আওয়ামী লীগের ‘শুদ্ধ’ হওয়ার প্রস্তুতি

বিভুরঞ্জন সরকার ১৫:৪৪ , নভেম্বর ০৫ , ২০১৯

বিভুরঞ্জন সরকারবাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৮ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে জন্ম। ১৯৫৪ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে সব আওয়াম বা সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের দল হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের রাজনীতির যারা প্রাণপুরুষ, তারা প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ করেছেন এবং এদের কেউ কেউ আবার আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীও দল প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরেই এই দল ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ গঠন করে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেক নামডাকওয়ালা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আওয়ামী লীগে ছিলেন, কিন্তু দলটিকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে জনপ্রিয় দল হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যার একক অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু হিসেবে যিনি এখন সবার কাছেই পরিচিত। বাঙালি জাতিকে একটি মর্যাদার আসনে বসাতে হলে তাদের একটি স্বাধীন আবাসভূমি প্রয়োজন—এটা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই।
মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিলেও তা যে বাঙালি মুসলমানের স্বার্থের পরিপন্থী ভূমিকা পালন করবে, সেটা রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রনেতারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে স্বীকৃতি দিয়ে। পাকিস্তানে বাঙালিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার মধ্য দিয়েই শাসকগোষ্ঠীর দুরভিসন্ধির প্রকাশ ঘটেছিল। তরুণ বাঙালি নেতা বুঝেছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের কাছ থেকে ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও মর্যাদা পেতে হলে লড়তে হবে। আর লড়াইয়ের উপযুক্ত হাতিয়ার হলো একটি জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকেই, তার সেই উপযুক্ত দল মনে করে দলটিকে তার মতো করে গড়ে তুলেছিলেন। আওয়ামী লীগের ব্যানারেই তিনি তার বক্তব্য মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি যত বেশি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়েছেন, তত বেশি রোষানলে পড়ছেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। জেল-জুলুম ছিল তার নিত্যসঙ্গী। পাকিস্তানের আয়ুষ্কালের অর্ধেকের বেশি সময় শেখ মুজিবকে কারাগারে থাকতে হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির কয়েকজন নেতা ছাড়া আর কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও নেতাকে শেখ মুজিবের মতো এতো দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়নি। কমিউনিস্টরা জেল খেটেছেন বেশি, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি, মানুষ কমিউনিস্টদের সমীহ করলেও, তাদের পক্ষে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তি জোগায়নি।

কিন্তু শেখ মুজিব মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য মানুষের মনে ধরেছে। মানুষ তাঁকেই তাদের নেতা মেনেছে। তিনি ক্রমান্বয়ে যতই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছেন, তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগও ততই শক্তি সঞ্চয় করেছে। আওয়ামী লীগের সংগঠন তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

পাকিস্তানি গণবিরোধী স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যে লড়াই-সংগ্রাম, তাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব। তাঁর দল আওয়ামী লীগ ছিল তাঁর শক্তির উৎস। এটাও ঠিক, তিনি বরাবর মস্কোপন্থী হিসেবে পরিচিত বাম রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া বিজয় অর্জন করে। তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশে জাতীয় সংসদের ১৬৮ আসনের মধ্য মাত্র দুটি আসন বাদ দিয়ে বাকি সব পায় আওয়ামী লীগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা সরকারপ্রধান হবেন—এটাই হওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তানকে মৃত্যুর পথেই ঠেলে দিলো।

বাঙালি প্রথম অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব শেষমুহূর্ত পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির ওপর রাতের অন্ধকারে সামরিক আক্রমণ চালানোর পর বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন। তারপর নয় মাসের মরণপণ যুদ্ধের মধ্যদিয়ে রচিত হলো নতুন ইতিহাস, প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। কারণ এই দলের প্রতি ছিল জনগণের ম্যান্ডেট। অন্য কেউ বা অন্য কোনও দল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, তা নয়। তবে সবমিলিয়ে তাদের ভূমিকা ছিল গৌণ।

