‘হুক্কাহুয়া’র দেশে সবাই একা

শেগুফতা শারমিন ১৮:৩৬ , জুন ১২ , ২০১৯

শেগুফতা শারমিনএই ‘হুক্কাহুয়া’র সমাজে বহুদিন ধরে একলা লাগে। না দিতে পারি ‘হুক্কা’, না পারি চোখ বন্ধ করে ‘হুয়া’ বলতে। ফলে এ দলেও পড়ি না, ও দলেও যাই না। যুক্তিতর্ক, সত্যমিথ্যার ধার না ধেরে ‘হুক্কা’ দেওয়াদের লম্ফ দেখি ঝম্ফ দেখি। নিরাপদ দূরত্বে বসে বুঝতে চেষ্টা করি, ‘হুক্কা’র উদ্দেশ্য। সে কাজে ব্যাঘাত ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসা লক্ষ লক্ষ ‘হুয়া’। উদ্দেশ্য বিধেয় সব মিলেমিশে একাকার ততক্ষণে। নিশ্চিত, বিশেষ উদ্দেশ্যে যে ‘হুক্কা’ হাঁক দিয়েছিল, সেও আর ততক্ষণে খুঁজে পায় না কেনই বা কোনও কুক্ষণে বা সুক্ষণে এই আওয়াজ তুলেছিল। মাঝখান দিয়ে লাভ হয় কার? আমার বা আপনার তো নিশ্চিতভাবেই না।
লাভ হয় কেবল নিশ্চয়ই পর্দার আড়ালে লাঠি হাতে বসে থাকা পুতুল নাচের কোনও অদৃশ্য কারিগরের। কারণ শত কণ্ঠের এত আওয়াজ আসলে আমাদের সবাইকে ভীষণ একলা করে দেয়। বহু দূরে ঠেলে দেয়। এত আওয়াজের ভিড়েও আসলে আমরা কেউ আর কারও থাকি না। আরও পরিষ্কার হয়ে এটা ধরা পড়ে এক ‘হুক্কাহুয়া’ শেষ হয়ে আরেক হুক্কাহুয়া এলে। আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি আগেরবার যে আমার পাশে ছিল। এবার সে সম্পূর্ণ ভিন্নপক্ষ। তার সঙ্গে আমার মেলে না। খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। ধরেই নেই ও আমার লোক না। অতএব দু’জনার দু’টি পথ দুটি দিকে যায় বেঁকে। পরিণামে তুমি একলা, আমিও একলা।

এই দেশে এখন শিল্প থেকে সংস্কৃতি, খাদ্য থেকে পোশাক, খেলাধুলা থেকে বিনোদন সবকিছুতে রাজনীতির ছায়া। দল ‘এক্স’-এর সমর্থক যারা তারা যা পড়বেন, যা শুনবেন, যা দেখবেন তাই সঠিক। এর বাইরে কেউ যদি অন্যটা পড়ে, অন্যটা শোনে, অন্যটা দেখে তাহলে সে বেঠিক। বেঠিক মানে এক্সতো নয়ই, ‘এ-বি-সি-ডি’ কোনও কিছইু নয়। ধরে নেওয়া হবে সে ‘ওয়াই’ বা ‘জেড’। তা হোক না যতই ভালো গান, ভালো কবিতা, ভালো উপন্যাস, বিচার হবে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। শুধু ভালো বলে তাকে ভালো বলা যাবে না। বলতে হবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে। হয়তো দু’জনের পছন্দ-অপছন্দ সব কিছু মিলে। দীর্ঘদিনের পরস্পর পিঠ চাপড়ানো সম্পর্ক। কোথাও কোনও সমস্যা নেই। সমস্যা করে দিল কোনও প্রয়াত কবি বা শিল্পী। একজনের রাজনৈতিক দর্শনে সেই কবি বা শিল্পী গর্হিত। আরেকজনের রাজনৈতিক চশমা নাই। শুধু পড়তে ভালো বলেই ভালো লাগে সেই কবির কবিতা, শুনতে ভালো লাগে বলেই ভালো লাগে কোনও শিল্পীর গান। কিন্তু এটা তো এ যুগে পাপ। সুতরাং ভাগ হও। দেয়াল উঠুক যোগাযোগে।

