পাহাড়ে হত্যা-হামলার দায় কার?

জিয়াউল হক, রাঙামাটি ১৩:৫৯ , ডিসেম্বর ০৭ , ২০১৭

আহত রাম চরন মারমা ও নিহত অরবিন্দু চাকমাশান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি পার হতে না হতেই সহিংস হয়ে উঠেছে রাঙামাটির পরিবেশ। হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতাসহ দুই জনকে হত্যা এবং একজনকে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এসব নাশকতার জন্য পাহাড়িদের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করছে আওয়ামী লীগ। তবে জেএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

গত ৫ ডিসেম্বর বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রামচরণ মারমা ওরফে রাসেল মারমাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত। ওই দিনই রাত ৮টার দিকে জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সহ-সভাপতি অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই দুই ঘটনায় পুরো রাঙামাটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর আগে ৫ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউপিডিএফ সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। নানিয়ার চরের চিরঞ্জীব দর্জিপাড়া এলাকায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করা হয় তাকে।

আরও আগে গত ২০ নভেম্বর বিলাইছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি স্বপন কুমার চাকমা, যুবলীগ নেতা রিগান চাকমা, ইউপি সদস্য অমৃত কান্তি তংচঙ্গা, কেংড়াছড়ি মৌজার হেডম্যান সমতোষ চাকমাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ইউপিডিএফ সদস্যকে হত্যার ঘটনাটি ছাড়া বাকি সবগুলো ঘটনার জন্য সন্দেহ করা হচ্ছে জেএসএসকে। বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি এলাকা জেএসএস নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় তাদেরই এসব নাশকতার জন্য দায়ী করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। 

বুধবার (৬ ডিসেম্বর) রাতেও সহিংসতার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। রাঙামাটি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাকে (৫৫) বুধবার মধ্যরাতে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে তার পরিবারের সদস্য জিতেন্দ্র লাল চাকমা (৬৫) ও রমন কৃষ্ণ চাকমাকেও (২৮) কুপিয়ে জখম করা হয়। রাতেই ঝর্ণা খীসাকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আনা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তংচঙ্গা অভিযোগ করে বলেন, ‘এই সব কাজ জেএসএস করেছে। কারণ তাদের দলের নেতা কিছু দিন আগে বলেছিলেন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ছাড়া অন্য কোনও সংগঠন জাতীয় রাজনীতি করতে পারবে না। আর চুক্তির বর্ষপূর্তিতে সন্তু লারমা পাহাড়ে আগুন জ্বালানোর ঘোষণা দেন। ফলে সব কিছু একই সূত্রে গাঁথা। জেএসএস চায় কোনও পাহাড়ি যাতে জাতীয় কোনও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে না পারে। সে কারণেই তারা আমাদের দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সময় বাধা দিত। তারা বাধা না শোনায় এখন মারধর করছে, ভয় দেখাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত ২০ নভেম্বর মারধরের ঘটনায় পুলিশ যদি অভিযুক্তদের আটক করতে পারতো তাহলে এমন ঘটনা আর ঘটতো না।’

তবে গ্রেফতার না করার অভিযোগ অস্বীকার করে বিলাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে কাউকে আটক করা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’ এসব ঘটনায় কাকে দায়ী করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস এগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই উপজেলায় অন্য কোনও আঞ্চলিক সংগঠনের অস্তিত্ব নাই।’

জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবর্তক চাকমা বলেন, ‘জুরাছড়ি উপজেলা এক সময় জেএসএস এর ভোট ব্যাংক ছিল। সাধারণ মানুষ এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছে। তাদের ভোট কমে যাওয়ার ভয়ে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখাতো। ৭ ডিসেম্বর অরবিন্দু চাকমার বাসায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য ও পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের দুপুরের খাবারের দাওয়াত ছিল। এর আগেই মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) রাত সোয়া ৮টার দিকে উপজেলার সুবলং নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পানির ব্যবস্থার জন্য সিঁড়িতে ওঠার সময় কিছু মুখোশধারী লোক তাকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। জুরাছড়িতে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য জেএসএস এই কাজ করেছে। অরবিন্দু চাকমা ডিশ লাইনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। তার কোনও ব্যবসায়িক শত্রু নাই। আওয়ামী লীগ করার কারণেই জেএসএস তাকে হত্যা করেছে।’ 

এদিকে জুরাছড়িতে মঙ্গলবারের এই হত্যাকাণ্ডের পর বুধবার বিকাল পর্যন্ত থানায় কোনও মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন জুরাছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল বাসেদ।

জেলা আওয়ামী যুবলীগের পক্ষ থেকে বুধবার বিকালে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সহ-সভাপতি অরবিন্দু চাকমাকে হত্যা ও বিলাইছড়িতে রাসেল মারমার ওপর হামলার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার জন্যে এ রকম বর্বর কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে।’

এদিকে আওয়ামী লীগের তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিষয়ক সহসম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘ঘটনা দুটি আলাদা আলাদা জায়গায়। এর পেছনে আলাদা আলাদা কারণ থাকতে পারে। এখানে জনসংহতিকে দায়ী করা ঠিক না। এসব ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পৃক্ততা নেই।’ 

আরও পড়ুন- 

রাঙামাটিতে আ. লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা
যুবলীগের ডাকে হরতাল চলছে রাঙামাটিতে

 

/এফএস/

x