আসাম নিয়ে নীরব কেন ঢাকা!

আনিস আলমগীর ১৪:৩৮ , সেপ্টেম্বর ১০ , ২০১৯

আনিস আলমগীরজেনারেল নে উইন ১৯৫৮ সালে বার্মার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়েছিলেন। তখন থেকে বছরের পর বছর তারা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে গেছে আর সর্বশেষ বড় অংশকে মেরেকেটে বাংলাদেশে পাঠিয়ে পুরো রাখাইন রাজ্যকে প্রায় রোহিঙ্গাশূন্য করে দিয়েছে মিয়ারমারের বর্তমান শাসকরা।
জেনারেল নে উইন যে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি বলে রাখাইন ছাড়া করেছে, ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় আসাম থেকে মুসলমানদের তাড়ানোর প্রক্রিয়া সবে আরম্ভ করেছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারত সরকারও ঠিক একই রকম কৌশল অবলম্বন করে নাগরিকপঞ্জির আড়ালে আসামে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ১৯ লাখ ছয় হাজার ৬৫৭ অসমীর নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। গত ৩১ আগস্ট ২০১৯ সরকার যেই ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স-এনআরসি প্রকাশ করেছে, তাতে ১৯ লাখের মধ্যে ৬ লাখ মুসলমান। দুই লাখ গোর্খাসহ অন্যরা। বাকি ১১ লাখ বাঙালি হিন্দু।

নাগরিকপঞ্জিতে যাদের নাম ওঠেনি তাদের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে আসামের গোয়ালপাড়ায় প্রথম এক্সক্লুসিভ ডিটেনশন সেন্টার নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। এই নির্মাণে খরচ হচ্ছে ৪৫ কোটি রুপি। আরও ১১টি ডিটেনশন সেন্টার নাকি তৈরি করা হবে।

দ্রুত নাগরিকপঞ্জির বিষয়টি শেষ করার জন্য কয়েক শত ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে যাদের নাগরিকত্ব প্রমাণিত হবে না তাদের এসব ক্যাম্পগুলোতে রাখা হবে। এ পর্যন্ত আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো এক লাখ মানুষকে বিদেশি ঘোষণা করেছে। ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যথেচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। সঠিকভাবে আবেদনকারীর আবেদন শুনছেন না।

নাগরিকপঞ্জির তালিকা থেকে বাদপড়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুধু নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না মুসলমানদের। শেষ পর্যন্ত হয়তো ছয় লাখ মুসলমানকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। সম্ভবত ১১ লাখ হিন্দু এবং ২ লাখ অন্যান্য জাতি-ধর্মের লোকদের আসামে থাকতে দেবে না অসমীরা। হয়তো তারা ভারতের অন্যত্র গিয়ে বসতি করবে। এর আগেও আন্দামান-নিকোবরের মতো দণ্ডকারণ্যে বহু বাঙালির বসতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

যখন নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ হতে যাচ্ছিল তার আগে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। সফরকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, আসামের নাগরিকপঞ্জির বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। অথচ আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় ১৯ লাখ লোক বাদ পড়ার একদিন পরেই রাজ্যটির অর্থমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, ‘১৪-১৫ লাখ বিদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশকে তাদের এই ১৪-১৫ লাখ লোককে ফিরিয়ে নিতে বলা হবে।’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

অন্যদিকে এনআরসি প্রকাশের পর এ নিয়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনার মধ্যে দুই দিনের সফরে ৮ সেপ্টেম্বর আসাম সফর করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। সেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, প্রত্যেক অবৈধ অভিবাসীকে ভারত থেকে বের করে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার।

