একটি প্লটের আবেদন এবং সরকারকে রাষ্ট্র ভাবার ভ্রান্তি

ডা. জাহেদ উর রহমান ১৩:৫০ , আগস্ট ২৬ , ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সংসদ সদস্য হিসেবে একটা প্লটের আবেদন করেছেন—এই লেখা যখন লিখছি, তখন ফেসবুকে খবরটি ভাইরাল। কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে বেশ সকালেই এই সংবাদ এসেছিল, তবে বেলা বাড়ার পরে মূল ধারার গণমাধ্যমেও সংবাদটি এসেছে। সংবাদগুলো এবং নেটিজেনদের বক্তব্যের মূল জায়গা হচ্ছে—রুমিন ফারহানা এই সংসদকে এবং সরকারকে অবৈধ বলে বিশ্বাস করেন, তিনি কী করে সরকারের কাছে প্লট চান? এই ঘটনা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, সেটা লিখতেই এই কলাম।
আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুইরকম হয়—সরকারি এবং বেসরকারি। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা সরকারি বলে থাকি, সেগুলো কি আসলেই সরকারি? পশ্চিমে পুরোপুরি জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয় ‘পাবলিক’। এর মানে এগুলো সব জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। তাই স্কুল-কলেজের নামের আগে কিছু যদি লিখতেই হয়, তাহলে উচিত ছিল ‘সরকারি’ না লিখে ‘রাষ্ট্রীয়’ লেখা।

এটা জাস্ট একটা অমনোযোগিতার ভুল বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমি নিশ্চিত এই কাজগুলো সচেতনতার সঙ্গে, পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে। এই দেশের প্রতিটি সরকার চেয়েছে রাষ্ট্র আর সরকারকে জনগণ একই জিনিস বলেই মনে করুক। 

সেপারেশন অব পাওয়ার একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ৮০০ বছর আগে ম্যাগনাকার্টা আমাদের সেই পথ দেখিয়েছিল। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সুনির্দিষ্টকরণ হয়েছে এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একটা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলে তাতে যদি সেপারেশন অব পাওয়ার সঠিকভাবে কার্যকর থাকে, তাহলে সেটা জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করে, তবে সেটা সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতায় লাগাম পরিয়ে দেয়। 

ঠিক এই কারণেই এ দেশের ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো মধ্যযুগীয় রাজার মতো ক্ষমতা উপভোগ করতে চায় বলেই তারা এই সেপারেশন অব পাওয়ার নিশ্চিত করা দূরেই থাকুক, সেগুলোকে আরও একীভূত করার চেষ্টা করে। কিছুদিন আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী এমনই একটা চেষ্টা ছিল। সরকারগুলো জনগণের মধ্যে এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, রাষ্ট্র আর সরকার একই। কিংবা কেউ কেউ ভেতরে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের মতো সম্ভবত মনে করেন, ‘আই অ্যাম দ্য স্টেট’।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের নামে যে সংসদ গঠিত হয়েছে সেই সংসদকে আমি বৈধ সংসদ মনে করি না। এই সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়া রাজনৈতিক কৌশলগতভাবে সঠিক হয়েছে কিনা, সেটা নিয়ে খুবই যৌক্তিক বিতর্ক করা যায় বলে আমি মনে করি। আমি নিজেও সেটা নিয়ে লিখেছি। প্রশ্ন হচ্ছে সাংসদরা শপথ নিলেন। এখন তাদের সাংসদ হওয়াজনিত সুযোগ-সুবিধা নেওয়াটা কি অন্যায়? কিংবা অনৈতিক? তাতে কি এই সরকারকে বৈধতা দিয়ে দেওয়া হয়? 

