আপনাকে স্যালুট সাদেক হোসেন খোকা

আহসান কবির ১৬:৫১ , নভেম্বর ০৭ , ২০১৯

আহসান কবিরশেষমেশ আপনি ফিরলেন!
হিমশীতল কফিনে মোড়া পাসপোর্টবিহীন আপনার লাশ এলো বিমানে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজার পর রাখা হলো শহীদ মিনারে। জাতীয় পতাকায় মোড়া আপনার কফিনকে ঘিরে বাজলো বিউগলের করুণ সুর। গান স্যালুট দেওয়া হলো আপনাকে। আপনি শুনতে পেলেন? দেখতে পেলেন বিদায়ের শেষ দৃশ্যগুলো? নাকি যে অভিমান নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, সেটিও আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন? মুক্তিযোদ্ধাদের অভিমান কি খুব তীব্র হয়? আপনার কি মনে হবে যে রাজনীতি আর ক্ষমতার হাত ধরে ভালোবাসা কিংবা কান্নাও বিভাজিত হয়? ক্ষমতায় থাকলে ভালোবাসা আর শোকের যে বহিঃপ্রকাশ, ক্ষমতাবিহীন থাকার অনুভূতি কি ‘পাসপোর্টবিহীন’ হয়ে যাওয়া? শোক আর ভালোবাসা সেখানে কি খানিক নীরব, ক্ষমতার মতো ‘সব আয়োজনে সরব’ না? ক্ষমতাই কি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক?
বাস্তবতা হলো–যে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জন্য স্বাধীনতার নতুন সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল, যারা প্রাণ দিয়ে আমাদের দিয়েছিল মানচিত্রের স্বাদ, যারা ভোর এনেছিল তাদের সবাই পায়নি একটা সুন্দর সকালের মিষ্টি ছোঁয়া। পায়নি উষ্ণ দুপুর কিংবা রোমাঞ্চকর বিকেল। তাদের অনেকেই স্বাধীন দেশে নির্মমভাবে ‘রাত’ হয়ে গেছেন। যাদের কাছে আপনি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যাদের কাছে শপথ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ, হুদা কিংবা হায়দারের করুণ পরিণতির কথা মনে আছে আপনার? মনে আছে বুলেটবিদ্ধ হওয়ার পরেও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার দৃশ্য কিংবা লাশ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সামনে উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখার দৃশ্য?

প্রিয় সাদেক হোসেন খোকা, আপনার কী মনে আছে সাবু কিংবা আজম খানের কথা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকার সময় কাউকে না জানিয়ে আপনি এক কাপড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন। চলে গিয়েছিলেন ভারতের ত্রিপুরা। আগরতলায় কমিউনিস্ট পার্টির অফিস হয়ে গিয়েছিলেন মেলাঘরে ট্রেনিং নিতে। সকালে একদলা ছাতু আর রাতে শক্ত রুটি আর ডাল খেয়ে সেই ট্রেনিং নেওয়ার কথা মনে আছে আপনার? আপনার সহযোদ্ধা সাবু খুব নরম ছিল। ট্রেনিংয়ের কঠোরতা আর রাতে ঘুমোনোর জায়গা না থাকাতে মশার কামড় সহ্য করতে না পারা সাবুর কান্না মনে আছে আপনার? সাবু তার স্মৃতিকথায় বলেছিলেন–রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে আমি আর খোকা একসঙ্গে বের হতাম। খোলা আকাশের দিকে মুখ করে দু’জন দু’দিকে ফিরে কাজ সারতাম! রাতে কখনও কখনও যেতাম আজম খানের কাছে। ছেলেটা উদাত্ত গলায় গান গাইতো। গাইতো- ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। আজম খানের এক গানে সাবু আর আপনার নাম উল্লেখ আছে। আজম খানের গান গাইবার কথা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলো’-তেও উল্লেখ আছে। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে আপনি বহুবার বলেছেন, চোখ বুজলে এখনও আপনার শহীদ রুমী কিংবা বদির কথা মনে পড়ে। আপনি কি শেষমেশ রুমী আর বদির কাছেই চলে গেলেন খোকা ভাই? নাকি যাবেন সাবু আর আজম খানের কাছে?

আপনার মনে আছে ১৯৭১-এর অক্টোবরের কথা? বায়তুল মোকাররম আর নিউমার্কেট ছিল তখন কেনাকাটার বড় জায়গা। আপনি দেখলেন বায়তুল মোকাররমের সামনে শুটিং চলছে। মানুষ কেনাকাটা করছে এবং সেই দৃশ্য ধারণ করছে ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন্স)। শুটিংয়ের উদ্দেশ্য দেশ-বিদেশে দেখানো যে ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক আছে এবং দেশে মোটেও যুদ্বাবস্থা নেই। সেদিন ‘রেকি’ করলেন আপনি শান্তিনগরের এসবি অফিসের পাশের ডিএফপি অফিস। একদিন পরে গেলেন এক্সপ্লোসিভ আর ব্যাগে করে দুটো স্টেনগান নিয়ে ডিএফপিতে। জানতেন এক্সপ্লোসিভ যত চেপে রেখে বার্স্ট করা যায়, তত তার শক্তি বাড়ে। এক্সপ্লোসিভের ওপর খুব সাবধানে স্টিলের আলমারি রেখে তারপর নিরাপদ দূরত্বে এসে ঘটালেন বিস্ফোরণ। এসবি অফিসের পাশে বিকট শব্দের সেই বিস্ফোরণ যেন শুনলো ঢাকাবাসী, মিডিয়ার কারণে পৌঁছে গেলো তা সারা বিশ্বে। এমন দুর্ধর্ষ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত অপারেশন ঘটানোর জন্যই আপনাদের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’! আপনারা চলে যাচ্ছেন খোকা ভাই, মুক্তিযোদ্ধা হয়ে আর কখনও কেউ জন্ম নেবে না! বলবে না যুদ্ধের কোনও বিজয়গাথা!

