ঈদ যায় কথা থাকে

আহসান কবির ১৫:৪১ , আগস্ট ১৪ , ২০১৯

 

আহসান কবিরহাসান বিপুল এসএমএস দিচ্ছে। আমি উত্তর দিচ্ছি। ব্যাপারটা এমন—

- ভাই সাদা-কালো টেলিভিশন দেখার দিনগুলো মনে আছে? ঈদ এলে কী যে আনন্দ লাগতো। কত মজার অনুষ্ঠান হতো।

- থাকবে না কেন? চ্যানেল তখন একটাই, বিটিভি।

- তো সাদা-কালো টেলিভিশন ঢাকায় দেখতেন না ঢাকার বাইরে? ঢাকার বাইরে হইলে টিভির অ্যান্টেনা ঘুরাইয়া ঠিক করতে হইতো ছবি যেন না কাঁপে। ঝিরঝির যেন না করে।

- হ্যাঁ। সেটাও করেছি বহুদিন। আমার এক বন্ধু ছড়া কাটতো- টিভি ঝিরঝির মাথা নষ্ট/আমার মনে অনেক কষ্ট!

- আচ্ছা ভাই আপনি কি গোল ডায়ালে আঙুল ঘুরিয়ে নম্বর পাঞ্চ করে টেলিফোন করেছেন? ট্রাংকল বা টেলিগ্রাম করেছেন?

- করবো না কেন? করেছি।

- তার মানে আপনি রাজ্জাক কবরীর বাংলা ছবি দেখেছেন? ভিসিআর ভাড়া কইরা হিন্দি ইংলিশ আর ‘খচ্চর খচ্চর’ ছবি দেখেছেন?

- সাদা-কালো ছবি ও ভিসিআরে ভালো ভালো ছবি দেখেছি, খচ্চর খচ্চর কিছু দেখি নাই। কেন কী হয়েছে?

- কিছু হয় নাই ভাই। তবে খুশি হওয়ারও কোনও কারণ নেই। যথেষ্ট বয়স হইছে ভাই, গরুর মাংস আর কলিজা ভুনা খাবার আগে কয়েকবার ভাবেন, প্রয়োজনে কোলেস্টেরল চেক কইরা নেন!

আজকালকার ছেলেপেলেদের অনেকেই প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক, হাসান বিপুলের মতো ‘ডিজিটাল পোংটা’! শত বছর আগের হজ ও কোরবানির স্মৃতি অনেক কষ্টের। যারা গত চল্লিশ বছর ধরে বিমানে চড়ে হজে যান তারা জাহাজে করে সৌদি আরবে পৌঁছানো, তারপর উটযাত্রার মাধ্যমে কাবা শরিফ ও আরাফাত ময়দানে যাওয়ার কষ্ট অনুধাবন করতে পারবেন না। হজে যাওয়ার জন্য দীর্ঘযাত্রার প্রয়োজন হতো, অনেকেই মৃত্যুবরণ করতেন। এই উপমহাদেশের মানুষেরা প্রধানত করাচি কিংবা বোম্বে থেকে জাহাজে উঠতেন। জাহাজ থেকে নেমে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হতো উটের পিঠে। হাজিদের উটবহরে আরব বেদুইনদের হামলা ও সবকিছু লুট করে নেওয়া এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটতো। এরপর মরুভূমির গরম তো ছিলই। সেই তুলনায় ইদানীংকার বিমানে হজে যাওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। প্রচলিত সব কথা সত্য না। যেমন কথায় আছে-‘যায় দিন ভালা, আহে দিন খারাপ!’ হজের ক্ষেত্রে যে দিন আসছে বা আসবে সেটাই হয়তো ভালো! 

