আপনি ভলতেয়ারপন্থী না স্ট্যালিনপন্থী?

প্রভাষ আমিন ১৬:৩৮ , অক্টোবর ২০ , ২০১৯

প্রভাষ আমিনবুয়েটছাত্র আবরার হত্যার পর থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবিটি আবার সামনে এসেছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। কারণ এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, মত প্রকাশের অপরাধেই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে মেরেছে আবরারকে। তাই মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার সবাই। এই আলোচনাটা আমার দারুণ লাগছে। আমি সবসময় মত প্রকাশের সর্বোচ্চ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি জানি, স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করতে পারাটা মানুষের অন্তর্গত চাহিদা। মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকবে, কিন্তু তাও গলা খুলে বলতে চাইবে। এই যে দেশে এত উন্নয়নের পরও মানুষ এত অসন্তুষ্ট কেন? কারণ মানুষ মন খুলে কথা বলতে পারে না। সবসময় ঘাড়ের ওপর যেন চাপাতি নিয়ে অপেক্ষা করে অদৃশ্য আততায়ী।
বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি খুব ভালো নয়। নানা আন্তর্জাতিক সূচকে বারবার গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকেই থাকে। দুই সপ্তাহ আগে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি কলামেই লিখেছিলাম, ‘ইদানীং বাংলাদেশে সরকারের বিরোধিতাকেই রাষ্ট্রবিরোধিতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললেই রাষ্ট্রবিরোধিতার মামলা হয়।’—এই ভয়টাকেই জয় করা যাচ্ছে না।

এটা ঠিক মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি একেবারেই রসাতলে গেছে, তেমন বলা যাবে না। কারণ আগে মত প্রকাশের এত মাধ্যম ছিল না। এখন কিছু হলেই গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে, এই সুযোগই তো আগে ছিল না। প্রতি রাতে যে ২৬টি টেলিভিশনে টকশো হয়, তার সবই তো সরকারি দলের লোকেরা করে না। বিরোধী দলের নেতারাও টকশো’তে অংশ নেন এবং সরাসরি সম্প্রচারিত শো’তে তারা তাদের কথা মন খুলেই বলেন। আবরার হত্যার পর যেসব জায়গায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এত আলোচনা, সেটিও কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়? কেউ কি আবরারকে নিয়ে ছাত্রলীগ আর সরকারকে গালাগাল করতে বাধা দিয়েছে? দাবি করার আগেই সরকার আবরার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করেছে, তারপরও বুয়েটের শিক্ষার্থীরা কোনও বাধা ছাড়াই আন্দোলন চালিয়ে গেছে। তারপরও মত প্রকাশ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। অনেক কথা বলা যায়, তবে সব কথা নয়।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে এই আলোচনার মধ্যেই দুদিন আগে নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়া নিয়ে ফেসবুকে যেন সুনামি বয়ে গেলো। অনেকেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবিতে আরও সোচ্চার হলেন। নুরুল কবীরের রেফারেন্স দিয়ে তার বন্ধু অধ্যাপক আজফার হোসেন ফেসবুকে লিখলেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। নুরুল কবীরকে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে আজফার হোসেন লিখেছেন, কমপক্ষে আরও ১০০ জন এই দাবি তুললে হয়তো সে ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা ফিরে পাবে। তিনি তার স্ট্যাটাসটি কপি-শেয়ার বা আলাদাভাবে এই দাবি তোলার অনুরোধ জানান। এরপর দ্রুতই আজফার হোসেনের স্ট্যাটাসটি ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই তার স্ট্যাটাসটি শেয়ার করেন বা নুরুল  কবীরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে স্ট্যাটাস দেন। 

