ছাত্রলীগের কমিটি: ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’

প্রভাষ আমিন ১৭:৫০ , মে ১৪ , ২০১৯

প্রভাষ আমিনগত ৯ মে বাংলা ট্রিবিউনে ‘চার খলিফার ছাত্রলীগ’ শিরোনামে এই কলামের শেষে লিখেছিলাম, ‘কমিটি কবে হবে কেউ জানে না। রোজার মধ্যে নিশ্চয়ই হবে না। বিএনপির ঈদের পরে আন্দোলনের মতো ছাত্রলীগের কমিটিও নিশ্চয়ই ঈদের পরেই হবে।’ কিন্তু আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দু'দিন পরই আসে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ১১ মে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্বাক্ষর করেন। যদিও এই কমিটি ঘোষণা হয় ১৩ মে। কমিটি ঘোষণার পর ফেসবুকে লিখেছিলাম, ‘সম্মেলনের এক বছর পর ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেলো ছাত্রলীগ। বেটার লেট, দ্যান নেভার। যারা নতুন দায়িত্ব পেলেন, তারা যেন ছাত্রলীগের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তাদের কারও কথায় বা আচরণে যেন মানুষ কষ্ট না পায়, ছাত্রলীগের যেন আর বদনাম না হয়। নতুন কমিটির সবাইকে অভিনন্দন।’
কিন্তু আমার এই আকাঙ্ক্ষাও ভুল হয়েছে। ভুল হতে সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা। আমি ভেবেছিলাম, নতুন কমিটিকে ঘিরে সারাদেশে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

আমার এই ভাবনাও ভুল হয়েছে। বদলে যা হয়েছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য; রচিত হয়েছে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ফুল নয়, রক্তে ভেসেছে ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন। ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন একই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, সংগঠনের নারী নেত্রীরাও হামলা থেকে রেহাই পাননি। ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন পরিচিত নেত্রী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

মূল দল দশ বছর ধরে ক্ষমতায়। তাই ছাত্রলীগে পদপ্রত্যাশী নেতার সংখ্যাও বেশিই হওয়ার কথা। যোগ্য নেতারও কমতি নেই সংগঠনে। তাই কমিটি যাই হোক, পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ থাকবেই। ৩০১ সদস্য কেন, ৩০০১ সদস্য হলেও সবাইকে সন্তুষ্ট করা যেত না। তারপরও হয়তো যোগ্যদের কেউ কেউ বাইরে থেকে যাবেন। কিন্তু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তো ৩০১ সদস্যের বেশি কমিটি করার সুযোগ নেই। যদিও অতীতে এই সীমা মানা হয়নি। বর্তমান কমিটির একজন সহসভাপতির দাবি,সোহাগ-জাকিরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের আগের কমিটি অন্তত হাজার পাঁচেক ছাত্রকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত সাড়ে ৪ হাজার এবারও কমিটিতে আসার যোগ্য। তাই ৩০১ সদস্যের কমিটির পরও অন্তত ৪২০০ কেন্দ্রীয় নেতা নিজেদের বঞ্চিত ভাবতেই পারেন। এছাড়া আছেন বিভিন্ন হলপর্যায়ের নেতা। আর গত কয়েক বছরে যোগ্য হয়ে ওঠা নেতারা তো আছেনই। তাই ৩০১ সদস্যর কমিটিতে পদ পাওয়া নেতাদের উচ্ছ্বাসের চেয়ে, পদবঞ্চিত নেতাদের ক্ষোভ বেশি হবে; এটাই স্বাভাবিক। তারা সে ক্ষোভের প্রকাশও করতে পারেন।

কিন্তু ক্ষোভটা ন্যায্য হোক আর অন্যায্য; কমিটি তো ৩০১ সদস্যেরই হওয়া উচিত। ক্ষোভ নিয়ে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো ক্ষোভ দমনের স্টাইলে। পদবঞ্চিত নেতাদের সংবাদ সম্মেলনে ন্যক্কারজনক হামলা ছাত্রলীগের ইতিহাসেই সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের একটি হয়ে থাকবে। শুধু ছাত্রলীগ কেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেই ছাত্রীদের ওপর এমন হামলার নজির খুব বেশি নেই। ১৯৮৯ সালে ডাকসু নির্বাচনে পরাজয়ের পর ছাত্রদল বিজয়ী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রীদের মিছিলে হামলা চালিয়েছিল। সে হামলা তবু প্রতিপক্ষের ওপর। কিন্তু এবার একই সংগঠনের কর্মীদের হামলার শিকার হলেন ছাত্রলীগের নেত্রীরা। দু'দিন আগেও যারা মিছিলে পাশাপাশি ছিলেন, আজ তারাই সহিংস প্রতিপক্ষ। ছাত্রলীগের যেসব নেত্রী হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।