বদলে গেছে ঈদ পালনের ধরনও। এখন ‘দোস্ত তুই গরু না ছাগল’ এটা জিজ্ঞাসা করার দিন যেন চলে গেছে। আগে কোরবানির পশুর সঙ্গে ছবি তোলার রেওয়াজ ছিল না বললেই চলে। এখন গরু ছাগলের ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়াটাও সেকেলে। ইদানীং ভিডিও আপলোড করার যুগ। গরু বা ছাগল কেনার দৃশ্য, হাট থেকে নিয়ে আসা, বাসার নিচে গরু রাখা, খাওয়ানো, শেষমেশ জবাই করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা হচ্ছে স্মার্টনেস! আগের মতো হাটে গিয়ে পশু দামাদামি, গরু ছাগল নিয়ে আসার সময় মানুষের জানতে চাওয়া-ভাই কতো নিলো, গরু বা ছাগল কিনে জিতলেন না হারলেন সেই আলোচনা কমে গেছে মনে হয়। হাট থেকে নিয়ে আসার সময়ে গরুর ছুটে যাওয়া এবং প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় সেটা ধরার দৃশ্য এখন আর সহসা চোখে পড়ে না। যারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যেতেন তারা কোরবানি ঈদের এই পরিবেশটা মিস করতেন খুব। এখন কোরবানির দৃশ্য আপলোড করাটা ‘কনটেন্ট আপ’!

অবশ্য দুই একটা অন্যরকম ছবিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ট্রাকের পেছনে চার পা বেঁধে গরুকে উল্টো করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে। অনেকে গরুর বেদনায় কাতর হয়েছেন, বেদনায় মোড়ানো কমেন্টস করেছেন। একদল তৈরি হয়েছে যোগাযোগ মাধ্যমে যারা একদিনে (কোরবানি ঈদের দিনে) লাখ পশুর উন্মুক্ত স্থানে জবাই করার ঘোর বিরোধী। এদের ধারণা, এটা মধ্যযুগীয় বর্বরতার মতো একটা জিনিস।

এদের বিপরীত দলও দারুণ সক্রিয়। এদের বক্তব্য- ভাই বার্গার খান না? খাসি বা গরুর রোস্ট কিংবা কাবাব খান না? যদি খান সেসব আসে কোত্থেকে? জবাই করতে হয় না? গরু আর শূকরের মাংস খুবই জনপ্রিয়। সেগুলোও তো জবাই করতে হয়। তাহলে? বলি, জুতা বা স্যান্ডেল যে পরেন সেগুলো আসে কীভাবে? যারা কোরবানির বিরোধিতা করছেন তারা নিজেরাই অমানবিক কাজ করছেন।

আগে কোরবানির পশুর চামড়া এতিমখানায় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। দুই একজন যে বেচে দিতেন না তেমনও নয়। এরপর কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রিটা একটা রাজনৈতিক রূপ নিয়ে নিলো। এলাকা ভাগ করে নেওয়া শুরু করলো দলীয় মাস্তানরা। তাদের বাইরে কোরবানির চামড়া বেচলেই তারা এসে ঝামেলা করতো। ২০১৮-১৯ সালে এই কোরবানির চামড়াতে চলে এসেছে ‘সিন্ডিকেট’! তারা এসে চামড়া আর পানির দাম এক করে ফেলেছে। গরুর চামড়া ১০০ থেকে ২০০ আর ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ৭০ টাকা। কেউ কেউ অবশ্য ভদ্রভাবে বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এভাবে কমিয়ে ফেললে ভবিষ্যতে এটা বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিতে হবে এভাবে- বিনামূল্যে কোরবানির চামড়া নিয়ে দোজাহানের অশেষ নেকি হাসিল করুন। অথবা কোরবানির চামড়া কিনলে গরুর সামনের যে কোনও এক রানের মাংস ফ্রি’! কেউ কেউ স্ট্যাটাস দিয়েছেন- এক লক্ষ টাকা দামের কোরবানির গরুর চামড়ার দাম বলে সিন্ডিকেট মাত্র একশত টাকা। রাগে দুঃখে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেললাম। ভাগ্য ভালো গরুটা কোরবানির আগে এটা শুনে যায়নি। শুনলে তখনই হার্টফেল করতো। একজন লিখেছেন-‘এক লিটার পানির দাম=একটা ছাগলের চামড়ার দাম!’

তাহলে কেমন কাটলো ২০১৯-এর কোরবানির ঈদ? ২০১৮-এর চেয়ে খারাপ কিন্তু ২০২০-এর চেয়ে ভালো? আশপাশের মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকেও সেটা জানা যেতে পারে। যেমন, একজন সকাল ৭.৩০-এ রওনা হয়ে ওইদিন রাত তিনটায় ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছে স্ট্যাটাস দিয়েছেন- ‘আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে পৌঁছালাম!’ অন্য আরেকজন উত্তর দিয়েছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ আপনি খুব ভাগ্যবান। আমি সাতঘণ্টা ঘাটে আটকে থেকে এইমাত্র ফেরিতে উঠতে পারলাম!’

