বিশ্ববিদ্যালয় কি কারাগার?

প্রভাষ আমিন ১৭:০৭ , জুন ০৮ , ২০১৯

প্রভাষ আমিনকৃষক ধানের দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। মজুরের অভাবে ক্ষেতেই ফেলে রাখছেন ধান। সেই ধানে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছেন তারা।  কৃষকের এই বেদনা ছুঁয়ে গেছে শহরের মানুষদেরও। বিভিন্ন সংগঠন ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। বিভিন্ন ছাত্র ও কৃষক সংগঠনও কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের সবচেয়ে সচেতন অংশ। যেকোনও অন্যায়ে তারা প্রতিবাদ করেন সবার আগে। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে গত ১৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে তারা বিভিন্ন স্লোগানসহ প্ল্যাকার্ড বহন করে। এই প্ল্যাকার্ডের স্লোগানেই আগুন জ্বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাথায়। মানববন্ধনের অন্তত ১৫ দিন পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শাতে বলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. নুরউদ্দিন আহমেদের স্বাক্ষর করা কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করার অভিপ্রায়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সরকার ও প্রশাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন বহন ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং অত্যুৎসাহী হয়ে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করার আগেই আন্দোলনের সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী একটি গর্হিত কাজ।’

ছাত্ররা প্ল্যাকার্ডে কী এমন স্লোগান লিখেছিল, যাতে প্রশাসনের আঁতে এমন ঘা লাগলো। খুঁজে খুঁজে যে কটা স্লোগান পেলাম, তা হলো—‘আর করবো না ধান চাষ দেখবো এবার কী খাস’, ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ’, ‘পাকা ধানে আগুন কেন’, ‘কৃষক মরে হীরক রাজার টনক কি নড়ে’, ‘পাকা ধানে আগুন কেন’, ‘ফসল জ্বললে জ্বলবে গদি’, ‘ফসল জ্বলে জ্বলুক রাজা তবু বাঁচুক’, ‘কৃষকের করের টাকায় চলে বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ফসল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনুন’, ‘ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত কর’, ‘প্রকৃতিতে যদি অভাব না থাকে কৃষক তবু গরিব কেন’, ‘বকেয়া মজুরি না পাজেরো’, ‘কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ’।

এই স্লোগানগুলোর কোনটা আপনার কাছে সরকারবিরোধী বা প্রশাসনবিরোধী বা উসকানিমূলক মনে হয়েছে? আমার কাছে তো একটাও মনে হয়নি। বছরের পর বছর ধান চাষ করে তারা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না, তারা তো ক্ষুব্ধ হবেনই। মমতা নিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। তাদের বাঁচার উপায় করে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কি মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছেন? তিনি কি জানেন না আওয়ামী লীগ জীবনে কত কোটিবার গদিতে আগুন লাগানোর স্লোগান দিয়েছে? আওয়ামী লীগ নিজেরা যে স্লোগান দিতে পারবে, তাদের বিরুদ্ধে অন্য কেউ তা পারবে না, দেশে এমন কোনও আইন হয়েছে নাকি? সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটিশের ভাষায় ছাত্রদের আরেকটি অপরাধ ছিল ‘অত্যুৎসাহী হয়ে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করার আগেই আন্দোলনের সঙ্গে আপনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী একটি গর্হিত কাজ’। কী অদ্ভুত! কোনও শিক্ষিত লোক, যিনি নাকি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, তিনি কী করে এমন হাস্যকর যুক্তিতে শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শাতে বলতে পারেন।  অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিতি করার দাবিতে মাঠে নেমেছেন, এতে তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের খুশি হওয়ার কথা। তাদের শিক্ষার্থীরা সবার আগে ইস্যুটি ধরতে পেরেছে, কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে; এটা তো অভিনন্দনযোগ্য। তা না করে তিনি এসেছেন তাদের কারণ দর্শাতে! শিক্ষার্থীরা যা করেছেন, সেটা যদি অপরাধ হয়, তাহলে সবার আগে করলেও অপরাধ, পরে করলেও অপরাধ। কারণ, দর্শানো নোটিশ পড়ে মনে হচ্ছে, অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবাদ করার পর মাঠে নামলে কোনও অপরাধ ছিল না। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার তো কোনও কিছু সময় দিয়ে বিবেচনা করবেন না, ঘটনা ন্যায্য না অন্যায্য সেটাই তার বিবেচ্য হওয়ার কথা। সেটা নিশ্চয়ই তার বিবেক দিয়ে করবেন। সরকারপন্থী অবস্থান দিয়ে নয়।

