় বলাকোটে কয়টা গাছের ডালা ভেঙেছে, আর কিছুই করতে পারেনি। বরং পাকিস্তানি বিমান হামলার পাল্টা হামলায় ভারত দুইটা বিমান হারিয়েছে, একজন পাইলটকে পাকিস্তান জীবিত ধরেছে, আরেক পাইলট বিমানসহ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।

এরপরও মোদি নিজেকে নিরাপত্তার প্রহরী দাবি করছেন তা নয়, তার মিত্ররাও নিজেদের নামের আগে ‘চৌকিদার’ টাইটেল লাগিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় সরব আছেন। এই চৌকিদার নিয়ে ঘটে যাচ্ছে আবার নানা কাণ্ড। সম্প্রতি নিজেকে ‘ভারতের চৌকিদার’ দাবি করে নির্বাচনি প্রচার করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘এখন ভারতে আর্থিক জরুরি অবস্থা চলছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতে সুদিনের কথা বলেছিলেন। দেখা যাচ্ছে চৌকিদারই চোর।’ গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যমের হাতে থাকা রাফাল তথ্য এই মামলায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। তার প্রেক্ষিতেই রাহুল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রমাণ হয়ে গেলো ‘চৌকিদারই চোর’। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এখন রাহুল গান্ধীকে ‘চৌকিদারই চোর’-এর ব্যাখ্যা দিতে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

বিজেপি ঘেঁষা ভারতীয় কলামিস্টরা লিখছেন, বালাকোটে আক্রমণের পর হিন্দি বলয়ে নাকি মোদির জনপ্রিয়তার ঢেউ বইতে শুরু করেছে। তাদের কথায় মনে হয় হিন্দি বলয়ের মানুষের জয়-পরাজয়ের বোধই বুঝি চলে গেছে। আসলে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে হিন্দু জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলতে পারলে এসব ‘মিথ্যা’ এবং ‘প্রতিশ্রুতি’ জনগণ ভুলে যান। নিজের অজান্তে মোদি এখন সে কৌশলে আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোটামুটি হিন্দি বলয়ই নরেন্দ্র মোদিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ভোটারদের সহায়তা পেয়েছিলো। এবার তো সে একক সহায়তা মোদি পাচ্ছেন না।

মাত্র গত ডিসেম্বরে বিজেপি মধ্যপ্রদেশ আর ছত্তিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড় হচ্ছে হিন্দি বলয়ের রাজ্য। এ তিন রাজ্যে আসনসংখ্যা (৮০+২৯+১১) ১২০। মোদি যেখানে ২০১৪ সালের নির্বাচনে এ তিন রাজ্যে ১০৮ আসন পেয়েছিলেন সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে অর্ধেক আসন পান কিনা সন্দেহ। উত্তর প্রদেশে ১৯ শতাংশ মুসলিম ভোট। প্রথম ধাপের নির্বাচন সম্পর্কে যা জেনেছি মুসলিম ভোটারেরা নীরবে ভোট প্রদান করছে, মুখ খুলছে না।

গোমাংস রাখার মিথ্যা অজুহাতে এখলাসকে বিজেপির লোকেরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। তারা পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেবেন সেটা স্বাভাবিক। মায়াবতী, অখিলেশ যাদব এবং অজিত সিং-ঐক্যজোট গঠন করেছেন। কোনও অনৈক্য ছাড়া আসন ভাগাভাগি করেছে, সুতরাং উত্তর প্রদেশে এ তিন দলের জোট ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। আমার মনে হচ্ছে গোবলয়ে এবার বিজেপি অর্ধেক আসন পাবে না।

১৯৯৮ সাল থেকে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। ২০০৪ সালে তারা হিসাব নিকাশ করে দেখলো দেশের যথেষ্ট মঙ্গল করছে এবং দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে গেছে। তখন তারা লোকসভা ভেঙে দিয়ে ৬ মাস আগেই নির্বাচনের আয়োজন করেছিলো। সেবার তারা স্লোগান তুলেছিলো ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’। কংগ্রেসের প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের সঙ্গে বিজেপির এনডিএ’র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অটল বিহারীরা নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে পরবর্তী ১০ বছরই প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়েছিল। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি থাকলেও কিন্তু ‘বিদেশি’ সোচ্চার তুলে সে বছর সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন মনমোহন সিং।

২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদি কংগ্রেসকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। কিন্তু একটা প্রাচীন সংগঠনকে বিলুপ্ত করা কি এত সহজ। গত পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে তারা আবার একটা স্তরে উঠে এসেছে। মমতা তো কংগ্রেসকে আঞ্চলিক দলে রূপান্তর করারও অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন। এবার জোট হলো না মমতার কারণে। তিনি শরৎ পাওয়ারকে প্রস্তাব করেছিলেন কংগ্রেসকে বাইরে রেখে জোট গঠনের জন্য। শরৎ পাওয়ার তাকে বলেছেন, কংগ্রেস এবার ফেডারেল জোটের চেয়ে বেশি আসন পাবে।

কংগ্রেস কোনোখানে একগুঁয়েমি দেখাচ্ছে না। কর্ণাটকে কংগ্রেস বেশি আসন পাওয়ার পরও জনতা দল (দেবগৌড়ার) ছেলেকেই মুখ্যমন্ত্রী করেছেন। রাহুল গান্ধী এ কথা সুস্পষ্ট করে বলেছেন, কংগ্রেস জোট জয়ী হলেও প্রধানমন্ত্রীর পথ নিয়ে কোনও বাড়াবাড়ি করবে না। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির সঙ্গে এখনও জোট করার অপেক্ষায় তারা। তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা এবং বহুজন সমাজপার্টির মায়াবতীর কারণে নির্বাচনের পূর্বে জোট হলো না। কারণ তারা তাদের রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করতে রাজি নন। উত্তর প্রদেশে মায়াবতী ও অখিলেশ আর অজিত সিং জোট গঠন করেছে রাহুল যখন দুবাই সফরে ছিলেন। মায়াবতীর যুক্তি হলো কংগ্রেসকে ভোট দেয় উচ্চবর্ণের হিন্দুরা, তারা কখনও হরিজন নেতা মায়াবতী আর অখিলেশ যাদবের প্রার্থীদেরকে ভোট দেবে না। সুতরাং কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে লাভ কী?

