মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের কন্যাদের রক্ষা করুন

লীনা পারভীন ১৫:১৭ , জুলাই ১২ , ২০১৯

লীনা পারভীননেত্রকোনার এক মাদ্রাসার শিক্ষক ধর্ষণের জন্য প্রতিদিন একজন করে ছাত্রীকে তার রুমে ডেকে নিয়ে যেত। ডেকে নিয়ে সেবার নামে চলতো যৌন নির্যাতন। নারায়ণগঞ্জের এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ এক বছর ধরে প্রায় ১০/১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে আরও অনেক। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গজিয়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ভালো কোনও সংবাদ আসেনি আমাদের সামনে। সামান্য অপরাধে ছাত্রদের পিটিয়ে হত্যা, ছোট বাচ্চা ছেলেদের যৌনকর্মে ব্যবহার করা, ধর্ষণসহ আরও নানা অপকর্মের অভিযোগ আসছে একের পর এক। সারাদেশে এমন কত মাদ্রাসা আছে আমাদের কারও জানা নেই। গ্রামগঞ্জের দরিদ্র মানুষ সন্তানকে পড়াশোনা করানোর আশায় পাঠায় এসব মাদ্রাসায়। একদিকে কিছু পড়াশোনা করা হবে আবার আখেরাতের কাজও করতে শিখবে সন্তানেরা। এই ক্ষুদ্র আশায় পাঠানো সন্তান যখন লাশ হয়ে ফিরে বা কন্যাটি যখন ধর্ষিত হয় তখন আমাদের মানব বিবেক আসলেই স্তব্ধ হয়ে যায়।
মাদ্রাসা মানেই শিক্ষা দেওয়ার স্থান। তাছাড়া ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় বলে সমাজের মানুষ এসব মাদ্রাসা ও মাদ্রাসায় কাজ করা শিক্ষকদের একটু অন্যরকমভাবেই বিবেচনা করেন। অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ তারা। অথচ এই শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষা দেওয়ার নামে দিনের পর দিন সন্তানতুল্য ছাত্রীদের ধর্ষণ করে চলেছে। কী জঘন্য। বরিশালের গৌরনদীতে তরকারি আনতে পাশের বাসায় গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ বছরের এক শিশু। রাজধানীর ওয়ারীতে ৭ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে কিছু জানোয়ার।

কোথায় যাবে আমাদের কন্যারা? এ কোন মহামারি শুরু হলো গোটা দেশজুড়ে? দিনের পর দিন একই ঘটনা ঘটে চলেছে অথচ এ অন্যায় ও অপরাধকে নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না আমাদের। কিছু ঘটনায় অপরাধী গ্রেফতার হচ্ছে কিন্তু এরপর আর কোনও আপডেট পাওয়া যায় না। লম্বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই অপরাধের বিচারকর্ম কোথায় গিয়ে আটকে যায় সেটি আর জানা যায় না।

ধর্ষণ একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এটি একজন মানুষকে খুনের অপরাধের চেয়েও কম বলে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। ধর্ষকরা কেবল ধর্ষণই করছে না, ধর্ষণের পর খুনও করছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকাসহ সারাদেশেই শিশু ধর্ষণ ও হত্যার সংখ্যা বেড়ে চলেছে। গত ছয় মাসে মোট ২৫৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে মোট ২১ জনকে। যাদের মধ্যে ০-৬ বছর বয়সী রয়েছে মোট ৫৯ জন, ৭-১২ বছর বয়সী ১০২ জন এবং ১৩-১৮ বছর বয়সী রয়েছে মোট ৯ জন। ধর্ষিতা হওয়ার অপবাদ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ২ শিশু। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৪১ শিশুকে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৯ জন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, গত ছয় মাসে মোট ৮৯৫ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলে ২০ জন ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক শিক্ষক দ্বারা।