গত বিশ বছরে বাংলাদেশি বাঙালির উল্লেখযোগ্য অর্জন কারও চোখে পড়েনি। সেটা হচ্ছে সব হেনস্তা, শত ভোগান্তি মেনে নেওয়ার ধৈর্য! নির্মলেন্দু গুণের কবিতার কথা নকল করে বলা যায়-হায় খুব সহজেই মেনে নেয়া শিখেছে মানুষ!

প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে গ্রামে যাবেন? রাস্তা ভাঙা। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে সেসব এবড়োথেবড়ো। দুই ঘণ্টার রাস্তা আট ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়ার পর ফেরিঘাটে জ্যাম। যারা ট্রেনে যাবেন তাদের জন্য ভোগান্তি আরও বেশি। রেলপথ ডুবে যেতে পারে, উল্টে যেতে পারে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবেন। তারপরও অপেক্ষা করবেন সকাল সাতটার ট্রেন আসবে রাত আটটায়, তারপর রওনা হবেন, স্ট্যাটাস দেবেন খোদার অশেষ রহমতে ট্রেন ছাড়লো। রওনা হলাম। সবাই দোয়া করবেন, মা’র কাছে যাচ্ছি! নৌপথে যাবেন? ১১০ জন লোক ধরে যে লঞ্চে, কমপক্ষে ৫০০ লোক উঠে পড়বে সেখানে। আপনিও উঠবেন, জানটা হাতে নিয়ে দোয়া পড়তে পড়তে যাত্রা শুরু করবেন। যেতে পারলেই হলো, পৌঁছানোর পর কী যে আনন্দ! এক বাড়িতে সবাই! আহা কী আনন্দ! সকালে কোরবানি এবং চামড়া বেচতে না পারলে মাটিতে পুঁতে ফেলা। অবশেষে যেভাবে গেছেন সেভাবেই ফিরবেন! ফিরতে পারলে ভাববেন- আপনি সুখী। বইতে শুধু আছে- সুখী মানুষের গায়ে জামা থাকে না। কিন্তু বইয়ে রাস্তা ভোগান্তি, রেল ভোগান্তি, লঞ্চে ভোগান্তি, কোরবানি ও চামড়া ভোগান্তির কথা লেখা থাকে না! সেসব লেখা থাকে মানুষের বুকে। বাংলা ছবির গানের আদলে বলা যায়- কী জ্বালা যন্ত্রণা/গুম হবো তবু বলবো না/ বলবো সে (??) থাকুক সুখে/ঈদ যায় কথা থাকে!

খুব জানতে ইচ্ছে করে- মনের পশুকে জবাই করার পর সেটা কি খাওয়া যায়? মনের পশুর কি চামড়া থাকে? সেটাও কি খুব কম দামে বিকোয়? মনের পশু জবাই করার নির্দিষ্ট কোনও জায়গা আছে, যেসব নির্দিষ্ট করে দেয় সিটি করপোরেশন? সবাই কি নির্দিষ্ট জায়গায় মনের পশু কোরবানি দেয়?

জানতে ইচ্ছে করে-সিটি করপোরেশনের লোকজন কোরবানির স্থান পরিষ্কার করার পরও অনেক জায়গার বাতাসে যেমন ভেসে বেড়ায় পশুর রক্তের ঘ্রাণ, মনের পশু জবাই করার পর পরিষ্কার করলেও কী বাতাসে কিছু দিন গন্ধ ভেসে থাকে?

ঈদ যায় কথা থাকে! ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার মতো কোরবানি দেওয়ার ঠিক আগে পশুর চোখে যে অপরিসীম কান্না আর বেদনার স্রোত জাগে, মানুষ কী সেটা বুঝতে পারে? মনের পশু কোরবানি দিতে পারে কয়জনা?

লেখক: রম্যলেখক

/এমওএফ/এমওএফ/

x