৭ ডিসেম্বর শ্রীপুরে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন কিশোর সাহাবু্দ্দিন

গাজীপুর প্রতিনিধি ১৭:০৯ , ডিসেম্বর ০৭ , ২০১৭

শ্রীপুরে স্মৃতিসৌধ

ফজরের আযানের আগে থেকেই চারদিকে গুলি। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দল দুই দিক থেকে পাকসেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করে। ভোর ৪টা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত শুধু যুদ্ধ চলে। গুলির শব্দে কাঁপছিল ইজ্জতপুরের আকাশ বাতাস। ওই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন কিশোর সাহাবুদ্দিন। এভাবেই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মতিউর রহমান ৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধের বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের স্থল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল রেলপথ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ এবং উত্তরের জেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথকেই তারা নিরাপদ মনে করত। পাকসেনারা গোলা বারুদসহ ভারী অস্ত্র মালবাহী ট্রেনেই আনা নেওয়া করত। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বিশেষ করে রেলসেতু এলাকায় পাকিস্তানি ক্যাম্প তৈরি করে পাহারা বসিয়ে রাখত। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনা ছিল পাক সেনাদের ওপর আক্রমণ করাসহ রেলসেতু ধংস করা। রেলসেতু ধংস করতে পারলে পাকসেনাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন,‘ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা গাজীপুরের মুক্তিযোদ্ধারা দেশে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করছিলেন। তাদের মধ্যে ডোয়াইবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সেকশন কমান্ডার মিয়ার উদ্দিনের বাড়িতে ইজ্জতপুর রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশের রেলসেতু ধংস করার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ৬ ডিসেম্বর ইজ্জতপুর গ্রামের নূরুল ইসলাম সিরাজী ও তার ভাই জসীম উদ্দিন সিরাজীর বাড়িতে কমপক্ষে দেড়শ’ প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা সমবেত হন। পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতেন স্থানীয় তমিজ উদ্দিন। তার মাধ্যমে সেনা ক্যাম্পে খোঁজ খবর নেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যায় ক্যাম্প আক্রমণের রেকি করা হয়। তমিজ উদ্দিনের দেওয়া তথ্যমতে, ৮/১০ জন পাকসেনা তখন ভারী অস্ত্রেশস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পে অবস্থান করছিল। রাত ১২টার পর থেকে আমরা ক্যাম্পের আশপাশে অবস্থান নিতে শুরু করি।

এসময় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘ধান গাছের আঁটি দিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্প ও সেতু বানিয়ে ৬ ডিসেম্বর রাতেই আমরা প্রশিক্ষণ নিই এবং নিজেদের আক্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করি।’

মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান আরও বলেন, ‘পরদিন (৭ ডিসেম্বর) ভোর চারটায় পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণ করা হয়। সকাল ৭টা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গুলির শব্দে আশপাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠে। মুক্তিযোদ্ধারা দুই দিক থেকে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ করে। চলতে থাকে গোলাগুলি। এ যুদ্ধে শ্রীপুরের খোঁজেখানী এলাকার বাসিন্দা ও গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সাহাব উদ্দিন ছিল রেলসেতুর পূর্ব পাশে থাকা দলের সামনের সারিতে ছিল। একপর্যায়ে সে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। অন্যদিকে এক পাকিস্তানি সেনাসহ চার রাজাকার নিহত হয়।

দিনের বেলায় বিভিন্ন দিক থেকে ক্যাম্পে কি পরিমাণ সেনা আসে সে সম্পর্কে বাবুর্চি তমিজ উদ্দিন দেওয়া তথ্যে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এ কারণে টানা তিন ঘণ্টা যুদ্ধের পর পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী পাশের গ্রাম ডোয়াইবাড়ি এলাকার আব্দুস সোবাহানের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেই। বিকেলে আব্দুস সোবাহানের বাড়িতে সমবেত হয়ে দেখি সবাই আছে শুধু সাহাব উদ্দিন নেই। ঘটনার পরদিন ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায়।

সম্মুখ যুদ্ধের চারদিন পর ১১ ডিসেম্বর সেকশন কমান্ডার বাবর আলী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নূর মোহাম্মদ ফকিরের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সাহাব উদ্দিনের মৃতদেহ উদ্ধার করে গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়ে আসে। সেখানে জানাজা শেষে বিদ্যালয়ের মাঠের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

শহীদ সাহাব উদ্দিনের নামে শ্রীপুর থেকে গোসিঙ্গা ৬ কিলোমিটার সড়ক এবং শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে একটি কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আজ  শহীদ দিবসে তার স্মরণে গোসিঙ্গা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়, আলোচনাসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

আরও পড়ুন: রংপুরে সেনা মোতায়েনে সিইসি’র না 

/জেবি/

x