কোথায় চলেছে আমাদের এই সমাজ? এর সমাধান কোন পথে? এই যে আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো এমন নৃশংসতার শিকার হচ্ছে, কোথায় আমাদের সামাজিক বিবেক ও রাষ্ট্রীয় সচেতনতা? কী অন্যায় এই বাচ্চাগুলোর? কেন এসব অবুঝ শিশুরা ধর্ষণের মতো একটি জঘন্য অমার্জনীয় অপরাধের বলি হচ্ছে? যৌনতা বোঝার আগেই বলি হচ্ছে যৌন নির্যাতনের। এর থেকে রক্ষা করবে কে? পরিবারের পিতামাতারা আজ অসহায়। কন্যাশিশু জন্ম দিয়ে অপরাধপ্রবণতায় না ভোগার কোনও অবস্থা আর নেই এই সমাজে। এমনিতেই আমাদের সমাজে নারীদের তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয় না। সকল ক্ষেত্রেই বঞ্চনার শিকার তারা। নেই অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনও উদ্যোগ। তার মধ্যে সবকিছু বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলছে মেয়েটির বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

হয়তো বলবেন যারা শিশুদের ধর্ষণ করে তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। ধরে নিলাম তারা মানসিক রোগী। তাহলে মানসিক রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার নিশ্চয়তা কেন করা হবে না? একজন ব্যক্তির মানসিক বিকৃতির ফল কেন একজন নিষ্পাপ শিশু ভোগ করবে? আমাদের মাদ্রাসাগুলোকে অতি সত্বর একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে আনা জরুরি। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা, সিলেবাস, শিক্ষক নিয়োগের জন্য সঠিক ও কার্যকর নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করাটা এখন সময়ের দাবি। শুধু মাদ্রাসা নয়, সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি অভিযোগ সেল গঠন করা জরুরি। যারা এ ধরনের অভিযোগ ওঠা মাত্র ব্যবস্থা নেবেন। একই সঙ্গে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নির্যাতন রোধে কাজও করবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের আগে তার মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক ও পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

সমাজ থেকে এখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নাই হয়ে গেছে বললেই চলে। কূপমণ্ডূক শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষক বা ছাত্র কাউকেই আধুনিকতার দুয়ারে নিতে পারছে না। শিশুদের মনোজগৎ যদি ছোট বয়সেই নষ্ট হয়ে যায় এবং সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক হয়ে পড়ে, তাহলে সে শিশুর কাছ থেকে ভবিষ্যতে কোনও কিছু কি আশা করা যায়? যে শিশুটি আজকে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এই সমাজ কি তাকে সুস্থ জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে?

প্রতি পদে পদে যখন এ দেশের নাগরিকেরা হতাশার দুয়ারে ধাক্কা খাচ্ছে তখন দিশেহারা হয়ে চিৎকার করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা সামনে থাকে না। আজ কেবল ধর্ষণের বিচার চাইতেই এ লেখা। এ দেশের যেকোনও সমস্যার একমাত্র সমাধানের জায়গা হিসাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়া যায়। আর কোথাও কোনও আশা নেই। ভরসাও নেই। কারও কিছু যায় আসে না অসুস্থ বাচ্চাটি যখন নরপশুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় চিৎকার করে কান্না করে রেহাই চাইছিলো, কিন্তু পায়নি। ধর্ষকের থাবা অসুস্থ বাচ্চাটিকেও ছাড় দেয়নি। সে কান্না কি আমাদের কানে পৌঁছায়?

আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা প্রতিনিয়ত অনেক স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন। ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর বানানোর কথা শুনি। সেসব দেশের মতো হতে হলে আগে আইনের শাসন কায়েম জরুরি। একজন নাগরিকও যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তাহলে সেসব স্বপ্ন আমাদের কাছে অলীক মনে হয়। চাই না আমাদের সিঙ্গাপুর বা লন্ডনের মতো দেশ। একটু সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চাই। নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার ভয়ে যেন কুকড়ে থাকতে না হয় এটুকু নিশ্চয়তা কি পেতে পারে না এ দেশের নারীরা?

লেখক: কলামিস্ট

 

 

/এমওএফ/

x