প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন আর নিষ্ক্রিয় দর্শকদের মনস্তত্ত্ব

ডা. জাহেদ উর রহমান ১৫:৩৭ , জুলাই ১১ , ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানবরগুনায় রিফাত হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলের চারপাশে অনেক মানুষ থাকার পরও কেন তারা খুনিদের বাধা দিতে এগিয়ে যায়নি, সেই আলোচনা আমাদের সামাজিক এবং মূল ধারার মিডিয়ায় খুব জোরেশোরে চলছে। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, একটা দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে যতো বেশি মানুষ (বাইস্ট্যান্ডার) থাকে, ভিকটিমের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ততো কমে যায়। শুনতে খুবই অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্যি। এ প্রসঙ্গ নিয়েই আজকের মূল লেখা, তবে তার আগে অন্য কিছু কথা বলে নেওয়া যাক।
বরগুনায় রিফাতকে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে কুপিয়ে খুন করে ফেলার ঘটনাটিকে নানা আঙ্গিক থেকে দেখে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
আমরা এভাবে এটাকে বিশ্লেষণ করতে পারি, প্রতিনিয়ত বীভৎস সব অপরাধের খবর পেতে পেতে ভোঁতা হয়ে যাওয়া আমাদের মনকে এখন জাগাতে হলে ‘সেন্সরি স্টিমুলাস’ লাগে। পিটিয়ে মেরে ফেলার ইতিহাস আমাদের দেশে নতুন না; ওসব খবর আমাদের গা-সওয়া। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে রাজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ভিডিও আমাদের সামনে আসে, নিজ চোখে বীভৎসতা দেখে আমরা ফেসবুকে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলাম। তেমনি ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’র নামে যে মানুষকে আসলে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়, এটাও মানুষ জানতো। কিন্তু বছরখানেক আগে কক্সবাজারের একরামুল হত্যার একটা অডিও আমাদের সামনে আসার পর আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অন্তত ফেসবুকে বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছিলাম। প্রশ্ন আসতেই পারে, বারবার দেখে যখন নানা অপরাধের বীভৎসতাও আমাদের আর যথেষ্ট উদ্দীপ্ত করতে পারবে না, তখন আমাদের কেমন স্টিমুলাস লাগবে জেগে উঠতে? নাকি সেদিনই আমাদের জেগে ওঠার শেষ?

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এটাও আলোচনা হতে পারে—আমাদের সমাজটা এখনও কতটা মিসোজিনিক (নারী বিদ্বেষী)। রিফাতের স্ত্রী মিন্নি আগে অভিযুক্ত খুনি নয়নকে বিয়ে করে তাকে প্রতারণা করে রিফাতকে বিয়ে করেছে—এই অভিযোগে অনেকেই রিফাত খুনের বিচারের আগে তার বিচার চাইছে। আলোচনার খাতিরে যদি ধরেই নিলাম, মিন্নি সত্যিই একজন প্রতারক, কিন্তু এমন একটা বীভৎস খুনের সঙ্গে তার বিচার চাওয়াটা প্রমাণ করে সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যার মানুষের মধ্যে এখনও নারীকে সবকিছুর জন্য দায়ী করে এক ধরনের ‘উইচ হান্টিং’-এর চেষ্টা দেখা যায়।

এই ঘটনা এটাও আবার আমাদের সামনে প্রমাণ করলো, এই দেশে এখন সামাজিক মাধ্যমে ভীষণ শোরগোল না হলে কোনও অপরাধ নিয়ে দেশের প্রশাসন যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা নেয় না। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নির্দেশ এবং তদারকি দূরেই থাকুক। রিফাতকে হত্যার দিনেই একজনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত এক মাসে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ২২টি। সেগুলো নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনও তৎপরতা নেই। অবিশ্বাস্যভাবে আমাদের সর্বোচ্চ আদালত এখন এই ধরনের সেন্সেশনালিজমে আক্রান্ত। ঘটনা সেরকম ভাইরাল হলেই উচ্চ আদালত নানা রকম স্বতঃপ্রণোদিত রুল দেন।

এবার আসা যাক আমার মূল বিষয়ে। প্রথমত ভিডিওতে আমরা ঘটনার আশপাশে যাদের দেখতে পাই, তারা হত্যাকারীদের সঙ্গের কেউ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এটা রিফাতের স্ত্রী মিন্নির বক্তব্যে ধারণা করা যায়। কিন্তু আলোচনার সুবিধার্থে ধরে নেই এরা খুনিদের পক্ষের মানুষ না, সাধারণ জনগণ। যৌক্তিক প্রশ্ন আসতেই পারে, আরও বহু মানুষও আশপাশে ছিল, কিন্তু তারা কেন এগিয়ে যায়নি?

