Vision  ad on bangla Tribune

‘রঙিন মাছের কারিগর’

মো. আসাদুজ্জামান সরদার ০৬:৫৬ , মে ২০ , ২০১৭

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবাক্স গ্রামে সাইফুল ইসলামের রঙিন মাছ চাষএকেক মানুষের একেক রকম শখ। কারও ফুল চাষ করতে ভালো লাগে, কারও পাখি পালন। আবার অনেকেই অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছ পোষেন। এই সৌখিন বিষয়টি একান্তই ভালো লাগার। কিন্তু কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে জীবন সংসারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন একজন সৌখিন মানুষ সাইফুল ইসলাম। রঙিন মাছের চাষ পাল্টে দিয়েছে তার জীবন। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি তাকে পরিচিতিও এনে দিয়েছে। এখন তাকে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সবাই চেনেন ‘রঙিন মাছের কারিগর’ হিসেবে।
কলারোয়া উপজেলার ব্রজবাক্স গ্রামে সাইফুল ইসলামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা গেছে, সংসারের অভাবের তাড়না থাকলেও শখ তার পিছু ছাড়েনি। নানা সংকটের মাঝেও রঙিন মাছ চাষ করে গেছেন তিনি। ২০০৪ সালে এক বন্ধুর সহায়তা ছয় জোড়া রঙিন মাছ আর ৬২০ টাকা পুঁজি নিয়ে রঙিন মাছ চাষ শুরু করেন। এক সময় শখের বসে রঙিন মাছে চাষ করলেও পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে লিজ নেওয়া পুকুরে রঙিন মাছ চাষের পরিধি বাড়ান সাইফুল। আজ তার মূলধনই প্রায় ২০ লাখ টাকা।

সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপে বলেন, ‘এক সময় আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। অভাবের কারণে ভারতে গিয়েছিলাম কাজের সন্ধানে। সেখানে একটি রঙিন মাছ উৎপদনকারী প্রতিষ্ঠানে খুব কম বেতনে চাকরি শুরু করি। বিদেশ ভালো না লাগায় কিছু দিন পর দেশে ফিরে আসি। সংসার চালাতে রাজধানীর মিরপুরে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করি। কিন্তু ওই বেতনে বাসাভাড়া দিয়ে সংসার চলে না। ফিরে আমি গ্রামে। এক বন্ধু রঙিন মাছ চাষ করতো, তার কাছ থেকে ছয় জোড়া রঙিন ব্রুড মাছ নিয়ে আসি। আর ৬২০ টাকা নিয়ে অন্যের পুকুরে রঙিন মাছ চাষ শুরু করি। এভাবেই ধীরে ধীরে আজ এই জায়গায় এসে পৌঁছেছি। আজ আমার মূলধন প্রায় ২০ লাখ টাকা।’

রঙিন মাছের চাষ

সাইফুল ইসলাম জানান, ২০১৪ সালে পুকুর লিজ নিয়ে বেশি করে রঙিন মাছ চাষ শুরু করি। বিশেষ পদ্ধতিতে উৎপাদন করা মিল্কি কই কার্প, কিচিং গোরামি, কই কার্প, কমিটিসহ ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির রঙিন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এই মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এক সময় সব মাছ বিদেশে আমদানি করতে হতো। কিন্তু এখন আমার হ্যাচারিতে উৎপাদন করা মাছ সাতক্ষীরার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। রঙিন মাছের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় বাজার রাজধানীর কাঁটাবনের ব্যবসায়ীদের অনেকেই আমার কাছ থেকে রঙিন মাছ নিয়ে যান।’

বিশেষ পদ্ধতিতে মাছের রঙ পরিবর্তনও করার কথা উল্লেখ করেন সাইফুল ইসলাম। বলেন, ‘রঙ বদলিয়ে সিল্কি নামের একটি মাছ তৈরি করছি। অনেকটা জরির মতোই দেখতে। সে জন্যই নাম দিয়েছি সিল্কি। রঙ পরিবর্তন করা এ মাছের চাহিদা রয়েছে।’

সাইফুল বলেন, ‘বর্তমানে ১৬টি পুকুর লিজ নিয়ে রঙিন মাছ চাষ করছি। প্রতিটি মাছ সর্বনিম্ন আর সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসাকে ঘিরেই বড় ছেলের নামে ‘রেজা অ্যাকুরিয়াম ফিস’ নামের একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছি। আমি এক সময় অন্যের শ্রমিক ছিলাম। এখন আমার অধীনে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।’
সাফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘উৎপাদন বাড়িয়ে দেশে রঙিন মাছের চাহিদা মেটানো সম্ভব। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে এ ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। আমি ব্যবসা বাড়াতে আহছানিয়া মিশন থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পেলে ব্যাপকভাবে রঙিন মাছ চাষ করে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে। আমার মতো অনেকেই তখন রঙিন মাছ চাষ শুরু করবেন।’
সাইফুলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০০৪ সালে স্বামীর সঙ্গে মাছ চাষ শুরু করি। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষ বাড়াই। এখন উৎপাদন করা মাছ রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে।’


সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর এলাকার অ্যাকুয়ামিয়ামের রঙিন মাছ সংগ্রহকারী মুবাশ্বির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে উৎপাদনের সুবাদে অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য রঙিন মাছ আমদানি এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এই খাতে দেশ ধীরে ধীরে স্বয়ংসম্পূর্ণ  হচ্ছে।’
সাতক্ষীরা সুলতানপুর বড় বাজারের নাহার এন্টার প্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আজমল হক বলেন, ‘সাইফুল ইসলাম মাছ উৎপদন করার পর এখন খুব একটা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না। এছাড়া তার মাছ টেকসই, প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক সময় টিকে থাকে। তার অনেক শিক্ষার্থী এখন রঙিন মাছের উৎপাদন করছে।’

/এসএমএ/

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x