বড় দেশগুলোর নতুন সমীকরণ

আনিস আলমগীর ১৭:৫২ , জুন ১১ , ২০১৯

আনিস আলমগীরবিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলো বন্ধুত্বের পুরনো পথ ধরে এগিয়ে চলছে। ‘ডি-ডে’র ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৬ জুন নরম্যান্ডিতে বড়সড় অনুষ্ঠান ছিল। নরম্যান্ডি হলো ফ্রান্সের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপারেশন ওভারলর্ডের আওতায় ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রপক্ষের নরম্যান্ডি আক্রমণের সময় অবতরণ অপারেশনকে মূলত ‘ডি-ডে’ বোঝায়। এর লক্ষ্য ছিল, জার্মানির দখলদারিত্ব থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করা। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উভচর আক্রমণ ছিল এটি। তখন ফ্রান্সের সিংহভাগ ভূমি নাৎসিদের দখলে, অর্থাৎ জার্মানির কব্জায়। মিত্রশক্তির সিদ্ধান্ত ছিল– নরম্যান্ডিতে মিত্রবাহিনী অবতরণ করবে ও ফ্রান্সকে মুক্ত করে জার্মানির দিকে অগ্রসর হবে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করা হয়। এর প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন মার্কিন জেনারেল আইসেনহাওয়ার। তার ডেপুটি প্রধান নিযুক্ত হন ব্রিটিশ জেনারেল মন্টগোমারি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির অন্যতম অংশীদার ছিল সোভিয়েত রাশিয়া। পার্ল হারবার আক্রমণের পর যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল আমেরিকা। অথচ ‘ডি-ডে’র ৭৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এখানে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ৬ জুন নরম্যান্ডিতে অনুষ্ঠান চলাকালে পুতিন মস্কোতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।

নরম্যান্ডির অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে মিথ্যাচার করেছেন। তার কথামতো, নরম্যান্ডির অভিযান নাকি জার্মানির পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। মূলত নরম্যান্ডি অভিযানের সমরনায়ক ছিলেন জেনারেল আইসেনহাওয়ার। রাশিয়া ছাড়া সমগ্র ইউরোপই ছিল তার অধীনে। নরম্যান্ডি অভিযান সফল হওয়ার পর প্যারিসকে মুক্ত করে তারা যখন জার্মানির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল মন্টগোমারি ব্রিটিশ বাহিনীর কৃতিত্ব দেখাতে তড়িঘড়ি জার্মানিতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান সেনানায়ক জেনারেল আইসেনহাওয়ার তাকে অনুমতি দেননি। কারণ তিনি জানতেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনী দীর্ঘ সময় জার্মান সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। জেনারেল আইসেনহাওয়ার জার্মানির সর্বোচ্চ আটান্ন ডিভিশন সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু রাশিয়া ৩০০ জার্মান ডিভিশনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করেছে ও জার্মানির হাতে আড়াই লাখ রুশ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। সুতরাং বার্লিন জয়ের কৃতিত্ব রাশিয়ারই পাওয়া উচিত। সর্বোপরি রাশিয়ার সেনারা তখন বার্লিনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

রণক্ষেত্রে আইসেনহাওয়ার যে সৌজন্যবোধ দেখালেন; ব্রিটেন, আমেরিকা, ফ্রান্স যুদ্ধ শেষে ৭৫ বছর পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে নরম্যান্ডিতে দাওয়াত না দিয়ে চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলো। অথচ রাশিয়া, চীন সবাই এখন বাজার অর্থনীতির দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি, সে কথা কি ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে? আসলে সমাজতান্ত্রিক ব্লকের সঙ্গে যে বৈরিতা তাদের ছিল, তা থেকে বিস্মৃত হতে পারেনি তারা। সেই ধারা বজায় রাখতে তারা সম্ভবত বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতে মনে হয় তা অব্যাহত রেখেই সমীকরণটা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালেই আণবিক শক্তির অধিকারী হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষপ্রান্তে এসে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর আণবিক বোমা বর্ষণ করে ধ্বংসলীলার ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেশটি। একইসঙ্গে জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের প্রতিশোধও নেওয়া হয়। ১৯৫২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার আণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। তখনই ইউরোপের নন-কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ন্যাটো জোট গঠন করে আমেরিকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো নিয়ে ওয়ারশো জোট গঠন করে। দুটি জোটের পাল্টাপাল্টি অবস্থান বহুদিন অব্যাহত ছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পতনের পর ওয়ারশো বিলুপ্ত হয়।