ভারত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আসামের অর্থমন্ত্রীসহ বিজেপি নেতাদের একজনের এক কথা শোনার পরও অত্যন্ত আশ্চর্য লাগছে বাংলাদেশ সরকারের নীরবতা দেখে। আসামের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই ঢাকাস্থ ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে কড়া প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। কড়া প্রতিবাদ না করলে ১৫ লাখ না হোক, ৬ লাখ মুসলমানকে একসময় রোহিঙ্গাদের মতো বাংলাদেশে ঠেলে দেবে ভারত। বাংলাদেশকে এখন থেকে সতর্ক হতে হবে আসামের নাগরিকত্বহীন মানুষদের নিয়ে। বিজেপি সভাপতি এর আগে বিভিন্ন জনসভায় আসামের কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বললেও আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের আগে এই বক্তৃতায় তাদের কোন দেশে পাঠাবেন তা মুখে আনেননি।

ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানো আর আরএসএসের এজেন্ডা নিয়ে বিজেপি সরকার অগ্রসর হচ্ছে। অমিত শাহ কাজ করছেন আর নরেন্দ্র মোদি প্রলেপ দিচ্ছেন। এই জুটি কিন্তু অটল বিহারি বাজপেয়ি আর লালকৃষ্ণ আদভানি জুটির মতো নয়। গুজরাটে এরা ক্ষমতায় থাকতেই ২০০২ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষ মারা গেছে। মনে রাখতে হবে, এরা আরও বহুদিন ধরে ভারতের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে। কারণ, বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সত্য অভিযোগ তোলার পরও ভারতীয় ভোটাররা সেসব কানে নেয়নি। মোদি সরকারের চাক্ষুষ ব্যর্থতা তারা উপেক্ষা করে হিন্দুত্বের আফিম খেয়ে বুঁদ হয়ে আছে।

এবার ভারতের জাতীয় প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। কী সরকার, কী ভোটার—কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই দেশের অর্থনীতির এই বেহাল দশায়। ডলারের সঙ্গে দরপতন হচ্ছে দ্রুত। সরকার দফায় দফায় গাড়ি, ব্যাংক শিল্পকে চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নিলেও অবস্থা বেগতিক। লোকজন চাকরি হারাচ্ছে। বেকারত্ব বেড়েই চলছে। মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছেন। এখন দ্বিতীয় মেয়াদ চলছে অথচ কোনও ভালো অর্থমন্ত্রী নিয়োগ দিতে পারেননি।

যেখানে ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভার মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী, সেখানে স্মৃতি ইরানির মতো অর্ধশিক্ষিত এক মহিলাকে মোদি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী করেছিলেন তার প্রথম মন্ত্রিসভার। স্মৃতি ইরানি নিজেই বলেছেন ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এয়ার হোস্টেসের চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলেন তিনি। ইন্টারভিউতে ফেল করে, কয়েক বছর টিভি সিরিয়ালের নায়িকা সেজে তুমুল জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি বিজেপির রাজনীতিতে যোগদান করেন।

যাক, এখন নাকি আসামের পর পশ্চিমবাংলা, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা আর দিল্লিতে নাগরিকপঞ্জির কাজ শুরু করবে মোদি সরকার। দিল্লির বস্তিতেও নাকি দশ লাখ বাঙালি আছে আর তারা নাকি বাংলাদেশি। নিজ দেশের মুসলমান নাগরিকদের কাল্পনিক শত্রুপক্ষ বানানো এবং সবাইকে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানপ্রেমী ভাবার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লি ও মুম্বাইতে লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি আবিষ্কারও ভারতের বর্তমান শাসকশ্রেণির একটি বাতিক বলতে হবে। দিল্লি-মুম্বাইর পর এবার তারা আবিষ্কার করেছে ব্যাঙ্গালোরের নানা বস্তিতে হাজার হাজার ‘বাংলাদেশি’ অবৈধভাবে বাস করছেন। গত ডিসেম্বরে ব্যাঙ্গালোরে হাজার হাজার গরিব বাংলাভাষীকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’র তকমা দিয়ে উচ্ছেদ অভিযানেও নেমেছিল তারা।

