‘ডিমলার ওসি গ্রামবাসীকে আমার ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন’

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী ১১:৫৪ , আগস্ট ০৮ , ২০১৭

শেফালী বেগমনীলফামারীর ডিমলায় গরু চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ শেফালী বেগম ডিমলা থানার ওসির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সেদিন গরু চুরির অপবাদ দিয়ে গ্রামবাসীকে আমার ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন।’

এদিকে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ শেফালীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় রবিবার (৬ আগস্ট) রাতে মামলা হয়েছে। শেফালীর মামা সহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে ডিমলা থানায় মামলাটি করেন (মামলা নম্বর-১৬/১৭)।

মামলায় খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুর কাদের, পুলিশের হাতে আটক গ্রাম পুলিশের সর্দার রশিদুল ইসলাম, শেফালীর বড় বোন আকলিমার স্বামী রফিকুল ইসলাম ও শাশুড়ি অপেয়া বেগমসহ ১৯ জন ও অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়।

এদের মধ্যে পুলিশ রবিবার তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদেরকে সোমবার (৭ আগস্ট) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতার করা ব্যক্তিরা হলেন- শেফালীর বড় বোন আকলিমার স্বামী রফিকুল ইসলাম, শাশুড়ি অপেয়া বেগম ও গ্রাম পুলিশ রশিদুল ইসলাম।

এ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে ওসি নিজের ইচ্ছেমতো আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন বলে অভিযোগ নির্যাতনের শিকার শেফালীর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম আমার মামা সহিদুল, ছোট বোন শিউলি আক্তারকে থানায় নিয়ে তার ইচ্ছেমতো আসামি করে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু নির্যাতনের সময় আমার মামা সহিদুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।’
শেফালী আরও বলেন, ‘আমি জানতে পেরেছি, ওসি মোয়াজ্জেম প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করতেই খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তামজিদার রহমানকে মামলার এক নম্বর সাক্ষী করেছেন। যারা আসলে জড়িত নয় তাদের নামে মামলা হয়েছে। পুনরায় আমি এর বিচার দাবি করবো।’

এ ব্যাপারে নীলফামারীর সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল ডিমলা ও ডোমার) জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে থানায় মামলা করা হয়েছে।’

ঘটনায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনার তদন্তে কারা জড়িত তা বের হয়ে আসবে। কারণ মামলায় ১৯ জন নামীয়সহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন রয়েছেন।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী যারা জড়িত ছিল তাদের আসামি করা হয়নি। ওসি ইচ্ছে করেই মামলা থেকে তাদের বাদ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘মামলার কপি শুধু বাদী ও বিবাদী পাবেন। প্রয়োজনে মামলার কপি আদালত থেকে তারা সংগ্রহ করবেন।’

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, ডিমলা থানার ওসির কাছে কোনও তথ্য চাইতে তিনি বলেন, ‘আমি তথ্য দিতে বাধ্য নই। আপনারা যা ইচ্ছে লিখতে পারেন। ’

এদিকে, মামলা দায়েরের খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার (৭ আগস্ট) দুপুর থেকে গ্রামটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকে বলেছেন, আমরা বারবার বলেছিলাম মামলা করতে হলে নির্যাতনের শিকার শেফালীকে বাদী করা হোক। কিন্তু ডিমলা থানার ওসি আমাদের কথা শোনেননি।

তারা আরও বলেন, ওসি প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করতে প্রথম থেকে এত বড় ঘটনাটিকে অস্বীকার করলেও পরে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা মেলায়, আসামি গ্রেফতার করতে বাধ্য হন। বর্তমান অভিযোগপত্রে জড়িতদের অনেকে বাদ পড়েছেন। মামলায় শেফালী বাদী হলে প্রকৃত আসামিদের নাম চলে আসতো।

বাদী শেফালীর মামা সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি সকালে গ্রামের বাইরে ছিলাম। আমাকে খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তামজিদার রহমান মোবাইল ফোনে ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন। সেখানে আমার ভাগ্নিকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছিল। পরে ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর অবস্থায় শেফালীকে তারা তুলে দিয়ে চিকিৎসা করাতে বলেন। আমি তাদের বলেছি, তোমরা চিকিৎসা করিয়ে ওকে সুস্থ করে দিলে আমি নিয়ে যাবো। এরপর আমি ঘটনাস্থল হতে চলে আসি।’

মামলা দায়ের প্রসঙ্গে বাদী সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রবিবার বিকালে পুলিশ আমাকে ও শেফালীর ছোট বোন শিউলীকে থানায় ডেকে নিয়ে যায়। শেফালীর ছোট বোন ও আমার কথা শুনে পুলিশ এজাহার তৈরি করে। সেখানে আমরা দুজনে স্বাক্ষর করি।’ মামলায় কী লেখা হয়েছে, কতজন আসামি তা বলতে পারেননি তিনি।

উল্লেখ্য, খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত এক বিবাদে শেফালীর বাবা মবিয়ার রহমানকে ২০১২ সালের ২৯ জুলাই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে প্রতিপক্ষরা হত্যা করেছিল। মামলায় এলাকার ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে পুলিশ চার্জশিট দেয়।
মামলাটি বর্তমানে নীলফামারী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আগামী ২২ আগস্ট হত্যার মামলা সাক্ষ্য রয়েছে। প্রভাবশালীরা ওই মামলা মীমাংসার জন্য চাপ দিয়ে আসছে। শেফালী তার বাবার হত্যা মামলাটি আপস না করায় প্রতিপক্ষরা সম্প্রতি তার নামে ডিমলা থানায় একটি মিথ্যা মামলা করেছে ।
এ কারণে শেফালীর একমাত্র ভাই রমজান পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। শেফালী ওই গ্রামের লালন মিয়ার স্ত্রী ও একই এলাকার মবিয়ার রহমানের মেয়ে।

/এআর/এপিএইচ/

x