আমি ভেবেছিলাম, রেজিস্ট্রার হয়তো ভুলে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়ে ফেলেছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হয়তো এই নোটিশের ভুলটা বুঝতে পারবেন। কিন্তু পরে দেখলাম ঊর্ধ্বতনদের সমস্যা আরও বেশি। প্রক্টর আশিকুজ্জামান ভুইয়ার কণ্ঠেও রেজিস্ট্রারের খোঁড়া যুক্তির প্রতিধ্বনি। বরং তারা যেন আরেক ডিগ্রি সরেস। প্রক্টর বলেছেন, ‘‘আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন ‘ফসল জ্বললে, গদি জ্বলবে’, এটা প্রধানমন্ত্রীকেই নির্দেশ করে। এই আন্দোলন বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয়নি।  বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারবিরোধী আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’ আর উপাচার্যের বক্তব্য শুনলে তো আপনি রীতিমত ভিরমি খাবেন। উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গরিব ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করছি। আমাদের কোনও শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করি না। এ কারণেই ১৪ জনকেই শোকজ করা হয়েছে।’ কিছু বুঝলেন? মনে হচ্ছে, আপার চেম্বার যত খালি, পদ তত বড়।

দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারের মতো পদে আছেন, তার মানে ধরে নিতে পারি তাদের কাছে যথেষ্ট সার্টিফিকেট আছে। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় তাদের অর্জনও নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, জীবনের শিক্ষাটা তারা পাননি, অন্তত কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার মতো যোগ্যতা তাদের নেই।

ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার মতো বিবেক তাদের নেই। দলীয় আনুগত্যে তারা অন্ধ হয়ে গেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বড় পদে নিয়োগ পেয়েছেন, মানেই তারা সরকারি দলের সমর্থক। কিন্তু সরকারি দলের সমর্থক হলেই অন্ধ হয়ে যেতে হবে? নিজের বিবেককে বাসায় তালা মেরে রেখে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে নিজেদের মর্যাদা আর অবস্থানটা ভুলে যেতে হবে? এই তিন শিক্ষককে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, সরকার বিরোধিতা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরোধিতা করা অপরাধ নয়। শুধু রাষ্ট্র বিরোধিতাই অপরাধ বলে বিবেচ্য হতে পারে। আর সরকারবিরোধিতা ও রাষ্ট্রবিরোধিতার পার্থক্যটা আশা করি তারা বুঝবেন। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, ক্ষোভ প্রকাশ করার অধিকার আছে, সরকার বিরোধিতার অধিকার আছে। যতক্ষণ না তারা বেআইনি কিছু করছেন, আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন, সত্যি সত্যি কোনও কিছুতে আগুন লাগিয়ে না দিচ্ছেন; ততক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছুই করার নেই। এই তিন শিক্ষক যেহেতু আওয়ামী লীগের সমর্থক, সেহেতু তারা কিছুটা হলেও বঙ্গবন্ধুর জীবন সম্পর্কে জানেন। হয়তো ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়েছেনও। তারা কি ভুলে গেছেন, বঙ্গবন্ধু সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছিল। তখনও নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের মতো দলীয় আনুগত্যে অন্ধ কোনও শিক্ষক ছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন।

সবচেয়ে হাস্যকর উপাচার্যের যুক্তি। যেন গরিব শিক্ষার্থীদের অর্থ সাহায্য করে তিনি তাদের বিবেক কিনে নিয়েছেন। নিজেদের বিবেক বন্ধক রেখেছেন বলে, শিক্ষার্থীদেরও আপনাদের মতো মেরুদণ্ডহীন, প্রতিবাদহীন জড় পদার্থ বানিয়ে রাখতে চাইবেন, এটা অন্যায়।

শিক্ষার্থীরা আপনাদের মতো এতটা বিবেকহীন নাও হতে পারে। আপনাদের যৌবন পেছনে ফেলে এসেছেন, তাই আপনারা জানেন না বা আপনারা ভুলে গেছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা জানেন, ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার।’

ন্যায্য দাবিতে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা কোনও অপরাধ করেননি। বরং তাদের কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্যায় করেছে। তাই কোনও কারণ দর্শানো ছাড়াই গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে কারাগার ঘোষণার দাবি করছি। উপাচার্যের পদ হবে আইজি প্রিজন, আর প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারের পদ হবে ডিআইজি প্রিজন। ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেওয়ায় যেখানে শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, সেটিকে আর বিশ্ববিদ্যালয় বলার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই হলো মুক্তচিন্তা, মুক্তমতের বিকাশ, জ্ঞানের চর্চা, গবেষণা।  কিন্তু যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, যেখানে ন্যায্যতার পক্ষে বলা অপরাধ; সেটি তো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কারাগারই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এমএনএইচ/এমওএফ/

x