ছাত্র-শিক্ষক: নিষ্ঠুর সম্পর্ক!

রেজানুর রহমান ১৬:৫৪ , নভেম্বর ০৪ , ২০১৯

রেজানুর রহমানএকজন ছাত্র যখন একজন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে, তখন দায়টা কার ওপর বর্তায়? ছাত্রের ওপর? নাকি শিক্ষকেরও এখানে একটা দায় আছে? অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন। ছাত্র পেটালো অথবা লাঞ্ছিত করলো শিক্ষককে। কাজেই দায়টা তো ছাত্রের ওপরই বর্তায়। সেখানে শিক্ষকের দায়টা কোথায়? যদি বলি এখানে শিক্ষকেরও দায় আছে। পরিবারের কোনও সদস্য যদি ভুল করে, তাহলে তার দায় পড়ে যায় পরিবারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর। অর্থাৎ মা-বাবার ওপর। কারণ বাবা-মা হয়তো তার সন্তানের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সেজন্যই সন্তান বিপথগামী হয়েছে। একইভাবে ছাত্র যদি ভুল করে অথবা কোনও অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তাহলে তার দায়-দায়িত্ব কি শিক্ষকের প্রতি বর্তায় না? কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তো বৃহৎ অর্থে একটি পরিবার। কাজেই এই পরিবারের কোনও সদস্য যদি ভুল করে অথবা মারাত্মক কোনও অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না।
২ নভেম্বর ২০১৯, শনিবারের ঘটনা। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে লাঞ্ছিত করেছে তারই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একদল শিক্ষার্থী। দেশের বিভিন্ন দৈনিকে এনিয়ে লোমহর্ষক কিছু সংবাদ শিরোনাম প্রকাশ করা হয়েছে। দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে, ‘অধ্যক্ষকে টেনে নিয়ে পুকুরে নিক্ষেপ’। মানবজমিন শিরোনাম করেছে ‘রাজশাহীতে অধ্যক্ষকে পানিতে ডুবালো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা’। কালের কণ্ঠ শিরোনাম করেছে, ‘অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলে দিলেন ছাত্রলীগ নেতা’। দৈনিক সমকাল শিরোনাম করেছে, ‘অধ্যক্ষকে হেনস্তা করে পুকুরে ফেলল ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা’। যুগান্তর শিরোনাম করেছে, ‘অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিতের পর পুকুরে ফেলে দিলো ছাত্রলীগ’। ইত্তেফাক শিরোনাম করেছে, ‘রাজশাহী পলিটেকনিকে অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলল ছাত্রলীগ’। পত্রিকার শিরোনামগুলো পড়ে বেশ কিছুক্ষণ বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ সময় কাটলো। একজন শিক্ষকের প্রতি এ কেমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য খেলা। একজন সাধারণ মানুষকেও তো কেউ এভাবে লাঞ্ছিত করার সাহস দেখায় না। সেখানে একজন অধ্যক্ষ তারই ছাত্র কর্তৃক লাঞ্ছিত হলেন। এই ঘটনা এতটাই অশোভন ও অমানবিক যে, নিন্দা করারও ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

আচ্ছা, আমরা কি একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানি? স্কুল, কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাচার্য আসলে কে? তারা কি কোনও সাধারণ মানুষ? ইচ্ছে করলেই যে কেউ তার বা তাদের ওপর চড়াও হতে পারে? কটু কথা বলতে পারে? শ্রদ্ধা, সমীহ ও বিনয়ের জায়গা থেকে তো একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের প্রতি একজন শিক্ষার্থীর মাথা নত থাকার কথা। সেখানে মাথা নত থাকা তো দূরের কথা, সামান্যতম শ্রদ্ধাও পেলেন না একজন সম্মানিত অধ্যক্ষ। কেন পেলেন না? একজন শিক্ষকের প্রতি এই যে এতো ‘তুচ্ছ তাচ্ছিল্য’ আচরণ করা হলো, তার যক্তি কী? এটাকে তো সন্ত্রাসের মারাত্মক রূপ বলা যায়। যারা সম্মানিত অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করেছে, তারা নিশ্চয়ই একজন শিক্ষককে শ্রদ্ধা, সম্মান করার মানসিকতা পোষণ করেন না। কেন করেন না? সরকারি ছাত্র সংগঠন করে বলেই কি তারা অন্যায় কর্মকাণ্ডে এতো সাহস পাচ্ছেন? তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই যে হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন, তা কি উপেক্ষিত হচ্ছে? বুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটনার পর সরকার তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাতে তো সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কোনও নেতাকর্মীর ক্ষেত্রে আর অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সাহস থাকার কথা নয়। কেন তারা সাহস পেলো? কে তাদের সাহস জোগায়?