এর আগে ১৯৯৮ সালে ক্ষমতায় এসেও বিজেপি এমন জিকির তুলেছিল। প্রায় এক যুগ আগে দৈনিক আজকের কাগজের রিপোর্টার হিসেবে আমি দিল্লির যমুনা তীরের বস্তিতে একদিন সারাবেলা ঘুরে মাত্র ২ জন বাংলাদেশি মহিলাকে খুঁজে পেয়েছিলাম, যারা ছিল আপন বোন এবং অনেক বছর আগে সেখানে গিয়ে বিয়ে করে আটকা পড়েছিল। বস্তিতে কোনও বাংলাভাষী দেখলেই অন্যভাষার লোকজন ভাবে এরা ‘অবৈধ বাংলাদেশি’।

পশ্চিমবাংলায় বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অর্থাৎ রাজ্য সরকারের তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, জাতীয় কংগ্রেস সবাই নাগরিকপঞ্জির বিরোধিতা করছে। সম্মিলিত বিরোধিতা উপেক্ষা করে মোদি পশ্চিমবাংলায় নাগরিকপঞ্জির উদ্যোগ নিতে যাবেন কিনা জানি না, তবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে পশ্চিমবঙ্গে এক কোটি মুসলমানকে নাগরিকপঞ্জির আওতায় নাগরিকত্বহীন করতে হবে। তা পারলে বিজেপি আগামী ২০২১ সালের নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে রাজ্য সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ খুবই তৎপর ও উদ্যোগী ব্যক্তি। তারা সমাজের সর্বস্তরে হিন্দু জাগরণের চেষ্টা করছেন এবং ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সবকিছুকে ভারতীয় জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে তৎপর হয়েছেন। তাদের দল বিজেপি বহুত্ববাদের কণামাত্র বিশ্বাস করে না। দীর্ঘ ৭০০ বছর ভারতে মুসলমানেরা শাসন করার কারণে ভারতীয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইসলামী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এখন মোদি-অমিত শাহ এবং তাদের সংঘ পরিবার তা ঝেটিয়ে বিদায় করতে বদ্ধপরিকর।

দিল্লির অনতিদূরে একটা বড় রেলওয়ে স্টেশন আছে, তার নাম মোগল সরাই স্টেশন। এখন তারা তার নাম পরিবর্তন করে রেখেছে দিন্দয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘প্রয়াগ’ এবং আহমেদাবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘কর্ণবতী’ রাখারও প্রস্তাব করেছে বিজেপি। দশরথের নামে নাকি হাসপাতাল আর রামের নামে নাকি বিমানবন্দর করার প্রক্রিয়াও চলছে। পোর্ট ব্লেয়ার বিমানবন্দর হলো ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রধান বিমানবন্দর। পোর্ট ব্লেয়ার এয়ারপোর্টের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে বীর সাভারকর এয়ারপোর্ট।

মুসলমানের সাত শত বছর আর ব্রিটিশের দুই শত বছরে হিন্দুদের গৌরবময় কোনও ঘটনা আছে কিনা অনুসন্ধান করে লাভ নেই। সম্ভবত তাই নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসক ও মেডিক্যাল স্টাফদের এক সমাবেশে হিন্দুদের দেবতা গণেশের কাহিনি তুলে ধরে বলেন, গণেশের মাথা হলো হাতির। আর তা যুক্ত হয়ে আছে মানবীয় শরীরের সঙ্গে। এতে প্রমাণিত হয় প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জারির প্রচলন ছিল। বিজেপি নেতাদের আবিষ্কারের তালিকা অনেক দীর্ঘ ও হাস্যকর। রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বলেন, গরুর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটিই হলো বিশ্বে একমাত্র পশু, যা অক্সিজেন গ্রহণ এবং ত্যাগ করে।   

আসলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ এবং সংঘ পরিবার হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে ভারতে একটা ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইছেন। বাস্তবে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাঠামোগত কোনও রূপরেখা হিন্দু ধর্মে দেওয়া নেই। ছত্রপতি শিবাজী যেমন মারাঠা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তাকে হিন্দু রাষ্ট্রের কাঠামো দিতে গিয়ে রাষ্ট্রটির পতন ডেকে এনেছিলেন, এখন মোদির কারণে ভারত ছত্রভঙ্গ হয় কিনা সেটা নিয়েই উদ্বিগ্ন ভারতের বুদ্ধিজীবী সমাজ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

x