‘তিনবেলা ভাত জোটাতেই হিমশিম খাচ্ছি’

সুলতান মাহমুদ, নড়াইল ১৮:১৩ , জুন ১৮ , ২০১৭

একটি চালের আড়তে েশুকানো হচ্ছে চাল। ছবি-নড়াইল প্রতিনিধি

‘সারাদিন খেটে যে টাকা পাই তা দিয়ে পরিবারের পাঁচজনের সংসারের জন্য চালই কিনতে পারি না। তিনবেলা ভাত জোটাতেই গিয়া হিমশিম খাচ্ছি।’ নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার আমাদা গ্রামের দিনমজুর আকুব্বর হোসেন এভাবেই নিজের অবস্থা জানালেন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চালের দাম বাড়ায় এখন কোনও কোনও দিন ঘরের সবাইকে নিয়ে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খেয়ে পার করছে। এরপর মাছ তরিতরকারিসহ আরও জিনিসপত্র তো বাদই থাকলো। সংসারই চালাতে পারছি না।’

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়াইলে মোটা ও চিকন চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। হঠাৎ করে চালের দাম কেজিপ্রতি প্রকার ভেদে ১০-১৫ টাকা বেড়ে গেছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের লোকজন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রের দামের ঊর্দ্ধগতির সঙ্গে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় দিনমজুর শ্রেণির মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হতাশ ক্রেতারা

নড়াইল জেলা শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র রূপগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন চালের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৪ টাকা থেকে ৪৫ টাকা দরে, ইরি-বোরো-২৮ ও ২৯ জাতের মাঝারি চিকন চাল প্রতি কেজি চাল ৪৮ টাকা থেকে ৫০ টাকা দরে, মিনিকেট জাতের চাল প্রতি কেজি ৫৪ টাকা থেকে ৫৫ টাকা দরে এবং বাসমতি জাতের বিভিন্ন প্রকার চিকন চাল প্রতি কেজি ৬০ টাকা থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাসখানেক আগেও মোটা জাতের চাল প্রতি কেজি ৩৪/৩৫ টাকা ও চিকন চাল প্রতি কেজি ৪২/৪৩ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

রূপগঞ্জ বাজারের চাল ব্যবসায়ী হাফেজ ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী ইলমত হোসেন জানান, চালের দাম বৃদ্ধি বা কমার ব্যাপারে তাদের কোনও হাত নেই। এখানকার ব্যবসায়ীরা সাধারণত যশোরের বাঘারপাড়া ও কুষ্টিয়া থেকে চাল কিনে বিক্রি করে থাকেন। যখন যে দামে কেনা পরে সেভাবে কেজিতে দু’এক টাকা লাভে বিক্রি করা হয়।

দোকানে বিভিন্ন রকম চাল থাকলেও দাম বাড়ায় ক্রেতার সংখ্যা গেছে কমে

রূপগঞ্জ শিল্প ও বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত ঘোষ জানান, এ বছর ধানের সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা মাফিক চাল তৈরি করতে পারছেন না মিল মালিকরা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় চালের দাম বেড়ে গেছে। চালের দাম কমাতে হলে ধান বা চালের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হবে।

নড়াইল সদর উপজেলার কামালপ্রতাপ গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান শেখ জানান, প্রতিবছর তিনি যেখানে ৫০ থেকে ৬০ মন উদ্বৃত্ত ধান বিক্রি করতেন, সেখানে এবার তিনি সংসারের খরচ চালানোর ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। জেলার অধিকাংশ কৃষকের সঙ্গে কথা বলে একই তথ্য জানা যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, চলতি মওসুমে আগাম বৃষ্টির কারণে কৃষকরা ধান ঠিক মতো ঘরে তুলতে পারেননি। অধিকাংশ জমির ফসল (বোরো ধান) কাটার আগ মুহূর্তে অতিবৃষ্টিতে ধান ক্ষেতেই পচে  গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ বছর ধানের ফলন অর্ধেকে নেমে এসেছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধানের উৎপাদন না হওয়ায় বাজারে ধান-চালের সরবরাহ কম বলে তিনি জানান।

টিসিবির জেলা সদরের ডিলার খোকন জানান, তাদের বিক্রি তালিকায় চাল নেই। টিসিবির মাধ্যমে চাল বিক্রি শুরু হলে ক্রেতারা কম দামে চাল কিনতে পারতেন। খাদ্য অধিদফতর পরিচালিত ওএমএস ডিলার রূপগঞ্জের চুন্নুও জানান একই কথা।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইতোমধ্যে মতবিনিময় করে চাল ও অন্যান্য পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 /এমও/এসটি/

x