ইনাম আহমদ চৌধুরীকে নিয়ে বিতর্ক

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৫:৪৪ , জুলাই ১১ , ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীসম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য করায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তাদের যুক্তি আওয়ামী লীগ কি এতই দেউলিয়া হয়ে গেছে যে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছের লোক, যে কিনা প্রেসিডেন্ট জিয়াকেও পরামর্শ দিয়েছেন, বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন, তাকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা করতে হবে! তাছাড়া দলে এত পুরনো মানুষ থাকতে নবাগত ইনাম আহমদ চৌধুরীকে কেন উপদেষ্টা করা হলো। পত্রিকায় দেখলাম, মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ নামের একটি সংগঠন এই নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিষোদ্গারও করেছে এবং তাকে বাদ দিতে বলেছে।
গত ৭ জুলাই ২০১৯, ইনাম আহমদ চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন প্রদান করেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ইনাম চৌধুরীকে এই মনোনয়ন দেন দলটির সভাপতি। গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে সিলেট ১ আসনে দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি ত্যাগ করে তিনি চলে আসেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। ইনাম আহমদ চৌধুরী দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে ছিলেন। বিএনপি তার কোনও মূল্যায়ন করেনি। এত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোককে হাতের কাছে পেয়েও কোনও কাজে না লাগানো ছিল বেগম জিয়ার দুর্ভাগ্য, যে কারণে দলটা দেশ পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য কোনও সফলতা দেখাতে পারেনি। বসে বসে রাজস্ব খেয়ে নিয়মমাফিক দেশ চালানো ধনী ও সম্পদশালী দেশের শাসকদের মানায়, গরিব দেশের বিশেষ করে অপ্রতুল প্রাকৃতিক সম্পদসম্পন্ন দেশের শাসক সম্প্রদায়ের অলসভাবে বসে দেশ চালানো মানায় না। বুদ্ধিসম্পন্ন, মেধাসম্পন্ন মানুষকে একত্রিত করে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হয়, যেনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছাড়াও কীভাবে দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া যায়, তার উপায় উদ্ভাবনের জন্য।

শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার কোনও জুড়ি নেই। জাপানের কোনও প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। তারা এখন বিশ্বের তিন নম্বর ধনী রাষ্ট্র হয়েছে শুধু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের কারণে। সুষ্ঠু, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তৈরি করতে হলে শিক্ষিত অভিজ্ঞ মানুষের প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেরকম অভিজ্ঞ লোকদের বেছে বেছে দলে টেনে আনছেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালে জাতি উপকৃত হবে। ইনাম আহমদ চৌধুরী তেমন একজন লোক আমি মনে করি। তার ভাই ফারুক আহমদ চৌধুরীও একজন অভিজ্ঞ লোক ছিলেন। তিনি আওয়ামী ঘরানার লোক ছিলেন আজীবন।

ইনাম আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে তেমন কোনও পরিচয় নেই আমার। তার সঙ্গে তিনবার টকশোতে অংশগ্রহণ করেছি, সেই সুবাদে অল্প পরিসর স্বল্প পরিচয়। সংবেদনশীল লোক। ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায় বলার হিম্মত আছে তার। দলকানা লোক মনে হয়নি আমার। এক এগারোর সময় আরটিভিতে ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ নামের এক টকশোতে প্রসঙ্গক্রমে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় মেয়াদে চট্টগ্রাম থেকে শিবির ও ছাত্রদলের কর্মীরা আমাকে অপহরণ করে কীভাবে অত্যাচার করেছে এবং নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে বের হয়েছি, তার বর্ণনা করলে চৌধুরী সাহেব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে জামাল উদ্দিনকে অপহরণের পর পর আমার ওই ঘটনা জাতীয় পত্রিকাগুলোকে প্রধান শিরোনাম হওয়ায় প্রশাসন থেকেও তখন প্রচণ্ড চাপ পড়েছিল অপহরণকারীদের ওপর।

ইনাম চৌধুরী গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন সরাসরি প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে। তিনি তখনও বিএনপিতে ছিলেন। আমি তখন বলেছিলাম এসব কারণে বিএনপি নবম সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হবে এবং ৩০টার অধিক সিট পাবে না। হবহু তাই হয়েছে। সেই ওই টকশোতে আমাদের সঙ্গে মহীউদ্দীন খান আলমগীরও ছিলেন। তখন নবম সংসদ নির্বাচনের জোর প্রচারণা শুরু হয়েছিল। মহীউদ্দীন খান আলমগীর একজন অভিজ্ঞ আমলা। তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনে একজন প্রার্থী ছিলেন।

সিলেটে যে ইনাম আহমদ চৌধুরী প্রয়োজন রয়েছে, সম্ভবত সেই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছেন। ক্ষমতায় থাকার পরও সিলেটে মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান পাস করতে পারেননি। সিলেট এলাকার আওয়ামী লীগের প্রবীণ লোক একে একে সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন। আবদুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, দেওয়ান ফরিদ গাজী এখন আর জীবিত নেই। প্রবীণ লোক না থাকলেও সংগঠনের প্রতি মানুষের ভক্তি থাকে না। সে উপলব্ধি নিশ্চয়ই সভানেত্রীর রয়েছে। সিলেটে সভা করতে গিয়ে মঞ্চে তিনি ইনাম আহমদ চৌধুরীকে খোঁজ করেছেন এবং সভামঞ্চে ইনাম আহমদ চৌধুরীকে রাখার ব্যবস্থা না করায় সভানেত্রী দুঃখিত হয়েছিলেন।

