শিক্ষাই পারে রোহিঙ্গা শিশুদের হতাশা দূর করতে

সাদ্ হাম্মাদি ২৩:৪৩ , আগস্ট ২৪ , ২০১৯

সাদ্ হাম্মাদি

গত জুনে যখন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাদের অনেকেই বলছিল, বড় হয়ে তারা শিক্ষক হতে চায়। শিক্ষক হয়ে তারা অন্য শিশুদের শিক্ষা দেবে, যেন তারাও শিক্ষক হয়। তাদের প্রত্যেকের এমন ইচ্ছার কথা শুনে আমি বেশ অবাক হই, এমন একটা পর্যায়ে একজন আমাকে বুঝিয়ে বলে—শিক্ষার মাধ্যমে নিপীড়িত এই গোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে চায় তারা।

ঠিক এমনই একজন মোহাম্মদ জুবায়ের, যার বয়স ১৮ ছুঁইছুঁই। রোহিঙ্গা শিশুদের দারুণ এক উদাহরণ সে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সে বলে, যখন তার বয়স ৮ বছর, তখন তাদেরই এলাকার এক বৃদ্ধকে চিকিৎসার অভাবে সে মারা যেতে দেখেছে। কারণ মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তাকে মংডু যেতে দেয়নি। এরপর থেকে বড় হয়ে ডাক্তার হবে বলে মনস্থির করে জুবায়ের। 

তবে বড় হওয়ার মধ্য দিয়ে জুবায়ের বুঝতে পারে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যগুলো রাজনৈতিকভাবে কাঠামোবদ্ধ। একজন রাজনীতিবিদ হয়ে রোহিঙ্গাদের এ ধরনের বৈষম্য থেকে ‘মুক্তি’ নিশ্চিত করতে চায় সে। 

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় জুবায়ের। মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার না হলে ১৬ বছর বয়সেই স্কুল শেষ হতো জুবায়েরের। 

আজ থেকে এক সপ্তাহ পর জুবায়েরের বাংলাদেশে ২ বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু বাংলাদেশে তার শিক্ষার বাকি অংশটা একটি অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। তার ছোটবোনও মংডুতে নবম শ্রেণিতে পড়তো। কিন্তু এখানে তার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। 

নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে প্রাণ বাঁচানোয় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ জুবায়ের। শরণার্থী শিবিরে আবর্জনা পরিষ্কারের এক দাতব্য কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে এই রোহিঙ্গা কিশোর। মাস শেষে কিছু আয়ও হয়। সে বলে, ‘আমি এতে খুশি নই। আমি মনে করি শিক্ষার বলে শুধু রোহিঙ্গা নয়, সব শরণার্থীই তাদের অবস্থার উন্নতি করতে পারে।’ 

তাদের কাছে যদি শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে এই শিশুরা নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতের সুযোগ পাবে। আর যদি শিক্ষা না পায়, তাহলে আমরা একটা প্রজন্মকে হারিয়ে যেতে দেখবো, আর রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ হবে আরও ভয়াবহ। আমি জুবায়েরের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত এবং আশাবাদী, বাংলাদেশ সরকারও এই দীর্ঘমেয়াদি ফায়দাগুলোকে আমলে নেবে। একটি শিক্ষিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার আদায়ে বেশি সচেষ্ট থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। 

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুরা বাহ্যিক ছাড়াও মানসিকভাবেও ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। যেসব রোহিঙ্গা শিশু বাংলাদেশে জন্মেছে, তারাও একটি বঞ্চিত পরিবেশে বড় হবে। আর শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকা শিশুরাই বেশি নিপীড়িত হবে। মাদক পাচারকারী, শিশু পাচারকারী থেকে শুরু করে সশস্ত্র গোষ্ঠী পর্যন্ত সবাই এই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে তাদের ব্যবহার করতে চাইবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার শিক্ষার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের হতাশাকে কৃতজ্ঞতায় রূপান্তর করে তাদের সম্মানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিতের সুযোগ করে দিতে পারে।

রোহিঙ্গা শিশুরা যেন ভুল জায়গায় ব্যবহৃত না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নাহলে আমরা একটি প্রজন্মকে আমাদের চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখবো, যা কারো অভিমতে ‘একটি বিরাট বোঝা’ হয়ে দাঁড়াবে। যেই দেশ ৯৮ শতাংশ হারে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির কৃতিত্ব রাখতে পারে, সেই দেশ কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের শিক্ষার গুরুত্বকে ছোট করে দেখতে পারে না।
শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে শিশুরা ইউনিসেফ পরিচালিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা পাচ্ছে, যা অপর্যাপ্ত। একটি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সনদ রোহিঙ্গা শিশুদের পরবর্তী শিক্ষা অর্জনের যোগ্যতা নিশ্চিত করবে, যা প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

রোহিঙ্গা স্রোতের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কার্যকরী কোনও ভূমিকা রাখেনি। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে এখনও সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে প্রত্যাবাসন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে শিক্ষাই পারে স্বেচ্ছামূলক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে। 

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত বব রের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বাংলাদেশ এবং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত কানাডার মতো দেশগুলোর। বাংলাদেশ যদি তাদের শিক্ষিত করার রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে কানাডার মতো দেশগুলো সেখানে আর্থিক সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। 

একটি শিক্ষিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে সামাজিক, নৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসবে, তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করা উচিত। জুবায়েরের মতো অনেক রোহিঙ্গা শিশুরই এখন পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমাদের উচিত জুবায়েরের মতো ৫ লাখ শিশুর প্রতিভাকে যথাযথভাবে পরিচর্যা করা, যাতে করে তারা যে সমাজে বেড়ে উঠছে তার উন্নয়নে জোরালো অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য রাষ্ট্র। ফলে সবার শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও মানবিক অঙ্গীকার বাংলাদেশে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

চীনের চিত্রশিল্পী ও শরণার্থী অধিকারকর্মী আই ওয়েই ওয়েই বলেন, ‘শরণার্থীদের অবশ্যই আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’ রোহিঙ্গা শিশুরা যেন শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। 

লেখক: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ক্যাম্পেইনার।

টুইটার: @saadhammadi 

/এসএএস/এমএমজে/

x