আসলে এ ছোট দলগুলোও কেউ যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র নন, যখন যেমন তখন তেমনই তাদের স্বভাব। মায়াবতী, মমতা সবাই বিজেপির অংশীদার হতে অতীতে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি। হয়তো আগামীতেও অংশীদার হবেন। মাঝারিদের কারণে কখনও কোনও নীতি আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাদের কারণে কোনও বৃহৎ কল্যাণ ভেসে যাওয়া বিচিত্র নয়। এ মায়াবতী একবার মহাত্মা গান্ধীকে ‘শয়তানের বাচ্চা’ বলেছিলেন। অথচ গান্ধীর কারণে মায়াবতীদের উত্থান। দিল্লির দাঙ্গর মহল্লায় তাদের সাহস জোগাতে কত রজনী কাটিয়েছেন এ মাহাত্মা গান্ধী। এ মাঝারিরা বড়দেরকে কেটে সবসময় নিজেদের সমান করতে চায়।

এতদিন ধরে সবাই বলেছিলেন বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে। প্রথম ধাপ নির্বাচনের পর আরএসএস মহলকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছে। কিছু জরিপে বিজেপির রেটিং কমেছে। অনেকে বলছেন সম্ভবত বাতাস উল্টো বইতে শুরু করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধেও বহু অভিযোগ আছে, তবু ইহুদিরা এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ৩৫ সিটে জিতিয়ে দিয়েছে, আর ৩৫ সিটে জিতেছে বিরোধী লেবার পার্টি। অবশিষ্ট ৫০ আসন পেয়েছে ছোট ছোট দলগুলো। এখন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জোট করে সরকার গঠন করার চেষ্টা করছে এবং সফলও হবে, কারণ ছোট পার্টিগুলো রক্ষণশীল দল। তারা লেবার পার্টির সঙ্গে যাবে না। শত দুর্নীতির অভিযোগের পরও নেতানিয়াহু জিতেছেন, কারণ ইসরায়েলের অস্তিত্বের প্রশ্নে নেতানিয়াহুর ভূমিকা খুবই দৃঢ়, জেরুজালেম গোলান সবই গ্রাস করছে।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদির অনুরূপ দৃঢ় ভূমিকা কই? নেতানিয়াহু গণতন্ত্র বজায় রেখে সব করেছেন, কিন্তু নরেন্দ্র মোদির একাত্মবাদের মুখে গণতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়েছে। আর বৈচিত্র্যের মাঝে ভারত এতদিন যে ঐক্য গড়ে তুলেছিলো তাকে নসাৎ করে দিচ্ছে মোদি-অমিত শাহরা। যা শেষ পরিণতিতে ভারতের সংহতি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। এ উপমহাদেশে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারের জয়-পরাজয় নির্ভর করে সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার বিবেচনায়, আর এসব বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা ভারী।

একটা উদাহরণ টেনে লেখা শেষ করবো। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে হিমাচল প্রদেশ (৪ আসন) উত্তরাখণ্ড (৫) রাজস্থান (২৫) মধ্য প্রদেশ (২৯) ছত্তিশগড় (১১) গুজরাট (২৬) মহারাষ্ট্র (৪৮) ও ঝাড়খণ্ড (১৪)- এই ৮ রাজ্যের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৫১ আসনে জিতেছিলো নরেন্দ্র মোদির দল। এবার মধ্য প্রদেশ (২৯) ছত্তিশগড় (১১) রাজস্থান (২৫) এ গত ডিসেম্বর মাসের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হয়েছে। সপ্তদশ লোকসভায় ১৬২ আসনেই বিজেপি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন এবং অর্ধেক আসনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত।

উত্তর প্রদেশ (৮০), বিহার (৪০) ও কর্ণাটক (২৮), এ তিন রাজ্যে এখন বিরোধীদের শক্ত অবস্থান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি উত্তর প্রদেশে ৮০ আসনের মাঝে ৭৩ আসন পেয়েছিলো। এবার সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও ভারতীয় লোকদল জোট করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, সুতরাং তারা ভালো ফল প্রত্যাশা করতে পারে। কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী উত্তর প্রদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। ত্রিবেণী থেকে নৌযাত্রা করে বেনারসীতে পৌঁছেছেন তিন দিনে। গঙ্গার উভয় তীরে সভা সমাবেশ করে জাগিয়ে দিয়েছেন। হয়তো প্রিয়াঙ্কা বেনারস থেকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারেন। যদি প্রিয়াঙ্কা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন তবে মনে হয় দৃশ্যপট কিছুটা উলট-পালট হবে।

যা হোক, সব বিবেচনায় মোদির সরকার গঠন এত সহজ নয়, যদিও বেশিরভাগ ভারতীয় মিডিয়া তার ঢোল পেটাচ্ছে। মোদিবিরোধী শক্তি এবার ভারতে সরকার গঠন করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

x