যে ছাত্রলীগের জন্য এতদিন লাঠি ধরলেন, আজ সেই ছাত্রলীগের লাঠিই তাদের মাথায়। প্রকৃতির প্রতিশোধ। ছাত্রলীগের বর্তমান সমস্যা বর্তমান কমিটির সঙ্গে আগের কমিটির। অনেক দিন ধরেই ছাত্রলীগের কমিটি একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো। এবারই প্রথম সিন্ডিকেটের বাইরে কমিটি হয়েছে। আর সিন্ডিকেটের সাথে দ্বন্দ্বের কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে দেরি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের বাইরেই কমিটি হয়েছে। পদবঞ্চিত এক নেতা জানালেন, গত কমিটির ৩২ সম্পাদকের মধ্যে অন্তত ২৪ জন এবারও কমিটিতে থাকার মতো যোগ্য ছিলেন। কিন্তু রাখা হয়েছে মাত্র ৪ জনকে। আগের কমিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে অযোগ্যতা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে এবার। সোমবার কমিটি ঘোষণার পর শুধু পদবঞ্চিতরাই নন, প্রত্যাশা অনুযায়ী পদ না পেয়েও ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকে। ক্ষোভ-বিক্ষোভ হতেই পারে। কিন্তু একপক্ষ আরেকপক্ষকে যে ভাষায় আক্রমণ করছেন, যে অভিযোগ আনছেন; তা অকল্পনীয়, রুচিহীন। ঝামেলার শুরু কিন্তু এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ থেকেই। সোমবার সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে বিক্ষুব্ধরা সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে বর্তমান কমিটির সমর্থকরা তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকিরকে ‘শিবির’ হিসেবে অভিহিত করেন। বিক্ষুব্ধরা পাল্টা বর্তমান কমিটিকে ‘শিবির’ বলে গালি দেন। এরপরই বর্তমান কমিটির সমর্থকরা হামলা চালান বিক্ষুব্ধদের ওপর। ভাবুন একবার, ছাত্রলীগ একপক্ষ আরেকপক্ষকে শিবির বলে গালি দিচ্ছে! গালিটা তো শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগের গায়েই পড়ছে। ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হলে মা তুলে গালি দেওয়ার মতো ব্যাপার। শুধু শিবির বলে গালি দেওয়া নয়।

দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি যা অভিযোগ করছে, সব একত্র করলে এবং তার অর্ধেকও সত্য হলে এই মুহূর্তে সব কমিটি বিলুপ্ত করে ছাত্রলীগের রাজনীতি স্থগিত রাখা উচিত। বিক্ষুব্ধরা ৩০১ সদস্যের বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগে নিষ্ক্রিয়, সাবেক চাকরিজীবী, বিবাহিত, অছাত্র, বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসা, যুদ্ধাপরাধীর সন্তান, বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কারসহ নানা অভিযোগ এনেছেন। ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও উঠেছে। বর্তমান কমিটি সাবেক কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে শিবির সম্পৃক্ততা, টাকার বিনিময়ে ঢালাও পদ বিতরণ, কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগ আনছে। ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বিবাহিত। তার কথিত স্ত্রীর নাম, ছবি, ঠিকানা, এমনকি শ্বশুরের নামও এখন ফেসবুকের পাতায় পাতায়। ছাত্রলীগ পদবঞ্চিত নারী নেত্রীদের ফেসবুক স্ট্যাটাস এখন ভাইরাল।  তারা ছাত্রীদের পদ পাওয়ার যেসব শর্তের কথা বলছেন, বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন; তা মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জেরিন দিয়ার স্ট্যাটাসে আনা অভিযোগ আলাদা করে তদন্তের দাবি রাখে। ছাত্রলীগের নতুন কমিটি যেন প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে, কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখা সব আবর্জনা এখন গন্ধ ছড়াচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, এসব অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সবই কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই আনছেন; হয় পদ পাওয়া অথবা না পাওয়া। অন্যরা সবাই মজা নিচ্ছেন। বিক্ষুব্ধরা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। বর্তমান কমিটি হামলা ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আমার ধারণা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বা শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ঝামেলা মিটে যাবে। হয়তো গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে আরও কিছু নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কো-অপ্ট করা হবে।

ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর তারাই হয়তো এসব দেখে লজ্জা পাবেন। কিন্তু তখন তো আর মুছে ফেলা যাবে না। পত্রিকার পাতা, অনলাইনের লিঙ্ক, ফেসবুকের স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে এখন সমালোচনার ঝড়। এসব লিঙ্ক তো বছরের পর বছর রেফারেন্স হবে। ছাত্ররাজনীতিটা যে সত্যি সত্যি পচে গেছে, এবার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সম্মিলিতভাবে তা বুঝিয়ে দিলেন। তবে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এই অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য আলাদা একটি কমিটি করা উচিত। অভিযোগগুলো সত্যি হলে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে। কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগ এনে থাকে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ অভিযোগগুলো গুরুতর।

ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়েছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে। কিন্তু কমিটির দায় পুরোটা তাদের নয়। আওয়ামী লগের চার কেন্দ্রীয় নেতা দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, দুই সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। নিশ্চয় কমিটি ঘোষণার আগে শেখ হাসিনাও দেখে দিয়েছেন। কমিটিতে যারা আছেন, তারা নিশ্চয়ই যোগ্য। যারা বিক্ষুব্ধ তারাও অযোগ্য নন নিশ্চয়। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর যে প্রতিক্রিয়া, সেটা নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছিলেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাই তারা অপেক্ষা করছিলেন। সম্মেলনের এক বছর পরও কমিটি হয়নি। এখন তো মনে হচ্ছে, এই কমিটি হওয়ার চেয়ে না হওয়াই ভালো ছিল। ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

x