দুঃখের বিষয় হলো যিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যিনি প্রতিষ্ঠাতা, সেই শেখ মুজিবকেই স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করা হলো। পাকিস্তানিরা যাকে হত্যা করতে পারেনি, ফাঁসির মঞ্চ বানিয়েও তাতে চড়াতে পারেনি যে নির্ভীক ও অসম সাহসী নেতাকে, তাকেই কিনা হত্যা করলো তার নিজ দেশের কিছু মুনাফেক! শেখ মুজিব বিশ্বাস করতেন কোনও বাঙালি তাকে মারতে পারবে না। তিনি বাঙালিদের ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেনি বাঙালি। শেখ মুজিবকে হত্যা করা, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ছিল গভীর এবং সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের অনুসৃত চার জাতীয় মূলনীতি—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ থেকে দেশকে পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাওয়াই ছিল ঘাতক এবং তাদের মদতদাতাদের মূল লক্ষ্য। লক্ষ্য পূরণে তারা সফল হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর হাতে গড়া বিশাল দল আওয়ামী লীগ যে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে, তা বিস্ময়ের। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ নামের বিশাল দলটি যে ওভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে, সেটা সম্ভবত কারও কল্পনাতেও ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের হতবিহ্বলতা কাটাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। যখন দলের মধ্যে অহেতুক কোনও বিষয় নিয়ে বিতর্ক কাম্য ছিল না, যখন দলের মধ্যে মজবুত ঐক্যের প্রয়োজন ছিল বেশি, তখনই দলের মধ্যে দেখা গেছে অনৈক্য, বিভাজন। নতুন ক্ষমতাসীনদের মদতে আওয়ামী লীগে ভাঙন পর্যন্ত হয়েছে। সদম্ভে প্রচার করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আর কোনও দিন ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দলের হাল না ধরলে আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারতো কিনা, সে প্রশ্ন এখন করা যেতেই পারে।

আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা চার মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের নয়, বিশ্বরাজনীতিতেই এটা রেকর্ড। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শুধু পুনর্গঠিতই হয়নি, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করেছে বলে সাধারণভাবে মনে করা হলেও বাস্তব অবস্থা সম্ভবত ভিন্ন। আওয়ামী লীগ এখন আর একটি ঐক্যবদ্ধ সংহত শক্তি নেই। দলের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে দ্বন্দ্ব-বিরোধ। মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিরোধের বিষয়টি নতুন নয়। ক্ষমতার রাজনীতির দুষ্ট ক্ষতে আওয়ামী লীগ ভালোভাবেই আক্রান্ত হয়েছে। দলটির গণবিচ্ছিন্নতা ক্রমেই বাড়ছে। নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগের অনেকেই। সাধারণ মানুষ ত্যক্তবিরক্ত। উপযুক্ত বিকল্পের অভাবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে না। বিরোধী দলের আন্দোলন সরকারকে যতটুকু না বিপাকে ফেলতে পেরেছে, তার চেয়ে বেশি বিপাকে ফেলছে দলের কিছু নেতাকর্মীর বাড়াবাড়ি আচরণ এবং দুর্বৃত্তপনা।

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সতর্ক হয়েছেন। তিনি দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে ব্যাপক পরিবর্তন আনার উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। যারা নানা কারণে বিতর্কিত, যাদের বিরুদ্ধে অন্যায়-অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, তাদের দলের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। আওয়ামী লীগের ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা দূর হবে।

আওয়ামী লীগের নামে যত অপকর্ম হচ্ছে, তার সব নাকি করছে নব্য আওয়ামী লীগাররা, অনুপ্রবেশকারীরা। তাই অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করে তাদের নাকি বাদ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর টেবিলেও নাকি দেড় হাজার অনুপ্রবেশকারীর নাম আছে। অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি অতি মনোযোগ দিতে গিয়ে পুরনো বা জন্মসূত্রে আওয়ামী লীগ করেও যারা অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, অন্যায়কারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তাদের যেন বেকসুর খালাস দেওয়া না হয়। হাইব্রিড খারাপ, অনুপ্রবেশকারীরা খারাপ, কিন্তু পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগাররা ধোয়া ‘তেঁতুলের বিচি’ নয়। খোন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কেএম ওবায়দুর রহমান, তাহেরউদ্দিন ঠাকুররা কিন্তু নব্য আওয়ামী লীগার ছিলেন না। এরা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ অনুচর ছিলেন, কিন্তু বিশ্বস্ত ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বাসঘাতক। যারা বেশি আনুগত্য দেখায়, তারা সব সময় বিশ্বাসী না-ও হতে পারে। অনুপ্রবেশকারীদের হটিয়ে অনুগত অবিশ্বাসীদের নেতৃত্বে বসালে নতুন বিপদ ডেকে আনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

এখন দরকার ভারসাম্যপূর্ণ সুদৃষ্টি। যার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, সেটা যেন তার কার্যকলাপ পর্যালোচনা-মূল্যায়ন করেই নেওয়া হয়। অন্ধ অনুরাগ বা বিরাগ ক্ষতিরই কারণ হয়। তাজউদ্দীন আহমদ এবং খোন্দকার মোশতাকের দৃষ্টান্ত কিন্তু আমাদের চোখের সামনে আছে।

আওয়ামী লীগ শুদ্ধ হোক, দলটি তার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারায় পথচলা অব্যাহত রাখুক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রকৃত অনুসারী হয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকুক—এ প্রত্যাশা সবারই।

লেখক: গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময় 

/এসএএস/এমএমজে/

x