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ন্যক্কারজনক ঘটনার পর সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জোরদার হয়েছে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ধারাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা রাখার কারণেই না রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ন্যক্কারজনক ঘটনা জনসমক্ষে উঠে এসেছে। অধ্যক্ষকে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে না আসতো, অর্থাৎ সিসি ক্যামেরায় যদি বন্দি না হতো, তাহলে ঘটনাটি কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যেতো না। তখন অধ্যক্ষ চিৎকার করে বললেও তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনা অনেকেই বিশ্বাস করতো না। ভাগ্য ভালো, অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করা অর্থাৎ ধাক্কা দিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা সিসি ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে। তা না হলে অধ্যক্ষের অভিযোগ পাত্তাই পেতো না। বরং অপরাধীরাই হয়তো অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে দিতো। ‘চোরের মার বড় গলা’ বলে একটা কথা আছে। তখন হয়তো চোরের মার বড় গলাই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতো।

আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘চোরের মার বড় গলা’ গুরুত্ব পাচ্ছে না। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সেই সন্ত্রাসী ছাত্রকে ছাত্রলীগ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে। ইনস্টিটিউটের শিক্ষক পরিষদ অভিযুক্ত ছাত্রসহ তার সহযোগীদের ইনস্টিটিউট থেকে আজীবন বহিষ্কারের দাবি তুলেছে। সেই সঙ্গে ইনস্টিটিউটে কিছু সময়ের জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখার দাবিও তোলা হয়েছে। বর্তমান সময়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি আরও অনেকেই করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু একটা ঘটলেই ছাত্র রাজনীতিকেই প্রথম দোষারোপ করা হয়। যেন ছাত্র রাজনীতিই সকল নাটের গুরু। আসলে কি তাই? মাথাব্যথা হয়েছে বলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে! মাথাব্যথা সারার ওষুধ তো আগে ব্যবহার করা দরকার।

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আসলে কী ঘটেছিল? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী একজন ছাত্র জানিয়েছেন, ‘দুপুরে মসজিদে নামাজ পড়ে অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। হঠাৎ ছাত্রলীগের ইনস্টিটিউট শাখার সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেনসহ কয়েকজন ছাত্র হঠাৎ অধ্যক্ষের পথ রোধ করে। ‘কথা আছে’ বলে পাশেই পুকুরের ধারে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়। অধ্যক্ষ রাজি না হলে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।’ একটি জাতীয় দৈনিকে অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের নেতারা আমার কাছে অন্যায় দাবি নিয়ে আসতো। তাদের অন্যায় দাবিকে আমি কখনও পাত্তা দিতাম না। সেজন্য তারা আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ক্লাসে পর্যাপ্ত হাজিরা না থাকলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়া হয় না। এটাই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম। অথচ দু’জন ছাত্র এই নিয়ম ভাঙার জন্য আমাকে চাপ দেয়। আমি তাদের অন্যায় আবদার না মানার কারণে আমার ওপর চড়াও হয়।

আসলে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের অনেকেই ক্লাস ও পরীক্ষা দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন না। বিশেষ করে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের অনেকেই ক্লাসে হাজিরা দেন না। তবে পরীক্ষার আগে চড়াও হন প্রতিষ্ঠান প্রধানের ওপর। সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা এক্ষেত্রে দাপট দেখান বেশি। সময়টাই এমন, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সামলে রেখে প্রতিষ্ঠান চালাতে বাধ্য হন দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ। কে না জানে দেশের অনেক বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী ভর্তি থেকে শুরু করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তদারকি কাজে জড়িত থাকেন সরকারি দলের ছাত্রনেতারা। ‘ঈদ সেলামি’ অথবা নানা খাতে চাঁদা আদায় করা তাদের প্রধান কাজ। অহেতুক ‘ঝুট-ঝামেলার’ ভয়ে অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এটাকেই নিয়ম হিসেবে মেনে নেন। রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সম্মানিত অধ্যক্ষ এই অন্যায় নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন বলেই তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। কাজেই তার পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত!

শেষে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত একটি ভিডিও ফুটেজের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একদল তরুণ একজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে বাদানুবাদে লিপ্ত। হঠাৎ তারা প্রবীণ ব্যক্তিটিকে জোর করে ধরে নিয়ে পাশেই পুকুরের পানিতে ফেলে দিলো। ঘটনার চরিত্র হলো—একজন শিক্ষক, আর কয়েকজন ছাত্র। ছাত্ররা জোর করে শিক্ষককে পানিতে ফেলে দিলো! কী বীভৎস! কী নিষ্ঠুর ঘটনা!

পাঠক, লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। আপনাদেরও কি তাই মনে হচ্ছে!

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

x