আজফার ভাই জ্ঞানী মানুষ। তার প্রজ্ঞার প্রতি আমাদের ভালোবাসা সেই আশির দশক থেকেই। কিন্তু তার স্ট্যাটাসটি আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আজফার ভাইকে আমি যতটুকু চিনি, কারো মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে, অবশ্যই তিনি তার পাশে দাঁড়াবেন। আর নুরুল  কবীর তো তার বন্ধু। আমি নুরুল  কবীরেরও গুণমুগ্ধ-ভক্ত। আমি যখন ভোরের কাগজের রিপোর্টার, নুরুল কবীর তখন ডেইলি স্টারে ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে অ্যাসাইনমেন্ট শেয়ার করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী সাংবাদিক নুরুল  কবীর। আমাদের সাংবাদিকদের প্রায় সবাই কোনও না কোনও দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাংবাদিক ইউনিয়নও দুই ভাগে বিভক্ত—একটা আওয়ামীপন্থী, আরেকটি বিএনপিপন্থী। তাই সাংবাদিকদের মধ্যে কিছু বিএনপি আমলে বিপ্লবী, কিছু আওয়ামী লীগ আমলে। একমাত্র নুরুল  কবীরই সব সরকারের আমলেই সমানভাবে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরেন। বিশেষ করে ১/১১ সরকারের সময় তার সাহস দেখে আমি নিজেই ভয় পেয়েছি মাঝে মধ্যে। তার সব মতের সঙ্গে আমার সবসময় মেলে না। কিন্তু আমি চাই তিনি যেন সবসময় সমান সাহসের সঙ্গে তার কথা বলে যেতে পারেন। তার মতো একজন সাহসী সম্পাদক আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। ফেসবুকে তিনি তেমন সক্রিয় নন, তবে তার অ্যাকাউন্টটি বন্ধ হয়ে যাওয়া অবশ্যই হতাশার। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি এটি হতেই পারে। নিয়মিত অনেকের ক্ষেত্রে এটি ঘটছে। আবার এও মানি, আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়া আর নুরুল  কবীরের অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়া এক নয়। তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়াটা অবশ্যই বড় খবর। কিন্তু প্রতিবাদের কারণটা বুঝতে আমার সমস্যা হয়েছে। 

যে কারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধের বিষয়টি দু’ভাবে হতে পারে—ব্যক্তিগতভাবে কেউ নুরুল  কবীরের ফেসবুক হ্যাক করতে পারে অথবা কারও সংঘবদ্ধ রিপোর্টের ভিত্তিতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তার অ্যাকাউন্টটি সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। গত ডিসেম্বরে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আমার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছিল। এক মাস ধরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, অফিসের পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করে অ্যাকাউন্ট ফেরত পেয়েছিলাম। আমার বন্ধুদের অনেকে অ্যাকাউন্ট আর ফেরতই পাননি। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকনের অ্যাকাউন্ট গায়েব হয়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও দুই লাখ ফলোয়ারসহ সেই অ্যাকাউন্টটি ফেরত পাননি। আইডি ফেরত দেওয়া না দেওয়াটা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে। হতে পারে, সুযোগ থাকলে সরকার তার কট্টর সমালোচক নুরুল  কবীরসহ আরও অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতো। কিন্তু আমি যতদূর জানি, এখন পর্যন্ত কারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার ক্ষমতা অর্জন করেনি বাংলাদেশসহ কোনও দেশের সরকার। তাই নুরুল  কবীরের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সঙ্গে ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ’ এর কোনও সম্পৃক্ততার সুযোগ এখনও নেই। 

আজফার হোসেন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আরও ১০০ জন এমন দাবি জানালেই নুরুল  কবীর তার অ্যাকাউন্ট ফেরত পাবেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এটাও অসম্ভব মনে হচ্ছে। দাবিটা কার কাছে জানাতে হবে? যদি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেই থাকে, তাহলে ১০০ জন দাবি করলেই সেটা খুলে দেবে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। আর ফেসবুক করলে ১০০ কেন, এক লাখ লোক দাবি করলেও লাভ হবে না। এটা যার অ্যাকাউন্ট, তাকে ফেসবুকের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হবে। এক্ষেত্রে নুরুল কবীর কোনও আইটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

আমি চাই নুরুল কবীর দ্রুতই তার অ্যাকাউন্ট ফেরত পান। চাই তার কণ্ঠস্বর সোচ্চার থাকুক। কিন্তু আমি নুরুল কবীরের অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে স্ট্যাটাস দেইনি। যারা দিয়েছেন, তাদের কাছে জানতে চেয়েছি, কার কাছে দাবি জানাচ্ছেন। কোনও জবাব পাইনি। বরং সরকার নুরুল কবীরের ফেসবুক আইডি বন্ধ করতে পারে না, এটা লিখে প্রচুর গালি খেয়েছি। যার সবচেয়ে শালীন গালি ‘দালাল’।