আচ্ছা, আরেকটু সহজ করে ব্যাপারটা বোঝা যায়। এই সরকারকে অবৈধ, কিংবা ন্যূনতম অনৈতিক সরকার মনে করে এরকম মানুষ এই দেশে কোটি কোটি রয়েছে বলে আমি মনে করি। এখন সেসব মানুষেরই এই দেশে জীবনযাপনের জন্য নানারকম প্রয়োজন হয়, যার জন্য সরকারের কাছে যেতে হয়। কারও যখন বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংযোগ লাগে, তখন তাকে এই সরকারের কাছেই যেতে হয়। এরকম আরও অসংখ্য ব্যাপার আছে, যেগুলোর জন্য প্রত্যেককে এই সরকারের কাছেই যেতে হয়। 

এই যাওয়ায় আসলে কোনও সমস্যা নেই। মানুষ আসলে যে সুবিধাগুলো চাইছে এগুলো রাষ্ট্রের সুবিধা, এগুলো পাওয়া একজন নাগরিক হিসেবে তার অধিকার। একটা সরকার রাষ্ট্রের অনেক সেবা পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাই যেমন সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তার কাছে আমাদের যেতে হয় রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার জন্য। এই যাওয়ার বাধ্যবাধকতা সেই সরকারকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। 

আমেরিকা যখন ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নেই, এই যুক্তিতে বেশকিছু কলোনি এক সময়ে ব্রিটেনকে কর দিতে অস্বীকার করেছিল। সেই সময় একটা স্লোগান বিখ্যাত হয়েছিল—‘নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন’। আমার মতে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের নামে যা হয়েছে তাতেও এই কথা আমরা জনগণ খুব স্পষ্টভাবেই বলতে পারি—এই সংসদে আমাদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নেই, তাই আমরাও এই সরকারকে ট্যাক্স দেবো না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, কর আদায় করার ন্যূনতম নৈতিক অধিকার এই সরকারের নেই। কিন্তু দেখুন, আমরা সবাই কর দিতেও বাধ্য হচ্ছি সরকারকে। আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কর তো বটেই, প্রতিটা পণ্য কেনার সময় প্রতিটা মানুষকে ভ্যাট এবং অন্যান্য পরোক্ষ কর দিতে হয়। তাহলে তো আমরা কোটি কোটি মানুষ মিলে এই সরকারকে কর দিয়ে এবং এই সরকারের কাছে নানা সেবা পাওয়ার আবেদন নিয়ে গিয়ে তাকে বৈধতা দিচ্ছি। ব্যাপারটা তো এমন নয়।
বিএনপি’র সব সংসদ সদস্য বরাদ্দ বেতনভাতা গ্রহণ করছেন, শুল্কমুক্ত গাড়ির আবেদন করছেন, তাহলে কি এসব এই সরকারকে এবং সংসদকে বৈধতা দিয়ে দেওয়া হলো। সংসদ সদস্যদের জন্য প্লট-ফ্ল্যাট কিংবা শুল্কমুক্ত গাড়ি পাওয়ার মতো প্রাধিকার থাকা উচিত কিনা সেটা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতেই পারি। কিন্তু এই আইনগত সুবিধা নেওয়াতে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও সমস্যা দেখি না। কারণ তারা এই সুবিধা নিচ্ছেন রাষ্ট্রের, এই সুবিধা সরকারের দয়ায় নয়। ঠিক এ কারণেই আমি বিশ্বাস করি রুমিন ফারহানা ভবিষ্যতেও সরকারের সঙ্গে আপস করবেন না, সরকারের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী ভূমিকা থেকে সরে আসবেন না।

আমরা এমন একটা বিষয় নিয়ে অনেক বেশি সরব হলাম, যেটার মধ্যে বেআইনি কিংবা অনৈতিক কিছু নেই। আমাদের এই ভুল কখনও করা চলবে না। সরকার রাষ্ট্র তো‌ নয়‌ই, রাষ্ট্রের মালিক‌ও নয়। আমি আশা করি আমরা এই ব্যাপারটা নিয়ে সচেতন হয়ে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে চিনতে শিখবো, যাতে একটা সরকার কিংবা একজন ব্যক্তি রাষ্ট্র হয়ে উঠতে না পারেন। 

তখন আমরা যাবতীয় সবকিছু সরকার বা একজন ব্যক্তির কাছে চাইবো না। তখন আমরা আমাদের ওপর কোনও অবিচার হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইবো না। আমরা তখন বুঝবো এই রাষ্ট্রের একটা আলাদা অঙ্গ আছে, বিচার বিভাগ এবং সেটার ওপর সরকারের কোনও প্রভাব রাখার ক্ষমতা নেই। সেরকম একটা রাষ্ট্র গঠনের লড়াই এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান লড়াই হওয়া উচিত।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

/এসএএস/এমএমজে/

x