ভাগ হতে হতে আমরা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়েও দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ি। বিগত ৭৯ বছরের তার সব কর্ম, সব বাণী বিফলে চলে যায় একটা তিন মিনিটের ভিডিও ক্লিপে। পরিষ্কার বাংলায় বললেও যে ক্লিপের ভাষা বুঝতে আমরা অক্ষম। নিজেদের তীব্র অনুভূতিশীল দাবি করলেও যে ক্লিপের আবেগ বুঝতে আমরা অসমর্থ। কোথায় কে ‘হুয়া’ তুলে দিলো। তাই নিয়ে ‘হুক্কা’ করতে করতে ওনাকে টেনে নামানোর সংগ্রামে শামিল হলাম আমরা। টানতে গিয়ে যে ভাষা, যে শব্দ, যে কটূক্তি আমরা ব্যবহার করছি, তাতে প্রমাণ হচ্ছে, কত নিচ আমরা। কত শত হাজার মিটার গভীর অন্ধকারে পড়ে আছে এদেশের জনমানুষের একটা বড় অংশ। অতটা নিচে না থাকলে, না নামলে একজন বর্ষীয়ান শিক্ষক যিনি কিনা কারও বাড়া ভাতে ছাই দেননি, পাকা ধানে মই দেননি, কেবল তীব্র আবেগে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিকদের জন্য বলেছেন ‘আহারে’, তার প্রতি এতটা নোংরা শব্দবাণ ছাড়তে পারি। যারা এই কাজটি পারেন, তালে তালে ‘হুয়া’ করতে পারেন। তারা আসলে শুধু এটুকুই করতে পারেন। তারা কোনোদিন এই মধ্যপ্রাচ্যফেরত শ্রমিকদের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারেন না। প্রতিবার এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন পার হয়ে আসতে-যেতে তাদের যে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়ে। যে বাক্য রাশি শুনতে হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তারা কখনও তা বন্ধ করতে পারবেন না। প্রায় প্রতিদিন নির্যাতিত হয়ে রক্তাক্ত যারা দেশে ফেরে, ওনারা কোনোদিন তাদের নির্যাতন বন্ধ করতে পারবে না। প্রবাসীর হাড় মাংস রক্ত পানি করা রেমিটেন্স যারা বিদেশে পাচার করে তাদের টিকিটাও তারা কোনোদিন ধরে দেখতে পারবেন না।

এনারা শুধু পারেন, আস্ফালন। ছোট বড়  ভেদ নেই। সম্মান-অসম্মানের বালাই নেই। পেলাম এক সুযোগ। দুটো কথা বলার, বাণী  দেওয়ার। দিয়ে নিলাম। ডিআইজি মিজান, দু’দক বাছিরের বা ওসি মোয়াজ্জেমের পর্বত প্রমাণ অপরাধ চাপা পড়ে যায়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের খড়ের গাদায় এক সোনামুখী সুঁচ খোঁজার প্রাণান্ত চেষ্টায়। এই সুযোগ আমরা নেই। আর আমাদের হুয়াবাজির সুযোগে কতলোকের ধরনী দ্বিখন্ডিত হয়ে পাপ তাপ শুষে নেয়। টের পাই না। যেমন টের পাই না, এই সুযোগ সন্ধানীর সমাজে কে আপন কে পর। টের পাই না, কীভাবে আমরা একলা হয়ে যাচ্ছি দিনের পর দিন।

আর কে না জানে,একলা পেলেই কাউকে সহজে হারানো যায়, সহজে জিতে যায় অন্য পক্ষ। জিতে যায় সে,যার হাতে লাঠি, পর্দার আড়ালে যে পুতুল নাচের কারিগর।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

x