১৩ মার্চ ১৯৬৪, নিউইয়র্ক শহরে কিটি জেনোভিস নামে এক তরুণী দিনের বেলায় বাড়ির বাইরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তদন্তে দেখা যায়, ওই তরুণী যখন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন খুব কাছাকাছি অন্তত ৩৮ জন মানুষ তার চিৎকার শুনে ঘটনা দেখেছেন। তাদের কেউ সেই ঘটনায় বাধা দেওয়া দূরেই থাকুক, পুলিশকেও ফোন করেনি। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা নিয়ে মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেন।

এরকম একটা গবেষণায় দেখা যায়, কোনও সিচুয়েশনে কারও যদি কোনও জরুরি সাহায্য (অসুস্থতা কিংবা হামলার মুখোমুখি) প্রয়োজন হয়, তাহলে সেখানে যদি একজন মানুষ উপস্থিত থাকে, তাহলে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ। সেখানে দু’জন মানুষ উপস্থিত থাকলেই এই সম্ভাবনা ৬২ শতাংশে নেমে আসে। আর পাঁচ জন থাকলে এটা মাত্র ৩১ শতাংশ হয়। এই সংখ্যা যত বাড়বে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমবে।

হ্যাঁ, এটাই সামাজিক মনোবিজ্ঞানে ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ বা ‘বাইস্ট্যান্ডার এপাথি’ বা ‘জেনোভিস সিনড্রোম’ বলে বিখ্যাত। কেন এটা ঘটে তার অনেক কারণ আছে। কোনও ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন একজন থাকুক বা অনেক মানুষ থাকুক, বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য না করতে চাওয়ার পেছনে কতকগুলো কারণ কমনলি থাকেই—যেমন ঝামেলায় না জড়ানোর ইচ্ছা, নিজে বিপদে পড়ার ভয় ইত্যাদি।

কোনও জরুরি ঘটনা ঘটার স্থলে যখনই বেশি মানুষ থাকে, তখন ভিকটিমের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় যে কারণে, সেটাকে বলা হয় ‘ডিফিউশন অব রেসপনসিবিলিটি’। কোনও জরুরি ঘটনাস্থলে আমরা একা থাকলে সেখানে কোনও কিছু করা আমাদের নিজস্ব দায়িত্ববোধ বলে আমরা মনে করি। কিন্তু সংখ্যা যখন বাড়তে থাকে, তখন আমরা আমাদের অবচেতনে মনে করি এই কাজটা তো পাশের কেউই করতে পারে বা করবে। এভাবেই আমরা দায়িত্ববোধ থেকে সরে যেতে থাকি। এই সংখ্যাটা যত বড় হবে একজন ভিকটিমের প্রতি দায়িত্ব আমরা ততো কম বোধ করি। যার ফল হয় ভিকটিম সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কমে যায়।

এটা হলো মানুষের স্বাভাবিক কতকগুলো চরিত্রগত ব্যাপার। এটা সব দেশের সব সংস্কৃতির মানুষের মধ্যেই আছে; আমাদের দেশের মানুষেরও আছে। কিন্তু এই দেশে থেকে থেকে এই দেশের মানুষের মধ্যে আরও কতকগুলো চিন্তা ঢুকে গেছে, যেটা বাংলাদেশের বাইস্ট্যান্ডারদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

ধরুন আমরা কেউ যদি দেখি প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় কেউ কাউকে কুপিয়ে খুন করে ফেলছে, তাহলে খুনিকে না চিনলেও আমাদের অবচেতনে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে উঠবে, এ নিশ্চয়ই সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত খুব প্রভাবশালী কেউ। আমাদের অবচেতন আমাদের নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দেবে কথ্য প্রবচনটা—‘পাঁঠা কোঁদে খুঁটার জোরে’।

এই হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও আমরা ‘খুঁটার জোর’-এর প্রমাণ পেতে শুরু করেছি। পত্রিকায় দেখেছি রিফাত খুনের পর সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পার হলেও পুলিশ কোনও অ্যাকশন নেয়নি। ঘটনাটা সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ অ্যাকশন নিতে শুরু করেছে। পুলিশ কেন অ্যাকশন নিতে যায়নি, সেটার জবাব আমরা পেয়ে যাই পত্রিকাতে—বরগুনা জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সহসভাপতি দু’জনেই রিফাতের খুনিদের বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা করছেন। সুতরাং ওই এলাকায় থাকা মানুষরা খুব ভালোভাবেই জানে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রিফাতকে বাঁচাতে গিয়ে সফল হলেও সেই খুনিদের ‘খুন বঞ্চিত’ করার মাশুল কী হতে পারে।

প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করে ফেলা বিশ্বজিতের সরকারি দলের প্রভাবশালী হত্যাকারীরা মৃত্যুদণ্ডের বাইরে থেকে বহাল তবিয়তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে—এসব দেখার পর মানুষের খুনি নয়নদের প্রতিরোধ করতে না আসা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার থাকে না।

আরেকটা তথ্য দিয়ে শেষ করছি কলামটা। কোনও বিপদে পড়া ব্যক্তিকে তার পাশে থাকা মানুষের সাহায্য করার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে বেশকিছু দেশে।

ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নরওয়ের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেমন এই তালিকায় আছে, তেমনি আছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, তিউনিসিয়ার মতো দেশও।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

/এসএএস/এমএমজে/

x