অভিজ্ঞ লোক প্রসঙ্গে এবার একটা পুরনো ঘটনার কথা বলি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি যখন শুনলেন আদমজীর জেনারেল ম্যানেজার করিম সাহেব (Abdul Currim Karawadia) পাকিস্তানে যেতে পারেননি এবং তিনি বাংলাদেশ আটকা পড়ে আছেন। হয়তো কোনোখানে আত্মগোপন করে আছেন। তখন বঙ্গবন্ধু যেই করে হোক করিম সাহেবকে খুঁজে বের করেছিলেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সেক্টরটিকে পুনর্গঠন করে দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করলেন। আর আদমজীর জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিলেন। সম্ভবত বেতন নির্ধারণ করেছিলেন এক লাখ টাকা। তখন সোনার ভরি ৩৫০ টাকা। সুতরাং হিসাব করে দেখুন তার বর্তমান বেতন কত হয়।

অথচ করিম সাহেব ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক। করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করে সে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং সেক্টর পুনর্গঠনে অবদান রেখেছিলেন। যদিও একটি দুঃখজনক ঘটনা, একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা তাকে প্রকাশ্যে অপমান করায় নাকি তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং পরে ভারতীয় জুট বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে বোম্বেতে চাকরি নেন।

শুধু পেট মোটা হলেই দারোগা হয় না। আমিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা লোক। লেখাপড়াও কিছু জানি, লোকে বলে। কিন্তু আমাকে তো করিম সাহেবের দায়িত্ব দিলে আমি সে দায়িত্ব পালন করতে পারতাম না। করিম সাহেবের পর বঙ্গবন্ধু আদমজী জুট মিলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন আবদুল আউয়াল সাহেবকে। আউয়াল সাহেব আমার যতটুকু মনে পড়ে ১৯৫৬ সালের দিকে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর খুবই প্রিয় ছাত্রনেতা। সংগ্রামী পুরুষ। তিনি আদমজীকে লেজেগোবরে করে জুটমিলটির সর্বনাশ করে গেলেন। পরে গিয়ে জাসদ করলেন, আর একটা পত্রিকা বের করলেন। তেজকুনীপাড়ায় দাদা ভাইয়ের লীলা ঘরের সঙ্গী হলেন। লোকে বলে দাদার ষড়যন্ত্রেই তিনি নিহত হয়েছিলেন।

‘মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ’ উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ইনাম চৌধুরীকে বের করে দিতে বলছে, কারণ  তিনি নাকি বঙ্গবন্ধুকে যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। কে বলবে, ইনাম আহমদ চৌধুরীর কারণে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হননি। তার কারণে বঙ্গবন্ধুর বঙ্গবন্ধুত্ব যাবে, তাও না।

আরেকটা পুরনো কথা বলে লেখাটা শেষ করব। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর চট্টগ্রাম সফরের সময় সার্কিট হাউসে স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোর প্রমিনেন্ট নেতাকর্মীদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে আমারও থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। ন্যাপ মোজাফফরের চট্টগ্রাম জেলার তখনকার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী তার বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে বললেন, আগ্রাবাদ এলাকায় তিনি জামায়াত নেতা মাওলানা শামসুদ্দিনকে দেখেছেন। আজমী বক্তৃতায় দাবি করলেন অবিলম্বে মাওলানা শামসুদ্দিনসহ সব কলাবরেটরদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, পাকিস্তানিরা মারলো বাঙালি, রাজাকারেরা মারলো বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধারাও মারলো বাঙালি—আর কত বাঙালি মারবা। বঙ্গবন্ধু বললেন, তাকে দেখলে যদি রাগ লাগে না দেখার ভান করো, আজমী। বঙ্গবন্ধুর কথা শুনে আমি উৎসাহিত হলাম এবং বঙ্গবন্ধুকে বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু, গুরুতর অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রেখে অবশিষ্ট অপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা যায় না?’ আমার কথাটা ভাসানী ন্যাপের মহানগরীর সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং সভাপতি আবদুস সাত্তার সাহেব সমর্থন করলেন। তখন বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক সেক্রেটারি তোফায়েল আহমদকে ডেকে বললেন, তুমি সাধারণ ক্ষমার কথাটা লিখে রাখো।

আমাদের বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি ঢাকায় গিয়ে এই সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করে দেবো। পরবর্তী সময়ে যারা নরহত্যা করেছে, বাড়িতে আগুন দিয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, অনুরূপ অপরাধের সাড়ে নয় হাজার অপরাধীকে রেখে সব বন্দিকে ছেড়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু সরকার। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই এখনও আমরা জীবিত আছি।

তাই সবার উদ্দেশে বলবো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমরা বিসর্জন দেব না সত্য, কিন্তু যুদ্ধাপরাধী ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে আমাদের বেশি বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। কিছু বাড়াবাড়িতে মনে হয় আমাদের অনেকে আজ বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছেন। নতুন নতুন ‘চেতনার দোকান’ খুলে মনে হয় তারা শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি আওয়ামী প্রেমিক হয়ে গেছেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিও তার থেকে বেশি বুঝেন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

x