যারা নুরুল কবীরের ফেসবুক আইডি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার, তারা আসলে আইডি ফিরে চান না, চাইলে তাকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করারই পরামর্শ দিতেন। তারা আসলে এই সুযোগে এই সরকার কতটা স্বৈরাচারী, তা প্রমাণ করতে চান। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বলার মতো অনেক কথা আছে—ভোটাধিকার হরণ করা, মানবাধিকার লুণ্ঠন করা, ব্যাংক-শেয়ারবাজার লুট করা ইত্যাদি। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার অভিযোগ আনাটা বোকামি, জানার ঘাটতি; এটা অনেকটা ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালানোর মতো।

যারা এ অভিযোগ আনছেন, তারা তাদের অভিযোগের যুক্তি হিসেবে কয়েক মাস আগের একটি নিউজের লিংক শেয়ার করছেন। সে নিউজে আছে—‘মোস্তাফা জব্বার বলেন, রাষ্ট্রের এখন সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হচ্ছে, রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে যেকোনও ওয়েবসাইটকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি বড় অর্জন। তবে সামাজিক মাধ্যমে যখন স্ট্যাটাস দেওয়া হয় বা ভিডিও প্রচার করা হয়, সেগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আশা করছি, শিগগিরই এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষমতা অর্জন হবে। আগামী সেপ্টেম্বরের পর এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা যাবে। তখন ইচ্ছেমতো ফেসবুক বা ইউটিউবে কিছু প্রচার করা যাবে না।’ অভিযোগকারীরা বলছেন, মোস্তাফা জব্বার নিশ্চয়ই এতদিনে ফেসবুকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। মোস্তাফা জব্বার ফেসবুক বা ইউটিউবের ওপর নিয়ন্ত্রণ বলতে কী বুঝিয়েছেন, তা জানি না বা তিনি আদৌ ফেসবুক-ইউটিউবকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছেন কিনা, তাও জানি না। যদি সত্যি মোস্তাফা জব্বার কারও ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার ক্ষমতা অর্জন করে থাকেন, তাহলে তাকে গালি না দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া উচিত। কারণ তিনিই তাহলে পৃথিবীর প্রথম টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, যার এত ক্ষমতা আছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর ভিন্নমতের শ্রদ্ধা বা পরমতসহিষ্ণুতার একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। কিন্তু মজাটা হলো আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই বটে, কিন্তু ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা তো দূরের কথা, সামান্য সহনশীলতাও নেই। ভিন্নমতের ব্যাপারে আমরা সবাই জিরো টলারেন্স। যারা নুরুল কবীরের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চান, তারাই আবার আমার গলা টিপে ধরতে চান। আবরার হত্যার পরও একই ঘটনা ঘটেছে। সবাই মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে চিরবিদ্রোহী। কিন্তু প্রবাসী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের একটি স্ট্যাটাস পছন্দ হয়নি বলে সবাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। চরম অশ্লীল গালিগালাজ তো আছেই, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, দেশে থাকলে তাকে এই দফায় আবার দেশ ছাড়তে হতো। সবার মত একরকম হবে না। ভিন্নমতেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কারও মতের সঙ্গে না মিললে আমি যুক্তি দিয়ে তার মত খণ্ডন করবো। পাল্টা মত দেবো। কিন্তু আমরা দেই গালি। তাও দুর্বল বলে গালি দেই। সবল হলে পিটাই বা চাপাতি দিয়ে কোপাই। এই আমরাই আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গলা ফাটাই।

ভিন্নমত নিয়ে ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস উদ্ধৃত করে লেখাটি শেষ করছি—‘সকল ভিন্নমতই কারও না কারও কাছে সহমত। এবং প্রত্যেকেই এক একটি সহমত ভাই। ভিন্নমত যতক্ষণ সহমতের লক্ষ্মণরেখার ভেতরে থাকে, ততক্ষণ ভলতেয়ারগিরি ঠিক আছে। গণ্ডি পার হলেই ভলতেয়াররা স্ট্যালিন হয়ে ওঠে।’

আপনি ভলতেয়ারপন্থী না স্ট্যালিনপন্থী?

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

x