অথবা ধরুন, পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের কথা। এটি ছিল ঢাকার মোমেনবাগে আর বাড়িটি ছিল বর্তমান বিএনপি নেতা ডক্টর মঈন খানের বাবা মন্ত্রী এম এ মোমেনের। আপনি আপনার সঙ্গীদের নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন কার্যালয়!

তবু শহীদ রুমী, বদি, আলতাফ মাহমুদের দেশে রাজনীতি আর ক্ষমতাবন্দি থাকুক কেউ কেউ। কেউ থাকুক যাবতীয় হিসাব-নিকাশ আর বিভাজন নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধারা শুধু থাকুক দেশের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ। আপনি যখন অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন তখন আপনি বিভাজনের পথে হাঁটেননি। আর তাই আপনার মাথায় এসেছিল সর্বজননন্দিত সেই আইডিয়াটি। ভাষা সৈনিক আর মুক্তিযুদ্ধের বীরদের নামে নামকরণ করেছিলেন ঢাকার রাস্তা আর লেন উপলেনগুলো। ৫২ আর ৭১’র বীরদের নামের কারণে ঢাকা শহর হয়ে গেছে বীরদের শহর! শহরের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে নতুন প্রজন্মের মনে পড়বে বীরদের সব বীরত্বগাথা। শুধু নিজের নামে করেননি বড় কোনও রাস্তা বা ভবনের নাম। হয়তো খুব নীরবে ঢাকা শহরের কোনও এক কোণে আছে আপনার নামে কোনও এক কমিউনিটি সেন্টার। হয়তো বা অভিমান আর দীর্ঘশ্বাসে মনে মনে বলবেন, মনে রেখ আমিও ছিলাম!

লাল সবুজের পতাকায় ঢাকা এই বাংলায় আপনি ছিলেন, আপনি থাকবেনও। হয়তো ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধে আপনি জিততে পারেননি। ২০১৪-তে খুব নীরবে চিকিৎসার জন্য আপনি গিয়েছিলেন আমেরিকায়। ২০১৭ সালে আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। নতুন পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন, দেশে ফিরে প্রয়োজনে জেলে যেতেও রাজি ছিলেন। সেই আপনি ফিরে এলেন! পাসপোর্টবিহীন আপনার আসা কারও কারও ভেতর বিভাজনের ফাটল ধরালেও আপনার প্রধানতম পরিচয় আপনি ক্র্যাক প্লাটুনের দুর্ধর্ষ গেরিলা, বাংলার সবচেয়ে অভিজাত পরিচয় আপনার, সেটি মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারাই বাংলাদেশ। আপনিও বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। দলীয় বিভাজনের কারণে হয়তো স্লোগান দিতেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। অথচ প্রিয় অনেক মানুষকে বলতেন- মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাঙালির আত্মপরিচয় ছিল ‘জয় বাংলা’। বাংলার প্রাণভোমরা যে মুক্তিযুদ্ধ, সেখানে কোনও বিভাজন নেই। যারা প্রশ্ন তোলে তারা বাংলাদেশকেই ভালোবাসে না! যারা ১৯৭১-এ জয় বাংলা স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করতেন, পাকিস্তানি হায়েনাদের সঙ্গে যুদ্ধের ভাষায় কথা বলতেন তারা বিভাজিত হতে পারেন না কখনও।

নিজের জীবনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে যে বাংলাদেশকে আপনি ভালোবেসে ছিলেন, যে বাংলাদেশের মাটিতে আপনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, বিভাজনহীন আমাদের ভালোবাসার বাংলাদেশে আপনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। আপনার, আপনাদের কারণেই আজ স্বাধীন দেশে আমাদের বিচরণ, মুক্ত নিঃশ্বাস নেওয়া! জীবনের এই পরম পাওয়ার আনন্দে আপনার বিদায়ে আপনাকে স্যালুট! নতুন যে কিশোর, নতুন যে শিশু বাবা বা মায়ের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের কোনও বিজয়ী বীরকে দেখতে যাবে, আপনার বিদায়ে আপনার মুখটা দেখতে যাবে, তাদের পক্ষ থেকে আপনাকে বিদায়ী স্যালুট!

যারা বাংলাদেশ ভালোবাসে তারা বিভাজিত হয় না কখনও। দেখা হলো আপনার সঙ্গে, ব্যথিত শেষ বিউগলের বিষণ্ন কান্নায়, হৃদয় নিংড়ানো ‘গান স্যালুটে’!

লেখক: রম্যলেখক

/এমএনএইচ/এমওএফ/

x