ন্যাটো জোট এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে অর্থ জোগান নিয়ে জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, ‘পাহারাও দেবো, অর্থ জোগানও দেবো, তা হবে না।; ন্যাটোর ঐক্য ও শক্তি আগের মতো অব্যাহত নেই। রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পর রুশ শক্তি-সামর্থ্য টিকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিন ক্ষমতায় আসার পর রাশিয়া পুনর্গঠিত হয়ে আগের ভালো অবস্থানে ফিরে এসেছে। ক্রিমিয়া দিয়ে দেশটির শক্তির পরীক্ষা শুরু। এখন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সক্রিয় উপস্থিতি আমেরিকার অবস্থানকে অকার্যকর করে ফেলেছে। ওবামা পরিপূর্ণভাবে চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প আমেরিকার আংশিক উপস্থিতি বজায় রেখেছেন। তবে ইসরাইলের অনেক কাজ করে দিচ্ছেন ট্রাম্প, যাতে ইসরাইলকে দিয়ে নিজের বকলমে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ চালানো যায়।

চীনের সঙ্গে এখন মার্কিনিদের বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে। আগামী ১৩ জুন কিরগিজস্তানের রাজধানীতে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গনাইজেশনের সম্মেলন রয়েছে। এর ফাঁকে রাশিয়া, চীন ও ভারতের নেতারা বৈঠক করবেন। এর মূল উদ্দেশ্য ‘নয়া বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা।

বাণিজ্যের ওপর কর আরোপের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব উৎসাহী। এতে কোনও রাষ্ট্র দ্বিমত পোষণ করলে তার ওপর নেমে আসে বাণিজ্য অবরোধের খড়্গ। এটি বেশ দুর্বল করে ফেলেছে রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে। গত শতাব্দীর চার দশকের দিকে বিশ্ব বাণিজ্যের বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ডলারকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এখনও বিশ্ব বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ বিনিময় হয় ডলারে। সুতরাং এখন বাণিজ্য অবরোধের একটা হাতিয়ার মার্কিনিদের হাতে রয়েছে। তখন শক্তিশালী কোনও মুদ্রা ছিল না বলে ডলারকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এখন চীনা মুদ্রা ইয়ান বেশ শক্তিশালী। সুতরাং বড় রাষ্ট্রগুলোকে ডলারের সঙ্গে ইয়ানকে সমান্তরালভাবে বিনিময় মুদ্রার স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। তা না হলে আমেরিকার অনাচারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি (জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) সুবিধা থেকে ভারতকে বাদ দিয়েছেন ট্রাম্প। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের বাণিজ্য। সর্বোপরি ভারত নরেন্দ্র মোদির প্রথম পাঁচ বছর দৃঢ়ভাবে আমেরিকার পক্ষাবলম্বন করে কোনও সুবিধাই পায়নি। সম্ভবত এখন খোলামেলা ভূমিকা রাখার বিষয়ে ভারত মনস্থির করেছে। সেটাই উত্তম হবে।

ট্রাম্পের বাড়াবাড়িতে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি প্রায় বিকল। চীনের দয়ার ওপর বেঁচে আছে তারা। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসলে বাণিজ্য অবরোধ শিথিল হওয়ার কথা ছিল। সিঙ্গাপুরের বৈঠকের পর উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং-উন কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্টেশন ধ্বংসও করেছেন। কিন্তু আমেরিকা বাণিজ্য অবরোধ তুলে নেওয়া দূরের কথা, শিথিলও করেনি। ট্রাম্পের সঙ্গে উনের আবারও বৈঠক হয় ভিয়েতনামে। আমেরিকা এখন বলছে, উত্তর কোরিয়াকে তার পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করতে হবে। উন সম্মত হননি। পরিপূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া এমন প্রস্তাবে তো কেউ সম্মত হতে পারে না।

গত মে মাসে মস্কো গিয়েছিলেন কিম জং-উন। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মস্কো সফর করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছেন– ইরানবিরোধী মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানি না। সম্ভবত রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার মাঝে একটা সমীকরণ হচ্ছে। এখানে ইরান এসে যোগ দিলে বিচিত্র মনে হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত

anisalamgir@gmail.com

 

 

/এমএমজে/জেএইচ/

x